বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রতিকার

ঘূর্ণিঝড় আইডা লুইজিয়ানায় আঘাতের সময় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে একটি গাড়ি যাচ্ছে। ক্যানাল স্ট্রিট, নিউ অরলিন্স, আমেরিকা
ছবি: এএফপি

কয়েক দিন আগে প্রতিবেশী দেশের নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও লুইজিয়ানায় হারিকেন আইডাহর প্রভাব দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। এ পর্যন্ত ৫০ জন আমেরিকান মারা গিয়েছেন বন্যায় ও বেসমেন্ট ডুবে। অবিশ্বাস্যভাবে ঘটনা ঘটেছে উন্নত দেশটিতে, যা সচরাচর চিন্তা করা যায় না। তাঁদের পরিবারকে সহানুভূতি জানাই। এত দিন শুধু মুভিতেই দেখেছে মানুষ, কিন্তু এখন টেলিভিশনে দেখছে। লেখকেরা কল্পনা করে লেখেন, কিন্তু তাঁদের ব্রেন বিজ্ঞানের সঙ্গেই চলে। বাস্তবে তেমনই ঘটে থাকে উপযুক্ত সময়ে। একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম ‘Scientists linking fossil fuels with climate change and The climate change began in 1960।’ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অনেক ফিকশন মুভি হয়েছে, কেউ গুরুত্ব দেয়নি, সময় এসেছে গুরুত্ব দেওয়ার।

পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট ও পরিবেশদূষণ পুরোপুরি মানবসৃষ্ট। বনজ সম্পদের ধ্বংস, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে যথেচ্ছ ব্যবহারে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ব্যাপক হারে বাড়ছে, যা গ্রিনহাউস ইফেক্ট নামে পরিচিত। গ্রিনহাউস ইফেক্টের কারণে সমুদ্রের পানি অনেক বৃদ্ধি পাবে ও সমুদ্র উপকূলীয় অনেক দেশই পানিতে ডুবে যাবে। মানবজাতির জন্য এটি মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়লে টর্নেডোর আবির্ভাব হয়। নদী–সমুদ্রের পানি আয়তনে ফুলে–ফেঁপে ওঠে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পৃথিবী তছনছ করে দেয়, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সম্ভবত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবটা দিন দিন পৃথিবীর ওপর উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়ে চলেছে। দেশে দেশে দাবদাহে আগুন লেগে বনাঞ্চল শেষ হয়ে যাচ্ছে, মানুষও মারা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে আমাদের বিশ্বকে রক্ষা করতে হবে। কোনো দেশই রেহাই পাবে না, এখনই সতর্ক না হলে।

বিশ্বে যুগে যুগে মহামারি এসেছে, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের যুগে এমনটি বেমানান। মাদার নেচারে কাউকে বা কিছুকে পরোয়া করে না, তেমনই কাউকে নিরাশও করে না, যার যা প্রাপ্য শোধ করে দেয়। প্রকৃতির প্রতিশোধ ও প্রতিদানকে আমাদের সম্মান করতে ও মনে রাখতে হবে। প্রাণঘাতী এ ভাইরাস দিয়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, তছনছ করেছে তাদের উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, ভেঙে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা, সরকার দেশে দেশে দিশেহারা অবস্থায় হিমশিম খাচ্ছে। প্রকৃতি মাতা কোভিড-১৯ দিয়ে অস্বাভাবিক পরিবেশ বানিয়ে মানুষকে স্বাভাবিক জিনিস অবলোকনের সুযোগ করে দিয়েছে। বৃক্ষ নির্জীব, জড়, কিন্তু প্রাণ আছ হয়তো তার ভাষাও আছে। বিশ্বের বৃক্ষনিধনে অক্সিজেন ঘাটতি হয়েছে ব্যাপক।সেটিও একটি অন্যতম বার্তা। যে যে অঞ্চল দূষিত বাতাস আর কার্বন মনোক্সাইডে বিষাক্ত, সেখানেই করোনার প্রভাব বেশি। পৃথিবীতে সৃষ্টির পর সৃষ্টিকর্তা উদ্ভিদ সৃষ্টি করেছে। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে কার্বন ডাই–অক্সাইড গ্রহণ করে, অক্সিজেন ত্যাগ করে। পরিবেশ থেকে মানুষ শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে বায়ু থেকে সেই অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে এ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উদ্ভিদ সব মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে। উদ্ভিদ বেঁচে থাকার জন্য দূষণমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।

