
আমরা দুজন গিয়েছিলাম পাহাড় দর্শনে। সেই প্রথম বিদেশ যাত্রা আমার স্বামীর সঙ্গে। চোখে অনেক স্বপ্ন, মনে অনেক রং। তখন পৃথিবীটা অনেক আনন্দের মনে হতো। কোনো দায়িত্ব নেই, কাজ নেই, শুধুই প্রকৃতি মাঝে হারিয়ে যাওয়া। দার্জিলিং হয়ে নেপাল। মনে হচ্ছিল এত অপার সুন্দরের হাতছানি এই পৃথিবীতে। ইশ্ যদি থেকে যেতে পারতাম নেপালি কোনো ছোট্ট নদীর পাড়ে। কিংবা দার্জিলিংয়ের পাহাড় চূড়ায়। তাই কি হয়! জীবন বহমান।

জীবনের চলমান স্রোতে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এখন থাকি কানাডায়। তারপরও খুব মনে পড়ে নেপালি পাহাড়, হিমালয়, মন্দির, বন আরও কত-কী। আমার সেই পাহাড় দর্শন আজও ভুলিনি। খুব মন চায় পাহাড়ের আলসেমিটুকু বারবার দেখতে।

এক যুগ বিদেশে থাকি। বিদেশিদের কাছে তিনটি জিনিস শিখেছি। রান্নাঘর-বাথরুম ছবির মতো ঝকঝকে রাখা, ক্রেডিট কার্ড ঘষে শপিং করা আর গরমের ছুটিতে ঘুরতে বেরোনো। আমার কানাডীয় বন্ধুরা একটা ছুটি কাটিয়ে আবার নতুন করে হোটেল বুকিং দেয়। কারণ এরা ভাবে বেড়ানো মানেই নতুন করে প্রাণশক্তি ফিরে পাওয়া। নতুন উদ্দীপনা নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। নানাভাবে লোকজন বেড়াতে যায়—প্লেন, বাস বা ক্যারাভ্যান ভাড়া করে কিংবা গাড়ি নিয়ে রোড ট্রিপ।

আমার স্বামী এজাজ এসব কাজে পাকা। সে তার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বেড়ানোর পরিকল্পনা করে ফেলল। দুই সপ্তাহের ছুটিতে আমরা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকব। প্রথমে ওয়াটারটুন, তারপর মনটানা হয়ে ইডাহ। কুলারে বারবিকিউ চিকেন, পানির বোতল, মাছ ভাজা সবই নেওয়া হলো। সঙ্গে স্ন্যাকস, ফল ইত্যাদি। এজাজ দু-মাস আগেই হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছে। আমরা যখন ওয়াটারটুন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। পাহাড়ি চিকন রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। দু-পাশে পাহাড় আর ঘন বন। অন্ধকারে গহিন বনে রাস্তা আর ফুরোচ্ছিল না। এজাজের জিপিএসের ভুল ঠিকানা আমাদের আমেরিকান বর্ডারে নিয়ে গেল। নো ম্যনস ল্যান্ডে ঢুকেই সে তার ভুল বুঝতে পারল। কালো পোশাকের সোনালি চুলের মাঝবয়সী এক নারী চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করল আমরা এই রাত-বিরেতে কোথায় যাচ্ছি। বললাম, আমরা হারিয়ে গেছি।
তার মন নরম হলো, আমাদের পাসপোর্ট দেখাতে বলল। সঙ্গে পাসপোর্ট থাকাতে ঝামেলা ছাড়াই বেড়িয়ে এলাম আমেরিকার ভূখণ্ড।
