বুট পালিশওয়ালাদের পাঁচালি

সম্প্রতি বাংলাদেশের এক কবি প্রবাসে খেটে খাওয়া মানুষের পেশা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। তাঁর এই কটাক্ষ বা ব্যঙ্গাত্মক বার্তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। এখনো ফেসবুকের পাতায় এই নিয়ে বিস্তর লেখালেখি চলছে। কবির মুণ্ডুপাতও হচ্ছে এবং তা হয়তো আরও কিছুদিন চলবে। তবে কবির দৃষ্টিতে এই ‘বুট পালিশওয়ালা’দের নিয়ে এ ধরনের ব্যঙ্গাত্মক আচরণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রিয় স্বদেশ ছেড়ে, আত্মীয়স্বজনের মায়া পেছনে ফেলে, প্রিয়জনের সান্নিধ্যকে উপেক্ষা করে যারাই এই বুট পালিশওয়ালার জীবন বেছে নিয়েছেন তাঁরা বিভিন্নভাবে এ ধরনের কটাক্ষের শিকার হচ্ছেন। সত্যিকার অর্থে খোদ সরকারি পর্যায়েও এই ‘বুট পালিশওয়ালা’দের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আছে কিনা আমার জানা নেই।

সরকারের প্রবাসী মন্ত্রণালয় বলতে একটা বস্তু আছে বটে, প্রবাসীদের দেখভাল করার জন্যে একটি বিভাগ আছে, আছেন মন্ত্রী মহোদয়ও। কিন্তু সব থাকার পরও এই বুট পালিশওয়ালাদের কেউ নেই। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। একটু সুখের আশায় জীবনের সব সাধ আহ্লাদ জলাঞ্জলি দেন। অথচ আমরা হয়তো অনেকেই জানিও না যে এই দেশের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা কতই না গভীর। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তাঁরা থাকুন না কেন তাঁদের ছোট্ট ধমনিতে লাল সবুজের একটি পতাকা সারাক্ষণ পত পত করে উড়তে থাকে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি বাংলাদেশে বসে আয়েশি ঢঙে ড্রয়িংরুমে বসে যাঁরা প্রবাসীদের নিয়ে নাক উঁচু টাইপের মন্তব্য করেন তাঁদের থেকে এই বুট পালিশওয়ালাদের দেশপ্রেম কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়। বরং অনেক বেশি। বেশ কিছুদিন আগে সৌদি আরব থেকে বেশ কিছু বাংলাদেশি নারী শ্রমিক কোনো রকমে নিজেদের সম্ভ্রম বাঁচিয়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছতে পেরেছিলেন। গৃহপরিচারিকার নামে বাংলাদেশের এই অসহায় মহিলা শ্রমিকেরা সেখানে শরীরের বিনিময়ে সৌদি ধনকুবেরদের বাসায় কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। শুধু কি তাই? তাদের অনেককে অন্যত্র বিক্রিও করে দেওয়া হয়েছিল। হায়! অথচ সেই দেশটায় কিন্তু আমাদের একটা মন্ত্রণালয় আছে, শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্যে গদি দখল করে নেওয়া মানুষজনও আছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? কোনো রকম পালিয়ে আসা অসহায় এই নারীদের কান্নার দাগে গোটা জাতি তখন লজ্জায় লাল হয়েছিল। শুধু সরকারি পর্যায়ে কেন; সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেখি প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি তাদের রয়েছে এক ধরনের অবজ্ঞার ছাপ। কথায়-বার্তায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে, বিয়ে শাদিতে, এই প্রবাসীরা যে খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে সমাজে গণ্য হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। এসব কিছুর জন্যে দায়ী আমাদের হীন মানসিকতা। মানসিকভাবে আমাদের এতটাই দৈন্যদশা যে আমরা মানুষের পেশাকে ছোট করে দেখে অভ্যস্ত। ছোট জাত, বড় জাত-বড় বাড়ি-ছোট বাড়ি, ছোট লোক-বড় লোক এই সব শব্দ শুনে আমরা ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত। সে কারণে বাংলাদেশের একজন কবি প্রবাসীদের যখন ‘বুট পালিশওয়ালা’ বলে কটাক্ষ করেন তখন এই নিয়ে আর নতুন করে অবাক হতে হয় না।

