মানুষের পাশে আছে মানুষ

এক বিস্ময়কর জীবনীশক্তি নিয়ে এই পৃথিবীতে টিকে আছে মানুষ। সেই আদি থেকে কত হাজারো দুর্যোগ পেরিয়েছে সে। কখনো প্রাকৃতিক, কখনো যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো নিজেদের সৃষ্ট নানা দুর্যোগ তাদের বিহ্বল করেছে। কত হাজারবার যে মানুষের সামনে ইতিহাসের সমাপ্তি এখানেই—এমন বক্তব্য হাজির করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ নিঃশেষ হয়নি। ফের উঠে দাঁড়িয়েছে।
এই বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর কাজটি মানুষ করতে পেরেছে এমন কিছু লোকের কারণে, যাদের শুভবোধ অশুভ ও সব অকল্যাণকে দূরে ঠেলার শক্তি জুগিয়েছে মানুষকে। নতুন করোনাভাইরাসের কারণে আজ সারা পৃথিবী যখন আক্রান্ত তখনো দেখা মিলছে এমন বহু মানুষের। এই মানুষেরা একা বা সংঘবদ্ধ হয়ে অন্য সবার পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। এরাই সেই সাহসের উৎস, যা এই মুহূর্তে এই সংকট মোকাবিলার জন্য ভীষণ রকম জরুরি।
আমেরিকায় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এমন অসংখ্য মানুষের দেখা মিলছে। আমেরিকায় যখন বাংলাদেশিরা আক্রান্ত হচ্ছেন, যখন মৃতের সংখ্যা ১৮০ পেরিয়ে আরও উঁচুতে উঠছে ক্রমেই, তখন তাঁদের সাহস ও শক্তি জোগাতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশি আমেরিকান ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সোসাইটি, বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস, জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার, জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা, জ্যামাইকা ফ্রেন্ডস সোসাইটি, এসেনশিয়াল হোম কেয়ার, আসসাফা ইসলামিক সেন্টার, বিদেশ ফাউন্ডেশন ফুড বাস্কেটের মতো সাংগঠনিক তৎপরতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছেন ফেরদৌস খন্দকারসহ নাম জানাতে না চাওয়া বহু বন্ধু। এই ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো খাদ্যসহ বিভিন্ন জরুরি সামগ্রীর সরবরাহ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। পাশাপাশি রয়েছেন বাংলাদেশি আমেরিকান চিকিৎসক, নার্স, সাংবাদিক, পুলিশসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা, যারা অনেকটাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
আমেরিকায় বিশেষ করে, নিউইয়র্কে মৃতের দাফনের বিষয়টি এখন বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক পরিবারের পক্ষে মৃত ব্যক্তির দাফনের ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। অনেকের কাছে মৃত ব্যক্তির জন্য একটি কবর কেনার অর্থ নেই। অনেকে কাজ হারিয়ে ঘরে বসে আছেন, রয়েছেন খাবারের কষ্টে। এমন ভয়াবহ সংকটের সময় এই ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এই যে পাশে থাকা, এর মূল্য কিন্তু শুধু বস্তুগত দিক থেকে বোঝা যাবে না। সবার জন্য ঝুঁকি নেওয়া এই ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো মানুষকে এই আশ্বাস দিচ্ছে যে—‘তুমি একা নও, তোমার পাশে আমরা আছি।’
ঝড়ের দিনে, দুর্যোগের দিনে এই যে আশ্বাস এটি যে কত বড় একটি ব্যাপার, তা শুধু সেই ব্যক্তিই বোঝেন, যিনি এমন দুর্যোগে পড়েছেন। যেকোনো দুর্যোগে যখন এমন মানুষের দেখা পাওয়া যায়, তখনই বোঝা যায় যে, সামনেই সুদিন। এই মানুষেরা হচ্ছেন সেই সুসংবাদের বাহক, যার জন্য দুর্যোগকালে প্রত্যেকে অপেক্ষায় থাকে। এই মানুষেরাই সেই শুভবোধের উৎস, সেই আলোর উৎস যা অন্ধকারকে ছুরির মতো কেটে ফেলতে পারে। এই মানুষেরাই এই মুহূর্তে বারবার জানাচ্ছে যে, দুর্যোগ ক্ষণস্থায়ী; এ আঁধার কেটে যাবেই। তাঁদের এই আশ্বাসবাণীতে আস্থা রেখে বাকিদের শুধু সাহসের সঙ্গে এই সময়টুকু পার হতে হবে। সুদিন আসবেই।