
বিদেশ ভ্রমণের মধ্যে এক অচেনা আনন্দ আছে। নতুন নতুন জায়গা ঘুরতে, দেখতে কে না চায়! বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা একটু ভিন্ন অবশ্যই। ভয় মিশ্রিত ও উত্তেজনাপূর্ণ এবং খুব অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। ভিনদেশের আবহাওয়া, সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষ ভিন্ন তো হবেই। অজানাকে জানার মধ্যে আছে একটি তৃপ্তি ও উল্লাস। মানব ইতিহাসকে যদি একটি বিষয় নির্ধারণ করে সংজ্ঞায়িত করা হয় তা হবে আমাদের আদিম পুরুষদের অধৈর্য প্রত্যাশা অনুসন্ধান করা—নতুন নতুন স্থানের। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, অচেনা কৌতূহল প্রশমিত করার জন্য, নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে, নতুন নতুন স্থানের আবিষ্কার ও অভিপ্রায় এবং স্থান থেকে স্থানান্তরিত হতে আমাদের অনুপ্রাণিত করে তোলে অবাধ্য আবেগ। ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ছয় মিলিয়ন বছর আগে থেকে জঙ্গল থেকে জঙ্গল অন্বেষণ করা শুরু করেন।

একটি তথ্য পাঠকদের দিতে চাই, আমেরিকা নামক দেশটি প্রথম আবিষ্কার করেন আমাদের পূর্ব পরুষেরা। হ্যাঁ তাই সত্য! A History of United State নামক বইটিতে এ তথ্য পাওয়া যায়। আপনারাও আমার মতো শুনে খুশিতে আবেগকম্পিত হতে পারেন এই জেনে যে, ঐতিহাসিকেরা একমত যে, এখানে প্রথম জনপদ এসেছে এশিয়া থেকে জলপথে অথবা স্থলপথে। এ ব্যাপারে দুটি মতবাদের প্রচলন আছে।
এক. বেরিংল্যান্ড ব্রিজ মাইগ্রেশন ও দুই. কোস্টাল মাইগ্রেশন। আজ থেকে ১৪ হাজার কিংবা ২০ হাজার বৎসর আগে নাকি এখানে এশিয়ানরা (রেড-ইন্ডিয়ান) প্রথম আসে সাগরপথে অথবা স্থলপথে। স্থলপথে সম্ভবত প্যাসিফিক সাগরের জন্মেরও আরও আগে। আল্লাহ ভালো জানেন।
ক্লোভিস (আমাদের পূর্ব পুরুষ, ছবিতে দেখুন) মানুষেরা আমেরিকায় আদিম অধিবাসী বলে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন। নৌকায় করে তারা সম্ভবত প্যাসিফিক সাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছেন। ইন্টারেস্টিং আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণা প্রমাণ করে না যে, ১৪৯২ সালের আগে আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইউরোপীয় জেনেটিক চিহ্নকারী আদিবাসী কখনো বসবাস করেছে। তারা তো মাত্র সেদিন আমেরিকা গিয়ে আমাদের লোকদের সরিয়ে দিয়েছে!। তাঁদের ভ্রমণ ছিল কলম্বাসের ভুল ভ্রমণের সুবাদে।

সে যা হোক, ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম যে আমি চাঁদে যেতে চাই। চাঁদে গিয়ে বেড়ানো কতটুকু একসাইটিং হবে জানি না! মানুষ প্রথম চাঁদে গিয়েছিল ১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই। টেকনোলজি এত উন্নত হওয়ার পরেও কেন এখন পর্যন্ত চাঁদে একটি সুন্দর হোটেল অথবা একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি হলো