ফিরে দেখা অভিবাসন

প্রতীকী ছবি। ইন্টারনেট থেকে নেওয়া
প্রতীকী ছবি। ইন্টারনেট থেকে নেওয়া

পৃথিবীতে মাইগ্রেশন প্রথা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ব্যবসা, বাণিজ্য বা একটু ভালো জীবনের আশায় মানুষ তার নিজের জন্মস্থান ছেড়ে নিজের দেশের মধ্যে অথবা অন্য কোনো দেশে মাইগ্রেট করে। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এখন চিত্রটা একটু অন্যরকম। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখন তারাই মাইগ্রেট করতে চান বা পারেন, যারা দেশে ভালো একটি চাকরি করেন অথবা যার ভালো একটি ব্যবসা আছে। অর্থাৎ ভালোর জন্য আরও একধাপ ভালো থাকার ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে অনেকেই ভাবেন কীভাবে স্বপ্নের দেশ কানাডাতে মাইগ্রেট করতে পারি। নিঃসন্দেহে কানাডার সামাজিক জীবন আমাদের দেশ থেকে অনেক অনেক উন্নত। এখানে মানুষ মানুষকে হেয় করে না, রাস্তায় ধুলাবালি নেই, নেই কোনো হট্টগোল, খাবারে বিষ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। আর বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য তো এ দেশ স্বর্গরাজ্য।

লেখক
লেখক

কিন্তু যেটা কখনই আমরা আশা করি না বা করা উচিতও নয়, সেটা হলো একান্ত আমার সংস্কৃতি। এর মানে শুধু গান, কবিতা বা নাটকের কথা বলছি না। বলছি আমার আপনার সামগ্রিক জীবনযাপন ব্যবস্থা। যেই জীবনযাপনে আছে নির্মল আনন্দ, আছে বিকেল হলেই পরিবার, আত্মীয় বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। ঈদ বা পূজার ছুটিতে কষ্ট করে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া। গ্রামের নদীতে গোসল করা বা মাছ ধরা। এখানে আমাদের বেশির ভাগেরই সময় দেওয়ার সময় নেই। প্রতিনিয়ত আমরা মেশিনের মতো ছুটছি আর ছুটছি। অনেকেই জানি না গন্তব্য কোথায়। অনেক সময় দেশ থেকে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব এলে তাদেরও সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয় না। আর কাজ বা চাকরির কথা এভাবে বলা যায়, যারা অতি সৌভাগ্যবান তারা ছাড়া বাকিদের জীবন কোনো রকমে শ্রমজীবী মানুষের মতো চলতে থাকে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে।
আমরা যারা দক্ষ কর্মী ক্যাটাগরিতে কানাডাতে মাইগ্রেট করেছি তাদের জন্য বলছি। আমরা জানতাম এখানে আমাকে নতুন করে ক্যারিয়ার তৈরি করতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও প্রচুর। আমরা জানতাম চ্যালেঞ্জ আছে কিন্তু আসলেই কি আমরা জানতাম চ্যালেঞ্জের মাত্রা কতটুকু? সেটা সবাই সহ্য করতে পারবে কি না? আমার মনে হয় শতকরা ৯৫ জনই বলবেন একদম ঠিক কথা।
কানাডা সরকার আমাকে-আপনাকে ইমিগ্রান্ট করেছে আমাদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করে। কোনোরূপ দয়া করে নয়। আমাদের এ দেশে এনেছে বিশেষ জব ক্যাটাগরির অভিজ্ঞতা অনুযায়ী। আমরা কি এই দেশের প্রশাসনের কাছে এটা আশা করতে পারি না যে এখানে আমার দক্ষ এরিয়াতে যেকোনো ধরনের কাজ বা চাকরির সুযোগ থাকবে। বাস্তবতা অন্য রকম তা আমরা সবাই জানি। ভালো চাকরি পাওয়ার দুটি প্রধান শর্ত হলো আপনাকে আবার একটি পড়ালেখার কোর্স সম্পন্ন করতে হবে এবং পাশাপাশি আপনার ভালো একটি রেফারেন্স থাকতে হবে। আমরা বাংলাদেশে প্রায়ই বলতে শুনতাম আপনার মামু–খালু না থাকলে চাকরি হবে না। দেশে বসে সেই মানুষগুলো হয়তো কল্পনাও করতে পারবেন না মামু–খালুর জোর বাংলাদেশে যতটা না লাগে তার থেকেও অনেক বেশি প্রয়োজন কানাডাতে। একদিকে সংসারের খরচ অন্যদিকে নিজের ক্যারিয়ার। বাধ্য হয়ে অনেকেই যেকোনো প্রকার কাজের সন্ধানেই নেমে পড়েন। আস্তে আস্তে ভুলে যেতে চান তার অতীতকে।

