বাণী-অর্চনার প্রস্তুতি চলছে

বিদ্যাদেবী সরস্বতী পূজা হবে। এ জন্য হিন্দুপল্লির শিক্ষার্থীরা ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। শুধু ছাত্রছাত্রীরা কেন, তাঁদের  মা-বাবা বা কর্মজীবী ভাইবোন পর্যন্ত এর বাইরে চিন্তা করতে পারছেন না। এ জন্য দেশ বা প্রবাসের স্কুল-কলেজ ধরে মণ্ডপ নির্মিত হচ্ছে। এই দৌড় থেকে আবুধাবিও পিছিয়ে নেই। শিল্পনগর মোসাফফাহ্তে চলছে জোর প্রস্তুতি।

শিক্ষার্থীরা বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন কীভাবে কী হবে। সাদা ফোম বোর্ডে দেবীর ছবি বসিয়ে মূর্তি নির্মাণের কথা ওঠে। প্রাথমিকভাবে সেটাই ভাবা হয় আলোচনায়। বিষয়টির দায়িত্ব নেন রণজিৎ দেব। না, মাটির প্রতিমা ছাড়া জ্ঞানদেবীর প্রকৃত অবয়ব আসে না। গভীর ওই রাতে তাঁরা তিন বন্ধু ছোটেন ভিন্ন কোনো গন্তব্যে।
সৌদি আরব অভিমুখী তারিফ রোড ধরে সোজা এগিয়ে প্রায় ৫০ মাইল পেরিয়ে বাঁক নেন ডান দিকে। গাড়ি হেঁকে কনকনে শীতের মধ্যে যান বহুদূরের দাবাইয়া এলাকায়। আবুধাবির ধনাঢ্যরা এখানে গড়ে তুলেছেন সপ্তাহের খসে পড়া দিনের বিনোদনপল্লি।

গ্রামকে ভাগ করা রাস্তা ধরে তাঁরা নিয়ন বাতিকে বিদায় জানিয়ে পৌঁছে যান আরব সাগরপাড়ে। সংগ্রহ করেন মূর্তি বানানোর উপযোগী কাদামাটি। এ সময় দূরের আকাশই কেবল তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ঘোষণা করেছিল। তারারা হাসল, কৃতজ্ঞতা জানালেন তাঁরা। শাওয়েল চলতে থাকল জোড়া হাতে। বালুর সংস্কৃতির এই দেশে তাঁরা কাদামাটির বস্তা ভরলেন মনের আনন্দে। অপু দাশ বললেন, সে যে কী অনুভূতি! যেন বীণাপাণির স্পর্শ পেয়ে গেলাম। এরপর খোঁজা হলো লাল রঙের মাটি, পাওয়াও গেল। সাগর কান্তি শীল আর জীবন শীল ছিলেন সঙ্গে। মুখের হাসিতেই বোঝা যায়, আহা কী আনন্দ!

এরই মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে রিজেন দেবের সঙ্গে। তিনিও পেলেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত কাজটি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সন্তান জাত মৃৎশিল্পী। ঘাস জোগাড় হয়ে গেল। আলাদা করে নেওয়া হলো গ্যাস সিলিন্ডার। উদ্দেশ্য, গ্যাস জ্বালিয়ে শুকিয়ে নেওয়া হবে দেবীর শারীরিক কাঠামো।

কাজ চলে দুর্বার গতিতে। সিদ্ধান্তের হেরফের হয় না। পূজার উপাচার কেনার দায়িত্ব নেন অনুপম ধর। প্রসাদ তৈরিতে যে মালমসলার প্রয়োজন, তা-ও সংগ্রহ করবেন তিনি। এত কাজের বোঝা, তাতেও না নেই। এরই ফাঁকে বাগদেবীর মডেল পাঠালেন দেওড়ির কাছে। লিখে দিলেন সংস্কৃত শ্লোকের বাংলা অনুবাদ। হে সরস্বতী মা! আমরা শুধু বই পড়ে বিদ্যান হতে চাই না, চাই বিশাল মনের মানুষ হতে।

কার্তিক চক্রবর্তী পরামর্শ দিচ্ছিলেন। সময় কম, কাজেই কাজ করতে হবে দ্রুত। ঠিক করা হলো সাজসজ্জার কাজে নিয়োজিত থাকবেন জীবন শীল, রাজীব দে। আলাপে ছিলেন কানুলাল দাস। ব্যানারটি কেমন হবে, সে বিষয়ও চূড়ান্ত করা হয়। বাণী-অর্চনা ২০২২। মোসাফফাহ, আবুধাবি। সঞ্জয় শীল বললেন, প্রিন্ট হওয়ার আগে আরেকবার দেখা প্রয়োজন। রণজিৎ দেব বললেন, তা হবে, তা হবে।

প্রসাদ প্রস্তুতির বিষয়টি আসে তারও আগে। এবার কিন্তু মিলন কান্তি ধর হাল ধরলেন। দুপুরে হবে সবজি, বিরিয়ানি, ডাল। আর সন্ধ্যার প্রসাদে থাকবে নিমকি, জিলাপিসহ আরও মিষ্টি। রূপন দাস বললেন, চমৎকার! প্রকৌশলী সঞ্জয় পালের মুখে তখন ভালো লাগার হাসি। প্রদীপ দত্ত বললেন, এমন সুন্দর পরিকল্পনাও কিন্তু সবাই নিতে পারে না। লিটন মল্লিক এবং তিলক তালুকদার একই সঙ্গে মাথা ঝাঁকালেন। বললেন তাই তো!
প্রসেনজিৎ শীল মূর্তি নির্মাণের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন হলঘর। মাটির কাজ এখন চলমান। শেষ খবরটি এমন। মূর্তির কাজটি চলছে দ্রুত, তবে সাবধানতার সঙ্গে। কতটুকু উত্তাপে মাটি শুকাবে, সে খবর দেওড়ি ভালো করেই জানেন। ভেতরের ঘাস, তারও নিয়ন্ত্রণ বিশেষ যত্নে।

অঞ্জলি হবে সারা দিন। তবে শুরুটা হবে সকাল সকাল। শিশু-কিশোর ও নারীরা আসবেন যথাসময়ে। তাঁদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথাও ওঠে আলোচনায়। অনিবার্য একটি কারণে প্রস্তুতি কর্মের শুরুটা হয় দেরিতে। তাই তো আমার পক্ষ থেকেও প্রতিটি মুহূর্তের খবর নেওয়া হয়ে ওঠে জরুরি।

পূজার সাজসরঞ্জাম ধুয়ে-মুছে ঠিকঠাক হচ্ছে। গোটা কর্মযজ্ঞের জন্য মণ্ডপ নির্মাণের কাজ চলছে। এ জন্য প্রমোদ পাল তাঁর বিরাটকায় হলঘর উৎসর্গ করেছেন।

াফসুতরো করার বিষয়টিও চলছে। ছোটখাটো মেরামতের কাজটিও বাদ পড়ছে না। সুন্দর একটি অঙ্গন নির্মাণের ব্যাপার যে!

প্রমোদ পাল ঈশ্বর বিশ্বাসের বার্তাটি দেন প্রতিটি কথায়। তাঁর সঙ্গে কথা হয় ফোনে। ‘কী ব্যাপার দাদা, খোঁজ নিই কাজকর্মের।’ বলেন, ‘জোরকদমে চলছে বাণী-অর্চনার প্রস্তুতি। যোগ করেন, ঠাকুরের কৃপায় উতরে যাব আমরা।’ আমি বলি, ‘কত শতাংশ।’ বলেন, ‘ষোলো আনা।’