
লেখক ও অধ্যাপক শরাফত হোসেনের ঘুম ভাঙল অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে। যদিও তার অ্যাপার্টমেন্ট এগারো তলার ওপর তবুও ইদানীং কোনো কিছুর সামান্যতম শব্দও সহ্য করতে পারেন না। নিউইয়র্কের রাস্তাঘাটে ফায়ার সার্ভিস আর অ্যাম্বুলেন্সের বিচরণ দিবারাত্রি। তাদের সাইরেন শোনা অনেকটা ঘুমপাড়ানি গানের মতো। বিশেষ করে কুইন্সের দিকটায়। তিনি বেড থেকে উঠে ঘড়ি দেখলেন। রাত ১২টা ২০। বেডরুম থেকে বের হয়ে লিভিং রুমে এসে দেখলেন বারান্দাসংলগ্ন জানালার পর্দা উড়ছে। জানালা খোলা ছিল বলেই হয়তো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের এই তীব্রতা। তিনি অলস পায়ে এসে জানালা বন্ধ করতে গেলেন। বাইরের রাস্তায় চোখ রাখলেন। উঁচু থেকে দেখলেন নিচের স্ট্রিটে সারি সারি গাড়ি পার্ক করা। নিজের গাড়িটিকে শনাক্ত করলেন। তার গাড়ির পাশেই ফুটপাতের ওপর একজন কালো হোমলেস ব্যক্তি পিঠে বোঝা নিয়ে বসে আছে। তার মুখের ওপর লাইটের আলো পড়াতে পেছনে তার বিশাল ছায়া মাথা দেখা যাচ্ছে। লোকটির সামনেই একটা পুলিশের গাড়ি লাইট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন পুলিশ বসে থাকা লোকটির সঙ্গে কথা বলছে। হয়তো তাকে বলছে লাইটপোস্টের কাছ থেকে অন্য কোথায় চলে যেতে। কিন্তু এত রাতে সে যাবে কোথায়? হোমলেস ব্যক্তিটির কথা ভেবে শরাফত হোসেনের মনটা বিষণ্ন হলো। জানালা বন্ধ করে দিয়ে চেয়ারে এসে বসলেন। সামনের টেবিলের ওপর রাখা তার লেখালেখির খাতাটার ওপর চোখ রাখলেন। অনেক দিন হয় একটা গল্প লিখতে শুরু করেছেন। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারেননি। তিন কী চার পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখেছেন। তবে গল্পের দুটো নাম আগেভাগেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। পিরু-বাস্তবতার শহরে কাল্পনিক যুবক। তবে শেষ পর্যন্ত এই নামটিই জয়ী হবে কিনা সে ব্যাপারে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন।
ফ্রিজ খুলে তিনি হালকা মদ্যপান করে নিলেন। তারপর টেবিলে এসে বসলেন। কিছু লিখবেন বলে কলম নিয়ে দু হাত টেবিলে রেখে কিছু সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করলেন। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ার শব্দ হলো। দরজা খুলতেই দেখেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে পিরু। তাকে কিছুটা ক্লান্ত ও বিষণ্ন দেখাচ্ছে।
হ্যালো, মিস্টার পিয়াল হক পিরু, এত রাতে তুমি কি মনে করে এলে?
জি, আপনি আমাকে স্মরণ করেছিলেন? গতরাতে প্রায় তিনটার দিকে গাড়ি চালানোর সময় আপনার টেক্সট পেলাম। আপনি দেখা করতে বলেছিলেন।
ও, হ্যাঁ, ভেতরে এসো। অনেক দিন তোমার খবর পাইনি। তুমি জান এই পৃথিবীতে আমি একা। স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন বলে আমার কিছুই নেই। একমাত্র তুমি ছাড়া। বয়সও হয়েছে। খুব শীঘ্রই অবসরে চলে যাব। তোমার কথা খুব মনে পড়ে। গতকাল খুব ইচ্ছে করছিল তোমার সঙ্গে ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির সেই পুরোনো দিনগুলো নিয়ে নাড়া চড়া করি। তোমার যদি খুব ব্যস্ততা না থাকে তাহলে আজ আমার সঙ্গে কি কিছুটা সময় থাকতে পার?
দুঃখিত, আমি আজ ক্যাব নিয়ে কাজে বের হয়েছি। কাল দুপুর পর্যন্ত কাজ করব। আপনার অ্যাপার্টমেন্টের নিচেই একজন যাত্রীকে নামিয়ে দিলাম। ভাবলাম আপনার সঙ্গে একটু দেখা করে যাই। এত রাতে আপনাকে ঘুম থেকে ওঠাবার জন্য দুঃখিত।
ইটস অল রাইট, পিরু। আমি জেগেই ছিলাম। তোমার জন্য আমার দিবারাত্রি চব্বিশ ঘণ্টাই সমান। ইউ আর ওয়েলকাম এনি টাইম ফর এনি পারপাস।
বাই দ্য ওয়ে। পিরু তুমি কি ক্যাব ড্রাইভিং কাজটাকে পারমানেণ্টলি নিয়ে নিলে? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি কম্পিউটার ফিল্ডে কোনো করপোরেট কাজ খুঁজে নিবে। আফটার অল আমেরিকা থেকে তুমি কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করা ছাত্র। ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমার আসলে প্ল্যানটা কি?
