বিদেশে আমাদের দীনতা

বিদেশে আসার পর বাংলাদেশিরা প্রথম যে জটিলতায় ভোগেন, সেটা হলো ধর্ম। বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একমাত্র দেশ, যার রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কিন্তু সংস্কৃতি বাঙালি। বাংলাদেশিরা ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির এমন বৈপরীত্য একই সঙ্গে ধারণ করে আসছে অনেককাল ধরেই। সেটা আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিরা জাতি হিসেবে বেশ নবীনই বলা চলে। তার আগেই প্রতিবেশী দেশ দুটি থেকে মানুষ বিদেশে এসেছে এবং নিজের দেশের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। দেখতে মোটামুটি একই শারীরিক গঠনের হওয়াতে বিদেশে বাংলাদেশিদের রীতিমতো যুদ্ধ করেই বাংলাদেশি পরিচয়টা দিতে হয়।
যা হোক, বাংলাদেশি মুসলমানেরা অমুসলিম দেশে আসার পর নামাজ ও বাকি ধর্মীয় রীতিনীতিগুলো পালনের জন্য তাদের বিদ্যমান ধর্মীয় ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হয়। তাই তারা আমাদের উপমহাদেশের আরেক বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে দ্রুতই মিশে যান। অন্যদিকে হিন্দি সিরিয়াল দেখে দেখে হিন্দি রপ্ত থাকায় তাদের সঙ্গে কথাবার্তাতেও সমস্যা হয় না। এমনকি তারা অনেক টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েদের মুসলিম প্রাইভেট স্কুলেও পড়তে পাঠান। যদিও তারা বেশির ভাগই ট্যাক্স ফাঁকি দেন। আমরা সে আলোচনায় যেতে চাচ্ছি না। এতে করে কোমলমতি ছেলেমেয়েদের মধ্যে খুব ছোট থেকেই ধর্ম বিষয়ে বেশ কট্টর ধারণা তৈরি হয়।
আমার পরিচিত একটি পরিবারের দুই সন্তানই মুসলিম প্রাইভেট স্কুলে যায়। তাদের মধ্যে ছোটটিকে নিয়ে সেই পরিবারের সবাই গর্ব করে এই বলেন যে, সে অনেক বুদ্ধিমতী ও মেধাবী। সেই মেয়েটা একদিন আমাদের বাসায় এসে একটা অস্ট্রেলিয়ান চ্যানেলের প্রোগ্রামে একজন অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রমহিলার পোশাক–পরিচ্ছদ দেখে আমাকে প্রশ্ন করল, তিনি কেন হিজাব পরেননি? আরেক দিন সেই একই শিশু পূজা দেখতে যাওয়া নিয়ে তার অবস্থান এভাবে ব্যক্ত করল, পূজা তো মুসলমানদের জন্য হারাম। একেবারে শৈশব থেকেই এমন ধারণা নিয়ে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠবে, তারা আর যাই হোক পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে না।
পোশাকি দৈন্য
পৃথিবীর বুকে প্রত্যকে জাতিরই নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আছে। আর সেগুলোর প্রতিফলন রয়েছে তাদের পোশাক পরিচ্ছদে। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতির প্রকোপে বাংলাদেশিরা যেখানে নিজের দেশে বসবাস করেই নিজেরদের পোশাক পরিচ্ছদকে খ্যাত মনে করে সেখানে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে সেটা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। বেশ কিছু কারণে বাংলাদেশিদের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে বাংলাদেশি সংস্কৃতির আবহ হারিয়ে গিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতি স্থান করে নিয়েছে। প্রথমত বিদেশের মাটিতে দেশীয় পোশাকের অপ্রতুলতা। এখানে বাংলাদেশিদের যেসব ফ্যাশন হাউসগুলো আছে তারা সুন্দর সুন্দর বাংলা নাম নিয়ে ভারতীয়, পাকিস্তানি, ইরানি ও আফগানি পোশাকের রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছেন। কিছু ফ্যাশন হাউস দেশীয় পোশাক আমদানি করে ব্যবসা করার চেষ্টা করেও সেভাবে সফলকাম হতে পারেনি। তবুও হাতেগোনা দু-একটি ফ্যাশন হাউস চেষ্টাটা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে সফলতা পেতে শুরু করেছে। বিদেশি পোশাকগুলোর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হচ্ছে আমরা আমাদের দেশীয় পোশাক পরিধান করাকে তথাকথিত স্মার্টনেস হিসেবে দেখি না। এমনকি বিদেশি পোশাকের তুলনায় দাম একটু কম হওয়াতে নিজের প্রেস্টিজ খাটো হওয়ার ভয়ে আমরা সেগুলো পরতে চাই না। এভাবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে পরবর্তী প্রজন্মও দেশীয় সাজ-পোশাকের প্রতি অবজ্ঞা নিয়ে বেড়ে উঠছে।