অথচ আমরা জানি এই বুট পালিশওয়ালাদের পাঠানো অর্থেই বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা এখনো সচল আছে। বুট পালিশওয়ালাদের পাঠানো বৈদেশিক টাকা এখন দেশের অর্থনীতি চালু রাখার অন্যতম এবং প্রধানতম উৎস। যদি বলা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল আছে প্রবাসীদের উপার্জিত কষ্টের টাকায় তাহলেও কথাটা এক বিন্দু বাড়িয়ে বলা হবে না। যে বাঙালিকে ঘরকুনো বলে এক সময় অপবাদ দেওয়া হতো সেই বাঙালি আজ ঘর থেকে বের হয়েছে। গোটা পৃথিবীকে নিজেদের মুঠোয় নিয়ে বাঙালি আজ সম্মানের সঙ্গে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসীদের কষ্টের টাকায় বাংলাদেশ মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা গুনছে। বাংলার গ্রামে গঞ্জে সর্বত্রই এখন ডলার, পাউন্ড, দিনার, রিয়াল ইত্যাদির জয় ডংকা বাজছে। কিন্তু এই আনন্দ উল্লাসের পেছনের যিনি মহান কারিগর সেই হতভাগা প্রবাসীটির অধিকার নিয়ে দেশ এবং দেশের কিছু মহান ব্যক্তিরা কতটুকু সচেতন?
আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ যাওয়া-আশার পথে প্রতি বছরই দেখি সেই একই চিত্র। ঢাকা বিমান বন্দরে কাস্টমসের বিশাল লম্বা লাইন। সেখানে হোমরা-চোমরা কিছু মানুষজন কাস্টমস চেকিঙের নামে বিভিন্ন রকমভাবে প্রবাসীদের হয়রানি করছে। সব দিক বিবেচনা করে বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে একজন প্রবাসী এভাবে নাজেহাল হবেন এ যেন খুবই স্বাভাবিক বিষয়। আর এই প্রবাসীরাও কিন্তু এই অলিখিত ‘নিয়ম কানুন’ খুব সহজ আর স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়ে তাঁদের পথ চলা বজায় রেখেছে। এ কথা ইতিমধ্যে প্রবাসীরা জেনে গেছে যে বাঘে ছুঁলে ১৮ ঘা আর বাংলাদেশ কাস্টমস ছুঁলে নির্ঘাত ১২৫ ঘা। আর আপনিই বলুন কার ঘাড়ে কটা মাথা? না, কাস্টমসের বিরুদ্ধে বা সরকারের অনাচারের বিরুদ্ধে প্রবাসীরা টুঁ শব্দটি করতে পারেন না? যদিও আগেই বলেছি এর জন্য প্রবাসী মন্ত্রণালয় রয়েছে, এটা রয়েছে ওটা রয়েছে কিন্তু এসবই শুধু মাত্র নামসর্বস্ব আর লোক দেখানো ব্যাপার। সত্যিকার অর্থে প্রবাসীদের ভালো সৎ কোনো বন্ধু নেই। এর জন্যে সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন আমাদের অল্প শিক্ষিত প্রবাসীরা। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভাসমানদের মতো এরা নিজ ভাগ্যের অনুসন্ধানে সদাই ব্যতিব্যস্ত। অথচ এই সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন যে কত কঠিন এবং দুর্বিষহ হয়ে পড়ে সে খবরটি আমরা ক’জন রাখতে পারি?’ বুট পালিশওয়ালাদের নিয়ে কথা বলার আগে তাদের জীবন সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা নেওয়ার প্রয়োজন আমরা অনুভব করি না।