না, যেখানে ঔৎসুক্য পর্যটকেরা থাকতে পারতেন। সে বাড়িতে অবশ্য কৃত্রিমভাবে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা যেত। পৃথিবী থেকে একটি রকেট মহাশূন্যে পাঠাতে হলে কত আয়োজন প্রয়োজন হয়, তারপরও ওটা পাঠাতে হয় কাজাখস্তানের জনমানব শূন্য এক খোলা ভূমি থেকে। চাঁদ থেকে পৃথিবীতে আসতে হলে তো আবার মহাশূন্যে আসতে হবে। সে আসার ব্যবস্থাতো আবার চাঁদে নাই। এ জন্য সম্ভবত ফিরে আশা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই চাঁদে বেড়ানোর শখ সম্ভবত খুব কমসংখ্যক মানুষের হবে।
কিন্তু আরও অনেকের মতো আমার পৃথিবী ঘুরে দেখতে আগ্রহের কোনো কমতি নেই। অন্য দেশগুলো দেখতে কেমন? বাল্যবেলা থেকে ভ্রমণ ছিল আমার স্বপ্ন। ইংল্যান্ড-আমেরিকা আরও অনেক দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বাংলাদেশি নাগরিকেরা। উৎসাহ থাকত জানতে, তাদের জীবন কেমন, দেশটা দেখতে কেমন, ইত্যাদি। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তেই কি আছে সেই পরিচিত সবুজ আর নীলের মৈত্রীতা।
সবুজে সবুজে ঘেরা আমার দেশ শস্য শ্যামলে ভরা। এখানে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। আছে কোকিলের কুহু কুহু গান। গোধূলিবেলায় হলদে আলোয় আর মাতাল সমীরণে আনমনা করে দেয় আরও অনেকের মতো আমাকেও। অন্ধকার রাতে জোনাকিরা ওড়ে, যেন আকাশের সবগুলো তারা নেমে আসে পৃথিবীতে। এখানে আছে সারি সারি বৃক্ষরাজি। বর্ষায় থই থই পানি (এখনতো বর্ষাকাল, কতই না সুন্দর!) অথবা শরতের হলদে পৃথিবী এবং শীতল বাতাস, কর্দমাক্ত মাঠ। আমার দেশে বর্ষায় জেলে মাছ ধরে বেলজাল ফেলে (দয়া করে ছবিতে দেখুন)। আরও কত না অফুরন্ত উপমায় ভর্তি। বাইরের দেশগুলো কি দেখতে আমার দেশের মতো! অচেনা দেশের পাখিরা কি গান করে আমার দেশের পাখিদের মতো। ওরা কি ওদের মানুষের চেহারার মতো আমাদের পাখিদের চেয়ে ভিন্ন!
কবিগুরুর একটি কবিতা তুলে ধরি যা আমার মতো আপনাদেরও হয়তো জানা।
বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।
এই প্রবাসে কয়েক দিন আমার অদ্ভুত এক শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। জানালার কাচ গলে বাইর থেকে ভেসে আসছিল খটখট শব্দ। কে যেন বারান্দায় পূর্বদিক থেকে পশ্চিমদিকে পায়চারি করছেন সাত সকালে। ভাবলাম কীসের শব্দ বাইরে! তখনো পুরোপুরি ভোর হয়নি, রীতিমতো অন্ধকার! ঘুম থেকে আমাকে এমনিতেই উঠতে হয় খুব ভোরে। কিন্তু ঘড়ির অ্যালার্মের শব্দের আগেই এই উদ্ভট শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। বিদেশে আবার ভূত-পেতনি আছে নাকি! দেশে থাকতে একবার ভূত দেখেছিলাম।
