নজরুলের শেষ দিনগুলো

অন্তিম শয্যায় প্রমীলা, নিজের খাটে বসে তাঁর মাথার দিকে চেয়ে আছেন নির্বাক নজরুল
ছবি: সংগৃহীত

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন মানব প্রেমিক, চির দুর্দম, বিদ্রোহী, আত্মভোলা, পরোপকারী ও স্বাধীনচেতা। সেই চির দুর্দম বিদ্রোহী কবিও এক সময় জীবনের কাছে হেরে গেলেন। অসহায় শিশুর মতোই এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লেন মস্তিষ্কের দুরারোগ্য কঠিন ব্যাধিতে। তারিখটি ছিল ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই। এর আগে ১৯৪০ সালে কবিপত্নী প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। স্ত্রী সুস্থতার জন্য কবি অজস্র অর্থ ব্যয় করেন। কিস্তিতে কেনা মোটরগাড়ি, বালিগঞ্জের ভক্তের দান করা জমি, গ্রন্থাবলির কপিরাইট, রেকর্ড করা গানের রয়্যালটির টাকা সবই স্ত্রীর চিকিৎসায় খরচ করেন। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। এদিকে অসুখের জন্য কবির কথা বলার ও লেখার শক্তি হারিয়ে যায়। ১৯৪২ সালের ১৭ আগস্ট কবি তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুজপ্রতিম সুফি জুলফিকার হায়দারকে যে পত্র লিখেছিলেন, তাতে তাঁর মানসিক অবস্থার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। পত্রটির কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলো—

“প্রিয় হায়দার,

...Blood pressure-এ শয্যাগত। অতি কষ্টে চিঠি লিখছি। আমার বাড়িতে অসুখ, ঋণ, পাওনাদারের তাগাদা প্রভৃতি worries, সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত খাটুনি। তারপর নবযুগের worries ৩/৪ মাস পর্যন্ত। এই সব কারণে আমার nerves shattered হয়ে গেছে। ৬ মাস ধরে হক সাহেবের কাছে গিয়ে ভিখারির মতো ৫/৬ ঘণ্টা বসে থেকে ফিরে এসেছি।...আমি ভালো চিকিৎসা করাতে পারছি না। ...আমার হয়তো এই শেষ পত্র তোমাকে। ...কথা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অতি কষ্টে দু’একটা কথা বলতে পারি, বললে যন্ত্রণা সর্বশরীরে। হয়তো কবি ফেরদৌসীর মতো ওই টাকা আমার জানাজার নামাজের দিন পাব। কিন্তু ওই টাকা নিতে নিষেধ করেছি আমার আত্মীয়স্বজনকে। চিকিৎসার ব্যাপারে অবশ্য প্রথম দিকে বেশ কিছু ত্রুটি হয়েছে এবং বলা ঠিক হবে অবহেলাই করা হয়েছিল। নতুবা কে জানে হয়তো-বা আজকের দিনের মতো এমনি এক ‘অসুখ সারাবার নয়’ বলবার মতো দিন না-ও আসতে পারত।”

যত দিন কবিপত্নী প্রমীলা জীবিত ছিলেন কবির প্রতি যত্নআত্তি ভক্তি ভালোবাসার কোনো ত্রুটি ছিল না। পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় শুয়ে শুয়ে সংসার চালানো ছাড়াও কবির সেবা শুশ্রূষা করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

কবির যত্নের ব্যাপারে প্রমীলা সম্পর্কে কবির পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী বলেছেন—

‘যত দিন বেঁচে ছিলেন, প্রমীলা বেশির ভাগ দিন-ই নিজের হাতে বাবাকে খাইয়ে দিতেন। খাওয়া শেষ হলে তাঁর হাত-মুখ ধুইয়ে সযত্নে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতেন। তিনি খাবার পরিবেশন না করলে, বা তাঁর সামনে বসে না খেলে আমাদের তৃপ্তি হতো না। বাবার সম্বন্ধে তাঁর দায়িত্বজ্ঞান ও কর্তব্যবোধ ছিল অসাধারণ, গভীর রাত্রে সবাই যখন সুপ্তির কোলে নিমগ্ন তখন তিনি একা খেলে চলেছেন হয় লুডো, নয় তাস, নয়তো বা চায়নিজ চেকার। উদ্দেশ্য, বাবাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দেওয়া। কারণ, বাবা ঠিক এক নাগাড়ে ঘুমোতেন না। তাই মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম, ঠক্ ঠক্ করে গুটির আওয়াজ হচ্ছে আর থেকে থেকে একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠছে—এসো, বাইরে যেয়ো না। শোনো, শুয়ে পড়ো।’