রাগে আমার মাথা খারাপ। জঙ্গল থেকে হালুম করে একখান ভালুক এসে গাড়ির ওপর হামলে পড়লেই আমরা শেষ। এই মাঝরাতে বন্ধু দর্শন কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ না, এটা বোঝাতে বোঝাতে দেখি আমরা ওয়াটারটুন ন্যাশনাল পার্কে ঢুকে পড়েছি। তখন রাত ১০টা। ২৫ বছর পর দুই বন্ধুর দেখা। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল। কত প্রশ্ন, কত কথা। ওনার নাম ইব্রাহিম। তিনি আর তার স্ত্রী বন্ধুকে কী খাওয়াবে কী করবে বুঝতে পারছিল না। রিসোর্ট রুমের লিভিং রুমটা যেন ২৫ বছর আগের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রুম হয়ে গেল। আমরা বাকিরা মুগ্ধ হয়ে দুজনের আবেগ, ভালোবাসা, স্মৃতিচারণা উপভোগ করতে থাকলাম।
ওয়াটারটুন আমেরিকার বর্ডারে। আমেরিকার অংশকে বলে মনটানা।

পরদিন সকালে আমরা যখন ওয়াটারটুন পার্কে ঢুকলাম তখন থেকে আর চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করে তুলেছিল। এমন সুন্দর প্রকৃতির মাঝে ভাষা হারিয়ে যায় যেন। কালো, সাদা, ধূসর পাহাড় মাথা উঁচু করে আকাশ ছুতে চাইছে। এই পাহাড়গুলো রক মানে পাথরের তৈরি। তাই এরা বলে রকি মাউন্টেন। সেই সৌন্দর্য। মন কেমন করে। মন চায় কেমন হয় এবার সত্যি সত্যি থেকে গেলে রক পাহাড়ে কিংবা নীল লেকের সাদা পাথরটায়। অসাধারণ সৌন্দর্য। আকাশের নীল আর লেকের নীল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ঢেউয়ের ছন্দে মৃদু বাতাসের শব্দ। কোনটা রেখে কোনটা দেখি।
চমৎকার এক ঝরনা। পাহাড়ের ওপর থেকে পানির ঝরনাধারার শব্দ কোনো মিষ্টি রাগ সংগীতের মতোই যেন। ঝরনাটার পাশে এক কাপ চা নিয়ে মনে হচ্ছিল আজ সারা দিনই বসে থাকি ঝরনার পাশে। কী চমৎকারই না তার শব্দ ও প্রবাহ। কোনো কিছুর সঙ্গেই তার তুলনা হয় না। নিচে ছোট্ট নুড়ি পাথর কিংবা বিশাল কোনো শক্ত কালো পাথরে পানির স্রোত যখন থমকে যায়, সে পানিতে পা ডুবিয়ে আমি জীবনের গান শুনতে পাই।
শতবর্ষী রিজেন্ট হোটেল আর লেকের পানি কত-না তার রং। নীল, সবুজ, বেগুনি। রকি পাহাড় তো আকাশ ছুঁয়েছে। মাথায় বরফের বিছানা নিয়ে ভীষণ গম্ভীর তার হাবভাব।
এখানে অনেক লোক আসে হাইকিং করতে। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে চিকন সরু পথ বেয়ে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে লেক, কেউবা লেকের পানিতে বোটিং করে। কখনো পাহাড়ের পাশেই সমতল ভূমি। তার সবুজ ঘাসে অনেকে ঘোড়ায় চড়ে বেড়ায়। রোমান্সের জন্য এর থেকে সুন্দর প্রকৃতিই বা আর কী হতে পারে। হাত ধরে প্রেমিক-প্রেমিকা ঘুরে বেড়ায় ডাউন টাউনের রাস্তা ধরে কিংবা লেকের ধারে সাদা পাথরে জড়াজড়ি করে বসে থাকে। রিসোর্টের বারান্দায় বসে এক চাপ চায়ের পেয়ালা নিয়ে বসলে বন থেকে হরিণ ছানাটাও কিন্তু আপনার সঙ্গে রোদ পোহাবে। কাঠবিড়ালিটা পায়ের নিচে কাটুস-কুটুস করবে।
