বিয়ের গল্পের আগের গল্প
ছেলেটার চেহারা অনেকটা জনি ডেপের মতো। তানি আড়চোখে আবার তাকাল। হ্যাঁ, একটা আদল আছে জনি ডেপের। নামটাও সুন্দর। তীর্থ। তানি ভাবছে, এর প্রেমে কি পড়া যায়? তীর্থ নামক জনি ডেপকে কি ভালোবাসা যায়?
তানির এলোমেলো চিন্তারাজ্যে বাদ সাধল তার বাবার কথা। সাজ্জাদুর সাহেব বললেন, ছেলে আর মেয়ে আলাদা একটু কথা বলুক।
সবাই বিষয়টার গুরুত্ব অনুভব করলেন। রেস্টুরেন্টটা বেশ ছোট। আলাদা কথা বলার পরিবেশ নেই। অগত্যা তানির মা–বাবা ও তীর্থের বাবা উঠে চলে গেলেন রেস্টুরেন্টের বাইরে।
তানি এতক্ষণ আড়চোখে ভালোই দেখছিল। এখন লজ্জায় মাথাটাই ওঠাতে পারছে না। অথচ খুব মন চাইছে জনি ডেপের আদলে তীর্থ সাহেবকে একটু মনভরে দেখার। কী বেসামাল অবস্থা!
তীর্থই কথা শুরু করল, ‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করার ইচ্ছে ছিল না। আমার খুব প্রেমে পড়ার সাধ ছিল। কোনো এক মায়াবী রমণীর প্রেমে মাতাল হয়ে পাগলামি করার পরিকল্পনা ছিল। আমি সেসব কিছুই করতে পারিনি। কেন জানেন? বায়োডাটায় আপনার ছবিটা দেখে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। মাথা থেকে তানিকে সরাতেই পারছিলাম না। আপনার মুচকি হাসিটায় আমি প্রেমে পড়ে গেছি!’
তানি চোখ তুলে তাকাল। জনি ডেপ এ কী বলছে? এগুলো কী তানির বলার কথা না? উষ্কখুষ্ক চোখে কাতর তানি কী বলবে ভাবছিল...।
তীর্থ আবার বলতে লাগল, ‘আপনি ভাবছেন ফরমাল এই প্রথম আলাপেই আমি এসব কেন বলছি? আসলে এই যুগে তো কেউ সহজে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করতে চায় না। আপনি ভাবতে পারেন আমি কেন চাইছি? তাই ক্লিয়ার করলাম আরকি! একইভাবে আপনার যদি কোনো আপত্তি থাকে, নির্দ্বিধায় আমাকে বলতে পারেন। আমি আপনার প্রেমে পড়লেই যে আপনারও আমার প্রেমে পড়তে হবে, তেমন কোনো কথা নেই।’
বাঙালি পরিবারের উৎসুক কৌতূহলী বাবা–মায়েরা ততক্ষণে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেই ফেলেছেন। অপরিচিত দুটো ছেলেমেয়ের আলাদা আর এত কী কথা থাকতে পারে।
তানি তার বাবার শব্দ পেয়ে পেছনে তাকাল। ওই যে দরজা দিয়ে ঢুকছেন আর কিছু একটা নিয়ে তীর্থর বাবার সঙ্গে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছেন।
তানির মনে পড়ল, তার মতো রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, যে কিনা বাবাকে ভীষণ ভয় পায়, সে কী করে প্রেম করার কথা ভাববে? তবু সেও তো প্রেমে পড়তে চেয়েছিল। এখনো চায়। কী করে বোঝাবে এ কথা?
তাড়াতাড়ি তীর্থের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার কস্মিনকালেও কোনো প্রেম ছিল না, তীর্থ সাহেব। আমি তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে আছি মা–বাবার পছন্দের পাত্রকেই স্বামী বলে মেনে নিতে!’
তীর্থর মুখের ভাবটা আর দেখা হলো না তানির। সবাই তাদের টেবিল পর্যন্ত চলে এসেছে। তানি চোখ নামিয়ে ফেলল দ্রুত। কানে বাজল কিছু কথা।
তীর্থই বলছে, ‘আংকেল, আন্টি এবং বাবা, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমার ও তানির একে অপরকে পছন্দ হয়েছে। এখন আমাদের আরও অনেক কথা বলা দরকার। অনেক কিছু জানা দরকার। যেহেতু পছন্দ হয়ে গেছে, তোমরা বাকি কথা বলে বিয়ের কাজ শুরু করে দাও। আমি তানির সঙ্গে একটু ঘুরে আসার অনুমতি চাইছি। আংকেল, আপনার মেয়েকে আমি ঘণ্টাখানেক পর বাসায় দিয়ে আসি?’
দুই পরিবারের মুরব্বিরাই তীর্থর আবেদনকে সানন্দে মেনে নিলেন। অত্যন্ত সহজভাবে অসাধ্যসাধন করে তীর্থ তানিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
তানি যেন এখনো ঘোরের মধ্যেই আছে। তীর্থ এ রকম কিছু ঘটাবে তা সে কল্পনাও করেনি। তীর্থর আর কী এমন কথা থাকতে পারে? তার এত রক্ষণশীল বাবা তাকে এভাবে ছেড়ে দিল কেন? প্রশ্নগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু তীর্থর দিকে তাকালেই আর কোনো কথা বেরোচ্ছে না মুখ থেকে।
তীর্থ ঝটপট একটা রিকশা ধরে তানিকে উঠতে বলল।
রিকশা চলতে শুরু করলেই তানির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই মুচকি হাসির কন্যা? আমায় ভালোবাসবে?’