ভবিষ্যতের প্ল্যান? শব্দযুগল শুনে পিরুর চোখে বিদ্যুতের ঝলকানি খেয়ে গেল। তার কারণ কিছুটা হতাশায়, কিছুটা ক্রুদ্ধতায়। পিরুর এই হতাশা বা ক্রুদ্ধতা অতি উচ্ছ্বাসিত লেখক শরাফত সাহেব বুঝতে পারলেন কিনা বোঝা গেলা না। টেবিলের ওপর রাখা মদের বোতল থেকে কিছুটা গ্লাসে ঢালতে ঢালতে শরাফত সাহেব বলে চললেন, পিরু, আমি খবর পেলাম তুমি নাকি সিন্থিয়া এলভিস নামক একটা ব্লন্ডি মেয়েকে খুব পছন্দ কর। তোমাদের নাকি ইতিমধ্যেই দুবার দেখা হয়েছে। তাকে নিয়ে তোমার ভবিষ্যৎ প্ল্যান সম্বন্ধেও আমি কিছু জানতে চাই।
কাজ ও সিন্থিয়ার ব্যাপারে ভবিষ্যতের ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়ার প্রশ্নে পিরুর ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। এইবার সে রিবিলিয়ান বা বিদ্রোহী যুবকের মতো করে গর্জে উঠল। পিরু জন্মসূত্রেই বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন। হোক না সেটা তার সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে।
আপনিই তো আমার চরিত্রের জন্মদাতা লেখক। আমার প্রাণ, আমার জীবন, শিক্ষাদীক্ষা, দুঃখকষ্ট, ভালোবাসা, ভালো লাগা সবকিছুরই রূপকার। কেন অযথা আমাকে এই সব অবান্তর প্রশ্ন করছেন? বরং আমারই অনেক প্রশ্ন ছিল আপনার কাছে এই সব বিষয়াদি জানবার।
কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞেস করতে পার। উত্তর জানা থাকলে অবশ্যই দিতে চেষ্টা করব।
আপনি সিন্থিয়া মেয়েটিকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এত ইচ্ছুক কেন? আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি আর কী কী সমস্যা লিখে রেখেছেন? অথবা কি লিখবেন বলে মনস্থির করেছেন? শুধু একটাই অনুরোধ আমার ইমোশন নিয়ে আপনি আর নতুন কোনো খেলা খেলবেন না, প্লিজ।
সত্যি বলতে কী পিরু। তুমি পড়াশোনা জানা একটা স্মার্ট ছেলে। আমি চাই তুমি নিজের স্মার্টনেস, বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হও। নিজের সেবা কর, সমাজ ও মানুষেরও সেবা কর। আর সমস্যার কথা বলছ? এই আমাকে দেখ জীবনভর কত সমস্যার মধ্যে দিয়ে পার করলাম। সমস্যা ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মানে কি? পিরুর প্রতি শরাফত সাহেবের জিজ্ঞাসা।
দুঃখিত আপনার প্রশ্ন শোনা বা উত্তর দেবার মতো অতিরিক্ত সময় আমার নেই। আপনি আমাকে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়িয়ে এখন ক্যাব চালাতে বাধ্য করছেন। আমি সেই কাজেই যাচ্ছি এখন। আমার মাথায় আপনি অনেক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। চেষ্টা করছি কত দূর যাওয়া যায়। আমার কথাবার্তায় ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা করে দেবেন। আপনি চাইলে আবার দেখা হবে। আসি, বলে পিরু দরজা খোলা রেখেই প্রস্থান করল।
পিরু চলে যাওয়ার পর শরাফত সাহেব আরও বেশ কিছুক্ষণ লেখালেখি করতে চেষ্টা করলেন। নিজের অনিচ্ছাতে মদ্যপানও করলেন অনেকটা গভীর রাত পর্যন্ত। আবারও শুনলেন বিকট শব্দে সাইরেন বাজিয়ে নিউইয়র্কের ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। পিরুর জন্য তিনি কিছুটা ব্যথিত হলেন। সর্বোপরি তার নিজের সৃষ্টি। বেচারা পিরু। চাইলেই তাকে তিনি একটা সুন্দর লাইফ দিতে পারতেন। তা না করে তিনি পিরুর জীবনের পরতে পরতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। এই যে এত রাতে তিনি আরাম আয়েশের মধ্যে মদ পান করছেন অথচ ঘুমহীন পিরু বেচারা ক্যাব নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা মেয়েকে সে খুব পছন্দ করে কিন্তু মেয়েটিকে কাছে পাওয়ার ব্যাপারে পিরুর ভাগ্যে সুপ্রসন্ন হবে কিনা কে জানে। পিরুকে নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা করতে করতেই শরাফত সাহেব টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। (চলবে)
আগের দুই পর্ব পড়তে ক্লিক করুন:
নিউইয়র্কের আকাশে বৃষ্টি
পিরু ও তার হলুদ ট্যাক্সি