নিউইয়র্ক জেএফকে থেকে কুয়েত তারপর কুয়েত থেকে ঢাকা। নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে বেশির ভাগ সময় এই হলো আমার যাত্রাপথ। জানা কথা, কুয়েতে নেমেই বিমান পাল্টাতে হয়। তাই এই মাঝ পথে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য এক লম্বা সময় হাতে পাওয়া যায়। এই যাত্রা বিরতিকালে প্রায় সময়ই সেখানকার বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়। আহা! তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখবেন তাদের আত্মা কতই না বিশাল! শুধু দেশের কথা, পেছনের ফেলে আসা জীবনের কথা, মা’র কথা, প্রিয় মানুষের কথা। কতই না সহজ সরল তাদের জীবন। শ্রদ্ধায় তখন মাথা নুয়ে আসে। গত বছর এভাবেই আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কুয়েত বিমান বন্দর এর ক্লিনিং অ্যান্ড স্যানিটারি বিভাগে কর্মরত আমাদের বাংলাদেশের ছেলে সোলায়মান এর সঙ্গে। বয়স বাইশ-তেইশ হবে। প্রাণবন্ত। প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে কাজ করেন সেখানে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তার কাজ। প্রতি মাসে রোজগার করেন বাংলাদেশের টাকায় দশ হাজার টাকা। জানালেন ৬ বছর যাবৎ তিনি আছেন কুয়েতে। এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করে তিনি এসেছিলেন এখানে। ভালো খবর যে মধ্যপ্রাচ্যে আসার টাকাটা তার উঠে গেছে। এই কিছুদিন আগে মাকে নাকি একটা দামি সেলফোন সেট কিনে দিয়েছেন। এখন বাংলাদেশে যাবেন বিয়ে করতে। কিন্তু সোলায়মান কি সুখে আছেন? প্রতিদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম। গাদাগাদি করে একটা বাসায় অনেকগুলো মানুষের কোনো রকমের বসবাস। এর কারণও একটাই। পয়সাটা সেভ হবে। আর সেই জমানো টাকাটা দেশে পাঠাতে পারবেন। সেই টাকায় হয়তো একটা বাড়ি হবে, একটা ছোট্ট জমি কেনা হবে, একটা ব্যবসা হবে অথবা ছোট বোনটার বিয়ে হবে। কিন্তু সোলায়মানের আর নিজের বিয়ে করা হয়ে ওঠে না। সে জানাল তার বিয়ে করতে কমপক্ষে এক লাখ টাকা খরচ হবে। কিন্তু এত টাকা তার জমানো নেই। তাই আরও বছর দু-এক পরে সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে বলে ঠিক করেছে। বাংলাদেশের সেই মহাকবির জানা উচিত এই সোলায়মানরাই কিন্তু একেকটা বাংলাদেশের পতাকা, একটা মানচিত্র। তাদের হেয় করে কোনো কথা বলা মানেই আমাদের মানচিত্রকে অবজ্ঞা করা। কথাটা আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের বুঝতে হবে বৈকি!

এই হলো একজন প্রবাসী হওয়ার চরম খেসারতের গল্প। নিজ প্রিয় দেশটাকে ফেলে এসে এক অজানা শহরের ঠিকানায় তারা তাদের স্বপ্নের বাসা বাঁধেন। গায়ের রক্ত ঢেলে তিনি প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকেন তার পরিবার পরিজন, সমাজ আর দেশের জন্য সুখের ফুলটি ফোটাতে। কিন্তু ক’জন পারেন সেই সুখের ফুলটি নিজের জন্যে ফোটাতে? তারপরও প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চলে জীবনের সঙ্গে। সমস্ত বাধা, ভয়, ভীতি, মৃত্যুকে জয় করে প্রবাসীরা এগিয়ে যান সামনের দিকে তাদের সোনালি স্বপ্নের ডানায় ভর করে। এই যাত্রাপথের কি কোনো শেষ আছে?