লেকের পাশে চিকন আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটতে থাকলে কাছেই পাহাড় বেয়ে ঝরনার পানি, পাথর ছোট নদী হয়ে মিলেছে লেকে। স্বচ্ছ সে পানির মাঝে নানা রঙের পাথর। লাল কালো সাদা ধূসর। পাথর হাতে নিয়ে ঝরনার টলটলে পানিতে ধুয়ে নিতেই গোধূলির লাল রং পাথরের ঝিকিমিকিকে আরও যেন চমক দিচ্ছিল। লেকের টলটলে জলে পা ডোবানোর লোভ কী সামলানো যায়। জুতো খুলে ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে ছোট্ট গাছের গুঁড়িতে বসে রইলাম। মনে মনে ভাবছি ওগো পাহাড়-কন্যা কেমন করে তুমি এমন সুন্দর ধারণ করলে। আমার মন-হৃদয় সবকিছু কেড়ে নিয়ে তো আমাকে পাগল করে দিলে। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। বন্য প্রাণীরা চলে আসতে পারে পাহাড়ের জঙ্গল থেকে। সবুজ ঘন বন। আছে মোজ (moose), ভেড়া (big Horn Sheep), কালো ভালুক (black bear), হরিণ (white tail deer), নেকড়ে (coyote, wolf, mule deer, grizzly bear), ছাগল (mountain goat)। প্রকৃতির ভয়ংকর সৌন্দর্য দেখে লাভ নাই। দেখার সাহসও আমার নাই। ভয়ে ভয়ে গাড়িতে উঠলাম। রাতেরবেলা হোটেলের নরম বিছানাই শ্রেয়। এই পাথর বিছানো লেকের পাড় নয়।
পরদিন দুপুরে টিকিট কেটে চড়ে বসলাম ক্রুজ শিপে। শিপ কানাডা হয়ে পৌঁছাবে আমেরিকা। শিপ ল্যান্ড করল আমেরিকার মাটিতে। লেকের অর্ধেক কানাডা, বাকিটা আমেরিকার মধ্যে। পাহাড়ের মাঝখানে বন কেটে বানিয়েছে নো ম্যানস ল্যান্ড। কানাডীয় বর্ডারে ওয়াটারটুন লেকে জাহাজে করে সারা দিন আমেরিকা-কানাডা ঘুরলাম। নিচে নামলাম পাসপোর্ট ছাড়াই। আমেরিকাতে শিপ ল্যান্ড করল। আমাদের অল্প একটু জায়গা বেঁধে দেওয়া হলো ঘোরাঘুরির জন্য। আমেরিকার মাটিতে প্রথম পা রাখলাম। একটু অন্যরকম অনুভূতি।
ওখানেই ওয়াটারটুন গ্লেসিয়ার পার্ক। পাহাড়ের ওপর প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে যাওয়া শক্ত বরফের চাকাকে বলে গ্লেসিয়ার। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য এই গ্লেসিয়ার গলে যাচ্ছে। আমেরিকা-কানাডা দু-দেশ মিলে চেষ্টা করছে কীভাবে রক্ষা করা যায় একে। সে কারণে গাছের একটা পাতাও ছেঁড়া নিষিদ্ধ। ছিঁড়লেই অনেক টাকা জরিমানা। এমনকি একটা নুড়ি পাথরেও হাত দেওয়া যাবে না। কী আর করা। হাত-পা গুটিয়ে জঙ্গলে পায়চারি করলাম কিছুক্ষণ। এবার ফিরে আসার পালা। জাহাজে গিয়ে উঠলাম। এরা বলে ক্রুজ। সেখানে থাকে দুজন গাইড। যার কাজ হচ্ছে মাইক্রোফোন হাতে কথা বলা। সে অনবরত মনটানা লেকের ইতিহাস, প্রকৃতির বৈচিত্র্য, পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছিল। তার কথা শুনতে শুনতে কানাডায় ফিরে এলাম। তখন পাহাড়গুলো আরাম করে ঘুমাচ্ছিল।