সাংস্কৃতিক দৈন্য
বিদেশ বিভুঁইয়ে আসার পর সবচেয়ে বড় যে জটিলতায় বাংলাদেশিরা ভোগেন সেটা হলো সাংস্কৃতিক দৈন্য। বাংলাদেশের পঞ্জিকা বর্ষের বারো মাসে তেরো পার্বণ পালন এখানে সম্ভব হয় না ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত ভিন্নতার কারণে। তবুও অন্নপ্রাশন, হাতেখড়ি, পয়লা বৈশাখ, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শোক দিবস ও বিজয় দিবসের মতো উৎসবগুলো শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতাতেই সীমাবদ্ধ। পাশাপাশি বাংলাদেশিদের একাধিক দল ও উপদল থাকার কারণে এই অনুষ্ঠানগুলোও তার পরিপূর্ণ জাঁকজমক ও জৌলুশ হারিয়ে ফেলে। এ ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, বেবি শাওয়ারের মতো যে অনুষ্ঠানগুলো করা হয় সেখানে বাঙালি ঐতিহ্যের মিশেল খুব সামান্যই খুঁজে পাওয়া যায়।

অস্ট্রেলিয়াতে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্ম তাই বেড়ে উঠছে একেবারেই শিকড়হীন পরগাছা হিসেবে। এখানে অভিভাবকেরা বাংলাদেশের অভিভাবকদের মতো তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু লেখাপড়াতেই ভালো করানোর জন্ম আদাজল খেয়ে লেগে আছেন। তাই এখানেও প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিং ব্যবসার রমরমা। যার ফলে ছেলেমেয়েরা পুথিগত বিদ্যায় পারদর্শী হচ্ছে কিন্তু কমিউনিকেশন স্কিলে ল্যাগ থাকার কারণে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। তারা খুব সামান্য সময়ই দিতে পারে সিলেবাসের বাইরের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে। ফলে তারা বাংলাদেশি সংস্কৃতির চর্চাতো অনেক দূরের ব্যাপার তারা অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও খুব বেশি একটা পরিচিত হচ্ছে না। আর এই ছুঁচো দৌড়ে কে কার আগে পৌঁছাবে সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে শিশুদের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম এক প্রজন্ম। ফলে এই প্রজন্ম একদিকে যেমন অস্ট্রেলীয় হিসেবে বেড়ে উঠছে না অপরদিকে শেকড়হীন কচুরিপানার মতো ভাসমান প্রজন্ম হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। হাতেগোনা কিছু অভিভাবক এর ব্যতিক্রম এবং তাদের বাচ্চারা দুনিয়ার সকল খোঁজ খবর রেখে অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতি ও বাংলাদেশি সংস্কৃতির মিশেলে এক অল রাউন্ডার প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠছে, যেটা হওয়ার কথা ছিল প্রত্যেকটা শিশুর ক্ষেত্রে।
ভাষাগত দৈন্য
বাংলাদেশিরা পৃথিবীর বুকে একমাত্র জাতি যারা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্য দেহের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছে এবং যার মধ্যে নিহিত ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সুপ্ত বীজ। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত একটি রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠনের কয়েক বছরের মধ্যেই জাতীয়তাবোধের পার্থক্য মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। যার প্রথম ধাপ ছিল ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করা। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো বাংলাদেশিদের ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মান প্রদান করে এবং বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদায় সেটা পালিত হয়ে আসছে।
ভাষা কেন একটি জাতি থেকে অন্য জাতিকে আলাদা করে দেয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিদেশে এলে। আমরা সবাই জানি ভারত-পাকিস্তান চির বৈরী রাষ্ট্র। কিন্তু যেহেতু তাদের কথ্য ভাষা প্রায় একই তাই তাদের মধ্যে খুব সহজেই যোগাযোগ তৈরি হয়ে যায়। কেউ আলাদা করে যদি বলে না দেয় যে উনি ভারতীয় আর উনি পাকিস্তানি তাহলে বাইরে থেকে বোঝা আসলেই অনেক কষ্টসাধ্য। এমনকি এই দুটি রাষ্ট্রের জন্ম একই সালে। এক দিন আগে পরে। তাদের জাতীয়তাবোধেরও তেমন কোনো ব্যবধান নেই।