আমি যে বাড়িতে থাকি তা সেন্ট্রাল লন্ডন থেকে পূর্বদিকে প্রায় ১৫ মাইল দূরে। ছোট একটি টাউন। নাম বার্কিংসাইড। লন্ডনের রেডব্রিজ বরাতে অবস্থিত। কামালপুর গ্রামের মতো একটি নিরিবিলি গ্রাম। যেখানে আমার গ্রামের বাড়ি। কামালপুরের মতো এখানেও জনমানবের কোলাহল খুবই কম। এখানেও ঘুম ভাঙে ঘুঘু পাখির ডাকে। তো আমি যে ঘরে থাকি তার পেছনে একটি বারান্দা আছে। অবশ্য ওই বারান্দায় গিয়ে বসার সুযোগ নাই। কারণ কাচের জানালাটা শুধু খোলা বাতাস আসার জন্য। যদিও ওপর দিক থেকে খোলা যায় কিন্তু বাইরে যাওয়া যায় না।
জানালার পর্দা সরিয়ে দেখতে ভয় করছিল! তবে জোরে শব্দ করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল—কে, কে বারান্দায় শব্দ করছেন! কিন্তু পাশের ঘরের লোকদের ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তখন ভোর ৪টা ৪০ মিনিট। ভাবলাম শব্দ করা সমীচীন হবে না। সাহস করে পর্দা সরিয়ে দেখি একটা পাখি। দোয়েল পাখি। বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। এ দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য যেন নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। আনমনা হয়ে গেলাম (ছবিটি দেখুন আমার বারান্দায় তোলা)।

পাখির মুখে কী একটা খাবার। পাখিটি কী খাচ্ছে তা আমার চিন্তার বিষয় নয়। পাখিটি দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। কত দিন দোয়েল দেখিনি। দেশে থাকতে সকালে রোদ পোহাতে যখন বাড়ির পূর্বে খোলা মাঠে আড্ডা দিতে যেতাম তখন দোয়েল দেখলেই দৌড়াতাম—যেন ধরে ফেলব (যদিও কখনো ধরতে পারিনি)। কিন্তু তখন কি পাখিটাকে এত সুন্দর লাগত!
আগেই বলেছি এখানে গ্রীষ্মে ঘুম ভাঙে ঘুঘু পাখির ডাকে। কবিগুরুর কবিতায় ফিরে আসি। আমার দেশের চাইতে কি কোনো দেশ ভিন্ন। আমার ঘরের পাশের দৃশ্যের চেয়ে কি আরও সুন্দর কোনো দৃশ্য আছে। দেখার চোখ দিয়ে দেখলে ঘরের পাশেই সব সুন্দর দৃশ্য লুকিয়ে আছে। একটি ধানের শিশির ওপর আরও একটি শিশির বিন্দু (ছবিতে দেখুন ধানের ছড়া পানির নিচে, তারপরেও কতই না সুন্দর!)।
আমার সোনার বাংলাদেশের মতোই এই দেশের আকাশের রং নীল। এখানেও বাতাস বহে শো শো শব্দে। সন্ধ্যায় পাখিরা খোঁজে শান্তির নীড়। সমুদ্র সৈকতে ভিড় করে অজস্র কপোত কপোতী। পৃথিবীর আরও অনেকগুলো দেশের মতো এখানেও শীতে তুষার নামে। রাস্তা-ঘাট, মাঠ, বিল নদী-নালা সব সাদা হয়ে যায়। যেন সাদা কাপড়ে মোড়া এক অপরূপ সুন্দরী নারী। এখানে গ্রীষ্মে ফোটে সোনালি রঙের ড্যাফোডিল—হ্রদের পাশে, গাছের নিচে, পার্কে মৃদু হাওয়ায় ছন্দে ছন্দে নৃত্য করে অজস্র ফুল। তুলার মতো মেঘগুলো সাঁতরে বেড়ায় আকাশে আকাশে। বিধাতা কতই না সুন্দর করে নিজ হাত দিয়ে রঙের তুলি দিয়ে নিবন্ধিত করেছেন বৈচিত্র্য এ ধরণিটাকে। কিছু ছবি পাঠকদের জন্য তোলা।
কিন্তু এতত্সত্ত্বেও মনে হয় বসবাস করছি নির্বাসে, সবকিছুই অনেক দূরে ঠেকে। খাঁচার পাখির মতো যদি আর বিষণ্ন।
*লেখক পেশাগত জীবনে ব্যারিস্টার। যুক্তরাজ্যে কর্মরত। ফেসবুক: <শহীদ শতাব্দী>
ধারাবাহিক এই রচনার আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন: http://www.prothom-alo.com/durporobash/article/1245741