লড়াই করার জন্য ইমিউনিটি অর্জন করতে হবে। আর এই ইমিউনিটি শক্তি অর্জনের মূল উৎস প্রকৃতি। প্রয়োজনীয় সবকিছুই আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাই প্রকৃতি থেকে, যে প্রকৃতি তার দানের অপার ভান্ডার অবারিত করে দিয়ে যাচ্ছে, আমাদের সেই প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে, যত্ন করতে হবে। কোনোভাবে ধ্বংস করা যাবে না। প্রকৃতি বিরূপ হলে আমরা বাঁচব না। প্রকৃতিকে রক্ষা করলে রক্ষা পাবে মানুষ। প্রকৃতি ধ্বংস করলে বিভিন্নভাবে মানুষ করোনার মতো লাখো কোটি জীবাণু দ্বারা বিপর্যস্ত হতে পারত। হয়তো মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্বময় করোনার তাণ্ডবে মানুষ যখন অসহায় হয়ে ঘরে বন্দী, প্রকৃতি তখন ফেলছে স্বস্তির নিশ্বাস। প্রকৃতি হয়তো প্রতিশোধ নিতে নয় বরং প্রতিরক্ষার জন্যই–বা প্রাণিকুলকে বৃহত্তর ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে এ ক্ষুদ্রতর ক্ষতি, একটি শিক্ষা। পৃথিবী শুধু আমাদের বা মানুষের একার নয়, সব জীবজন্তু, উদ্ভিদ, লতাপাতার। পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করছে মানুষই, আর সেই ভারসাম্য বা হিলিং করছে পৃথিবী তার নিজস্ব উপায়ে।

পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নয়ন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনের লক্ষ্যে দ্রুত সক্রিয় হতে হবে সভা সমিতি, মিটিং কম করে। পরিবেশদূষণের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জনজীবনের ওপর। গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে বরং করতে হবে বৃক্ষরোপণ। পোড়া ইট তৈরি বন্ধ করা, স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর ধোঁয়া বা ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণকারী যানবাহন একদম বাতিল করা। অতি দ্রুত প্রয়োজন নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়, দিঘি, পুকুর, ঝরনা বা জলাশয় সংরক্ষণ করা। বিশ্বের দেশে দেশে পরিবেশদূষণ, বন্যা, দাবদাহ আগুন লাগা, নতুন নতুন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার আগমন, সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য, উদ্ভিদের ক্ষতি সবকিছুই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার ফল। ভারসাম্যহীনতা বিশ্বজগতের জন্য একটি বিরাট হুমকি, সে কারণে মানব ও প্রাণিজগতের অস্তিত্ব চরম সংকটে। মানুষের সচেতনতাই পারে বিশ্বকে রক্ষা করতে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি হোক। বিধিনিষেধের ফলে বাতাসের মান উন্নত হয়েছিল। Air Quality Index (AQI) বা বাতাসের মানের সূচকের মান বেড়েছে।

পৃথিবীর ওজোন স্তরের ফাঁকা স্থান অদ্ভুতভারে পূর্ণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে আর্কটিকে লাখ লাখ স্কয়ার কিলোমিটার প্রশস্ত ওজোন স্তরের গর্ত আর দেখা যায় না। কোভিডকালে লকডাউনের কারণে দূষণ কমেছে, প্রকৃতিতে ভালো প্রভাব ফেলেছে। মানুষই হয়তো পৃথিবী মাতার মূল ভাইরাস, মূল সমস্যা যারা, তার ভারসাম্য নষ্ট করছে।

*লেখক: রোমেনা হক রুমা, টরন্টো, কানাডা।