বিদেশে পাকিস্তানিরা এমন একটা ভাব করে, যেন বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে তারা ছোট ভাই হিসেবে মাফ করে দিয়েছে। আর ভারতীয়রা মনে করে বাংলাদেশ আসলে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি, আসল যুদ্ধটা তারাই করে বাংলাদেশকে স্বাধীনতাটা উপহার হিসেবে দিয়েছে। তাই তাদের মধ্যে গলায়-গলায় পিরিত। দুজন পাকিস্তানি-ভারতীয় কথা বললে সেখানে একজন বাঙালি থাকলে মোটেও গ্রাহ্য করা হয় না। আর বাংলাদেশিরা কেন হিন্দি-উর্দু জানে না সেটা নিয়েও তাদের মধ্যে এক ধরনের বিস্ময় কাজ করে। কিন্তু তারা জানেই না বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্মই হয়েছিল ভাষাগত ব্যবধানের শুরু দিয়ে।
বাংলাদেশে এখন আকাশ সংস্কৃতির গ্রাসের ফলে হিন্দি বলাটাকে স্মার্টনেস হিসেবে দেখা হয়। তাই এ দেশে আসা নতুন প্রজন্মও নিজেদের আরও বেশি স্মার্ট প্রমাণ করার জন্য ভারতীয় বা পাকিস্তানিদের সঙ্গে হিন্দি-উর্দুতে কথা বলা শুরু করে। আমার ধারণা এটা দেখে ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা মনে মনে হাসে। যা হোক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং এখানকার পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে ইংরেজির বিকল্প নেই। কিন্তু এর বাইরে বাংলাদেশিরা যদি নিজেদের পরিবারে বাংলার চর্চাটা ধরে রাখে তাহলে অন্তত বাংলাদেশি জাতীয়তাবোধের প্রথম লক্ষ্যটা পূরণ হয়। কিন্তু তাদের বাচ্চারা বাংলা বলতে পারে না। এটা নিয়ে বেশির ভাগ বাংলাদেশি অভিভাবককেই দেখা যায় গর্ববোধ করতে। এমনকি কিছু অতি শিক্ষিত অভিভাবককেও দেখা যায় গর্ব করে বলতে যে, তার বাচ্চা ইংরেজির বাইরে আরও একটা ভাষা জানে সেটা হচ্ছে হিন্দি।

মানসিক দৈন্য
মানুষের মন সৃষ্টিকর্তার এক আজব সৃষ্টি। আসলে এটাই সৃষ্টির অন্য সকল সৃষ্টিকুল থেকে মানুষকে আলাদা করেছে, করেছে উন্নত। কিন্তু আবার এই মানুষই এটার খারাপ ব্যবহারের ফলে অন্য সৃষ্টিকুল থেকে নিজেদের হীন প্রমাণ করছে। তবে মানসিকতার বিকাশের জন্য একটা সুষ্ঠু স্বাভাবিক পরিবেশের দরকার হয় যাতে করে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের শিক্ষিত প্রজাতির মানুষগুলো এক আজব শিক্ষা পেয়ে বেড়ে উঠি। যেখানে প্রতিযোগিতাটাই মুখ্য। জীবনে আর্থিকভাবে যে যত বেশি লাভবান হয় তাকে তত বেশি সফল বলা হয়। আর আমরা আরও একটু বেশি সফলতার আশায় বিদেশে পাড়ি জমাই। এখানে এসে নিজের মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা আমরা একে একে সবই ত্যাগ করতে থাকি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সেই পথে পরিচালনা করি। আর যেহেতু মূল্যবোধগুলো সবই মানসিক ব্যাপার তাই সেগুলো ত্যাগ করতেও আমাদের বেশি সময় লাগে না। আর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ যাদের হাত ধরে আমাদের মূল্যবোধগুলো টিকে থাকার কথা ছিল তারা ব্যস্ত নিজস্ব ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে। রাজনৈতিক নেতারা আদর্শের কথা বলে লোক দেখানো মূল্যবোধের পরিচয় দিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধিতে ব্যস্ত। সাংস্কৃতিক নেতারা যাদের হাতে মূল্যবোধের মাপকাঠিটা আসলে থাকার কথা ছিল তারাও নিজের ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে বিভিন্ন ছাতার তলে ভিড়ে যান। আর ব্যবসায়ীরা আরও এক কাঠি সরেস। তারা দেশ থেকে নতুন আসা মানুষগুলোকে বিভিন্নভাবে শোষণ করতে থাকেন।
এ যেন বাংলাদেশেরই সামগ্রিক প্রতিচ্ছবির খণ্ড রূপ। কিন্তু খারাপ ব্যাপার হচ্ছে ষোলো কোটির দেশে এগুলো তেমন চোখে বাধে না কিন্তু এখানে এগুলো খুবই দৃষ্টি কটু দেখায়।
মো. ইয়াকুব আলী: সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। ইমেইল: <[email protected]>