তানির এবার রাগ হলো ভীষণ। ‘আচ্ছা, আপনি ভাবেন কী নিজেকে? কোন সাহসে বাবার কাছ থেকে আমাকে এভাবে টেনে আনলেন?’
: তোমার বাবা যে আমাকে ভীষণ পছন্দ করে তানি!
: মানে কী? কেন? কীভাবে? আজই তো দেখা হলো।
: নাহ! তোমার বাবা আর আমার বাবা পরিচিত। আমাকে তোমার কথা বলেছিল যখন, আমি একদম অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে বিশ্বাসী ছিলাম না। কারও প্রেমে না পড়ে কি তাকে নিয়ে ঘর বাঁধা যায়, বলো? তারপর তোমার ছবি দেখে দিওয়ানা হয়ে গেলাম। কিন্তু আংকেল বলল, তুমি নাকি সব পাত্রপক্ষকে ফিরিয়ে দিচ্ছ? কেউ নাকি তোমার মন জয় করতে পারছে না। তখন আংকেলকে বললাম আমাকে একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য। আরও বলেছিলাম আজ দেখাদেখির সময়ে আমাকে কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে। আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। তবেই আমি বুঝতে পারব তুমি আমায় পছন্দ করেছ কি না। আর সে জন্যই তো আংকেল একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন তোমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরোবার কথায়।
: তা, আপনার কেন মনে হলো আমি আপনাকে পছন্দ করেছি?
: আরে বোকা মেয়ে! আমায় পছন্দ না করলে আমি যখন তোমায় নিয়ে বেরোতে চাইলাম তুমি প্রতিবাদ করতে না? বেরোতে অস্বীকার করতে না? দেখো, দিব্যি খুশি খুশি মনে চলে এসেছ।
: আপনি দেখছি মহা চতুর! এত আত্মবিশ্বাসী আর স্পষ্টভাষী হলে বুঝি মেয়েদের মন জয় করা যায়?
: একদম না। আমি জানি না মেয়েদের মন জয় করার মন্ত্র। আমি শুধু আংকেলের কাছে শুনেছি তুমি অসম্ভব জেদি। বাবার কথায় সম্মান করে প্রেমট্রেম করোনি। কিন্তু শর্ত দিয়েছ, এমন কাউকে বিয়ে করবে, যাকে দেখামাত্র তুমি ভালোবাসতে পারবে। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট না কী বলে, সেটা। তুমি জানো, আংকেল হন্যে হয়ে তোমার শর্তের উপযুক্ত পাত্র খুঁজছে? তাই তো আমি তোমার কাছে জানতে চাই, আমায় কি ভালোবাসা যায়, তানি?

তানির শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। ঠিকই তো। দুই বছর ধরে বাবা তাকে পাত্র দেখাচ্ছে। কেন যেন কাউকে ভালো লাগে না। মা–বাবা বিয়ে নিয়ে চিন্তিত। জেদি তানি একের পর এক সম্বন্ধ বাতিল করছে। পারতপক্ষে সে আসলে এত জেদ দেখাত না। তার কেবল ভয় হয়। একটি ভালোবাসাহীন সংসারের ভয়। তার মনে হয় সে বুঝি লোকদেখানো বিয়ে করে ঘর সংসার করবে। তার বুঝি কাউকে ভালোবাসা হবে না। তার জীবনে হয়তো প্রেম আসবে না!
তানি তীর্থর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তীর্থ সাহেব, আপনাকে আমার সত্যিই পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আপনি কি কারণটা বলতে পারবেন?’
: আমি যে মেয়েটার প্রেমে টালমাটাল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছি, সেই মেয়েটা আমাকে পছন্দ করেছে, এর চেয়ে বেশি আমার আর কিছু জানার নেই! তোমার কারণ তুমি তোমার কাছেই রাখো। আমায় একটু আজকের দিনটা উদ্যাপন করতে দাও। দেখো, আমি চিৎকার করে আজ শহর মাতাব।
তীর্থর চিৎকারে দুই কান চেপে ধরল তানি। সে বুঝল, এই ছেলেকে বলা যাবে না যে সে দেখতে অনেকটা জনি ডেপের মতো। তাহলে হয়তো উত্তেজনায় লাফ দিয়ে এই মাঝরাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট করে বসবে। তানি তখন কাকে ভালোবাসবে? সে যে নিজের অজান্তে এই ছেলেকে মনপ্রাণ দিয়ে বসে আছে। আচ্ছা, এত চমৎকারভাবে প্রেমে পড়া যায়? এত দ্রুতও প্রেম হয়? তীর্থর উৎফুল্ল চোখের গভীরতায় সে দেখতে পেল ভালোবাসার অতলসাগর। মুগ্ধ তানি সেই সাগরে ডুবতে ডুবতে একটু সংকোচে তীর্থর হাতটি ছুঁয়ে দিল।
কাজী সাবরিনা তাবাসসুম: মিলান, ইতালি।