নিউইয়র্কের জীবন
প্রকৃতির এক অপরূপ খেলা চলে নিউইয়র্কের আকাশে। কালো মেঘ সাদা মেঘ, ঘন কুয়াশায় ঢাকা আকাশ প্রায়ই বদলায়। কবি মন ব্যাকুল হোক বা না হোক, সব মনেই এর প্রভাব পড়ে। ফেরারি বাউল মন যেন আরও বাউল হয়। ২০১৪ সালে জীবনের প্রথম স্নোতে পা রাখতে গিয়ে খুব বিচ্ছিরিভাবে পড়ে গিয়েছিলাম। হিল সাইড অ্যাভিনিউর ১৬২ নম্বর রাস্তার একদম ওপর থেকে নিচে। জানতাম না বরফ ঝরা পথে কেমন করে হাঁটতে হয়! তুষার ঝড়ে বের হওয়া উচিত কি উচিত না, তাও বুঝতাম না। অনেকটা শিশুর মতো অবুঝ ভঙ্গিতে পা ফেলতাম।
পরে সময়ে সব বদলে গেছে। হেলায় হেলায় কত সময় পার করেছি, কিছুই জানি না। কাজের কাজ কিছুই হলো না। অথচ সময় চলে গেছে বহুদূর। এখন অনেক কিছু বুঝি। হাল না ছাড়া নাবিকের মতো কষ্টও আনন্দের মনে হয়। নিজেকে পাখি মনে হয়। মাঝে মাঝে আমি পাখির সঙ্গে বনবাদাড়ে হারিয়ে যাই। এ হারানোর সুখ সবাই হয়তো বুঝবে না। আমরা প্রকৃতির অংশ কিন্তু সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে অনেকটা শো পিস বানিয়ে ফেলেছি। আমাদের সামাজিক মোলাকাত পার্টি প্রোগ্রাম সেই শো-কেসের অংশ। আমরা হলাম খাঁচায় বন্দী। কিন্তু মনের মুক্তি যে আকাশের নিচে তার খবর কে রাখে?
আমাদের শরীর ভালো থাকে না, মন ভালো থাকে না। অথচ এই আমরা যখন কাদামাটি দিয়ে ছোটবেলা খেলতাম, বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম, ‘মন খারাপ’ কী তা আমরা জানতাম না। নিজেকে ছোটবেলার মতো চঞ্চলভাবে ফিরে পাই, যখন সেন্ট্রাল পার্কের গভীর অরণ্যে হারিয়ে যাই। তখন নীরবতা আমার ভেতরের পৃথিবীটাকে বদলে দেয়। চলতি বছরের তীব্র তুষার দিনে একদিন হারালাম। সারা দিন বরফ ঢাকা সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটলাম। সন্ধ্যার আগে আগে ফিরে এলাম পাখির মতো ঘরে। ঠান্ডা আমাকে স্পর্শ করেছে আপন করে। মনের মুক্তি যেখানে উদার সেখানে কোনো কিছুর ঠাঁই নেই। ঝড় শেষে নীরব পৃথিবীর মায়া আমাকে টানে। পাখিদের খাবার না থাকার কষ্ট যেমন স্পর্শ করে, তেমন মানুষের মনের কষ্ট স্পর্শ করে। আমি সে কষ্টের স্পর্শকে ধরে রাখি না। দূর থেকে রূপান্তর করি সুখে। মানুষের সমস্যা শুনে বুঝে উত্তর দিতে হয়। আমি চাই পৃথিবীর সব মানুষ ভালো থাকুক।
প্রতিদিন কত কাহিনি শুনি। যতটা সম্ভব সহযোগিতা করি। গত রাতে এক নারীর সেকি কান্না! সকালে কথা বলব স্কেজুয়াল দিলেও তাঁর কান্না শুনে পুরো এক ঘণ্টা কাউন্সেলিং করলাম। মানুষের কষ্টে মানুষ তো এগিয়ে আসবে। তবে সবার আগে নিজেকে এগিয়ে আসতে হবে। ভদ্র মহিলা নির্বিকার মন্তব্যে নিজের কষ্টের কথা না বললে হয়তো সম্ভব হতো না। তাই সবার আগে নিজেকে নিজে সাহায্য করতে হবে।