এখানে প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে আমরা আসছি কেন বা ফিরে যাই না কেন দেশে। তাদের জন্য বলছি, এ দেশে আসাটা যত কঠিন আরও কঠিন ফিরে যাওয়া। অবশেষে আমরা সবাই ভাবি ঠিক আছে আমার জীবন হয়তো কষ্ট করে একভাবে কেটে যাবে, তবুও যদি আমার সন্তানেরা একটু ভালো জীবন পায়। একদম ঠিক কথা। আমরা বেশির ভাগই এই মনে করেই শত চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েও পড়ে আছি। ছোটবেলায় বইতে পড়েছি আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে অর্থাৎ তখন বাবা-মার বড় দোয়া বা আশীর্বাদ সন্তানের জন্য ছিল দুধে ভাতে থাকা। আর এখন, আমার সন্তান যেন বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বা বড় কোনো কোম্পানিতে বড় কোনো পদে চাকরি করতে পারে। আর সেটা যদি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় হয় তাহলে তো কথাই নেই।
আমি অবশ্যই মনে করি যে কোনো বাবা মা সেটা চাইতেই পারেন। শুধু এতটুকুই বলতে চাই সন্তান ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে এটা যেমন আমরা সবাই চাই পাশাপাশি তার সাংস্কৃতিক বিকাশের জায়গাটাও বোধ হয় খেয়াল রাখার দরকার। আমাকে আপনাকে সিদ্ধান্তে আসতে হবে আমার সন্তান কী তার পেছনে ফেলে আসা নিজস্ব সংস্কৃতি লালন করবে নাকি ভাসিয়ে দেবে কানাডীয় সংস্কৃতির স্রোতে, নাকি সে ধারণ করবে কোনো মিশ্র সংস্কৃতি। আমি জানি এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমাদের সবার কাছে নেই। কারণ সন্তান যখন বড় হয় সব সময় বাবা মায়ের নিয়ন্ত্রণ তার ওপরে থাকে না। আর তারপর এমনি দেশ যেখানে সন্তান বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পুলিশ বাবাকে গ্রেপ্তার করে।
আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য দুটি। এক. আমরা যারা এসে পড়েছি তারা এ দেশের প্রশাসনের কাছে জোরালো আবেদন পেশ করতে পারি যাতে প্রত্যেক অভিবাসী যেন তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান। আমি জানি এই ব্যাপারে কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যানারে হয়তো কিছু কিছু কাজ করছেন। কিন্তু সেই প্রয়াসকে সম্মিলিত ও আরও জোরালো করা প্রয়োজন।
দুই. আমরা সঠিক তথ্য দিয়ে তাদের সাহায্য করতে পারি যারা এ দেশে আসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা অনেক সময় দেশের মানুষের কাছে সত্য কথাটা বলতে চাই না। তার কারণ দুটি। প্রথমত আমি বুঝতে দিতে চাই না যে আমি কেমন আছি। দ্বিতীয়টি হলো সত্য কথাগুলি যে মানুষটি এ দেশে আসতে চায় সে সহজভাবে নাও নিতে পারে। এই তথ্যটি দেশের মানুষকে দেওয়া দরকার আপনি দেশে যত বড় পজিশনেই চাকরি করেন না কেন, আপনাকে এখানে প্রতিযোগিতা করতে হবে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ও এ দেশে বেড়ে ওঠা যুবসমাজের সঙ্গে। শুধু তাই নয়, আপনার ক্যারিয়ার শুরু করতে হবে একরকম শূন্য থেকে।
বিষয়টি কিন্তু অতটা সহজ নয়। সবকিছু জেনে বুঝে তারপর সিদ্ধান্তটা নেওয়া উচিত। তবে পরিশেষে এটাও বলতে চাই যারা ওপরের চ্যালেঞ্জগুলোকে জয় করতে পেরেছেন তারা সত্যিই এ দেশে অনেক ভালো আছেন।