ডিজিটাল যুগে যখন ডিজিটের সঙ্গে দিন কাটে, তখন প্রকৃতির কাছে গেলেও আমাদের চোখ থাকে লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লেতে। একদিন ফোন সার্ভিসিংয়ের জন্য অ্যাপল স্টোরে রেখে যখন সেন্ট্রাল পার্কের গভীরে একা হাঁটছিলাম, মনে হলো প্রকৃতিকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ হলো। একটা কাঠবিড়ালি যার কাছে খাবার বিরাট একটা ব্যাপার। পাখিরা সারাক্ষণ কিচিরমিচির করছে। বরফে গাছগুলো ঢাকা। না আছে পাতা, না কোনো ফল-ওরা কী খাবে? ভ্রমণকারীরা তেমন নেই। খাদ্যের অভাব। আমার আশপাশে ওরা ঘুরল কিন্তু আমার কাছে দেওয়ার মতো কিছু নেই। কে যেন বলল, ওদের জন্য খাবার আনা উচিত ছিল। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। বাসার আশপাশের পাখিরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে যদিও সকালে তাদের দুই তিন দফা খাবার দিয়েছি। সন্ধ্যা নেমে এলে ক্ষুধার্ত হয়েই চলে যাবে। ফোন করে মেয়েকে বললাম। সে ভুলে গেছে দিতে। সেই রাতে মন কেমন খচখচ করল। নিজের বাচ্চা না খেয়ে থাকলে যেমন মনে হয়, তেমনটা হলো। মেয়েকে বুঝিয়ে বললাম, আর যেন এমন না হয়। একদিন বলল, কবুতর মানুষ চেনে। আমাকে দেখে ওরা আসছিল না। পরে আমি ইউটিউব থেকে তাদের সঙ্গীদের ডাকার ভিডিও ছেড়েছি। এরা তখন কনফিউজড হয়ে গেছে, তবে খেতে এসেছে।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, এরা গলায় কখন কোন শব্দ করে তুমি কীভাবে জানলে? সে বলে, ‘Thay passing their whole life having sex and eating.’ ভোরে পাখিরা বেশি কিচিরমিচির কেন করে জানো? তখন তারা সঙ্গীদের ডাকে। মনে পড়ল, মেয়ে জীববিজ্ঞানের প্রজেক্ট করতে গিয়ে ডকুমেন্টারি দেখছিল আর মাঝে মাঝে সব তথ্য জানাচ্ছিল।
নিউইয়র্ক শহর তুষার ঘেরা ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ হঠাৎ মনে হলো সেন্ট্রাল পার্কে যাওয়া উচিত। একটা বাক্সে ওয়াইল্ড বার্ড ফুড নিয়ে গেলাম। কয়েক মুহূর্তে কত যে পাখি যে উড়ে উড়ে এল। কবুতর কী সুন্দর হাতে বসে খাবার খেল। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। ১৩ ফেব্রুয়ারি আবার গেলাম। তীব্র শীত নিউইয়র্কে। ঘন ঘন তুষারপাত হয়। ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছে করে না। রুটিন মাফিক জিমে যাওয়ার কথা, কিন্তু গেলাম না। দেড়টার দিকে পার্কে গেলাম।
ঘরে ফেরার জন্য পুকুরের পাড়ের রাস্তা ধরলাম। ঝোপ থেকে ছোট পাখিদের ডাকছিলাম। হঠাৎ দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে বুনোহাঁস উড়ে আমার দিকে আসছে। খাবার দিতে থাকলাম। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য।
দেখলাম আশপাশে অনেক ক্যামেরা, মোবাইল আমার এবং পাখিদের রেকর্ড করছে। তখন আমার ঝুলির খাবার প্রায় শেষ এবং ওরাও ফিরে যাচ্ছে জলে। আমি বাম হাতে ভিডিও নিলাম। হাঁস উড়ে আসার সেই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য আমার কাছে নেই। আকাশের সঙ্গে এ জমিনের প্রাণীগুলোও বদলায়। সে হোক পাখি কিংবা মানুষ।