আগেই উল্লেখ করেছি, প্রথম অবস্থায় কবির সুচিকিৎসা হলে হয়তো আমরা কবিকে জীবন্মৃত অবস্থায় না পেয়ে সুস্থ অবস্থায় পেতাম। যে জাতিকে কবি অকাতরে অনেক কিছুই বিলিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখার সময় এমন-কি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কয়েক বছর সরকার বা আমাদের হয়ে ওঠেনি। প্রথম অবস্থায় কবি পরিচিত কাউকে দেখলেই মুখে অদ্ভুত শব্দ করে কী যেন বলতে চাইতেন। হয়তো-বা তাই—যে দেশ এবং জাতির জন্য আমি জীবন উৎসর্গ করলাম, ওরা কেন আজ আমার খোঁজ নেয় না? আমার আজ এই দুর্দশা কেন?

স্বামী নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রমীলা। কৃষ্ণনগর, ১৯২৮
ছবি: সংগৃহীত

এই প্রসঙ্গে ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে শ্রদ্ধেয় মুজফ্ফর আহমেদ লিখেছেন—‘১৯৪২ সালের জুলাই মাসে তাঁর রোগ যখন সকলের চোখে প্রকাশ পেল তখন চিকিৎসা হয়েছিল বটে, কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত অপরিমিত ও অসম্পূর্ণ হয়েছে। তখন অবশ্য কোনো কোনো ডাক্তার বলেছিলেন যে, বড় দেরি হয়ে গেছে। তখন যদি কবিকে ইউরোপে পাঠানো যেত তাহলে তাঁর মস্তিষ্কে অপারেশন অন্তত হতে পারত...কিন্তু নজরুল নিরাময় সমিতি গঠিত হয়েছিল বড় দেরিতে—১৯৫২ সালের জুন মাসে।’ এর সম্পাদক ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ এবং প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি কবিকে দেখে ব্যথিত হলেন এবং হাতে ৫০০ টাকা দিয়ে নানা রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। কবি ও তাঁর পত্নীকে পাঠানো হলো লন্ডনে। তারিখটি ছিল ১৯৫৩ সালের ১০ মে। ডা. উইলিয়ম স্যারগ্যান্ট, ই এ বেটন, রাসেল ব্রেন নজরুলকে পরীক্ষা করেন। কিন্তু চিকিৎসার ব্যাপারে তাঁরা একমত হতে না পারায় কবি ও তাঁর স্ত্রীকে পাঠানো হয় ভিয়েনায়। ৯ ডিসেম্বর নজরুলের ওপর সেরিব্র্যাল অ্যানজিওগ্রাফি পরীক্ষা করানো হয়। ফলস্বরূপ প্রখ্যাত স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ডা. হ্যান্স হক বলেন, নজরুল ‘পিকসডিজিজ’ নামক এক প্রকার মস্তিষ্কের রোগে ভুগছেন যা নিরাময়ের বাইরে। এই রোগে রোগী শিশুর মতো ব্যবহার করেন এবং মস্তিষ্কের সামনের ও পাশের অংশগুলো সংকুচিত হয়ে যায়।

১৯৭৫ সালে চলে গেলেন কবির কনিষ্ঠ পুত্র ‘নিনি’ অর্থাৎ কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম। স্তব্ধবাক কবি কিছুই বুঝলেন না, কিছুই জানলেন না। কবি নজরুলের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের আর এক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা মনে পড়ে গেল। মাইকেলের অন্তরঙ্গ বন্ধু গৌরদাস বসাক তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘পাশাপাশি দুটি বিছানায় দুটি রোগগ্রস্ত জীবন, জীবন সাধনা শেষে সিদ্ধির সাথে এগিয়ে চলেছেন, মাইকেল আর হেনরিয়েটা, স্বামী আর স্ত্রী। ...এক দুর্গন্ধযুক্ত গন্ধ, মোষের খাটালের ওপর তলায় মশার ঝাঁক আর নোংরা জঞ্জাল স্তূপের দুর্গন্ধের অবাঞ্ছিত আবহাওয়ার বাংলা দেশের বিস্মৃতপ্রায় আর এক কবি আর তাঁর নম্র সহচরী...জনমানবের অবহেলার বস্তুর মতো পড়েছিলেন।’

মাইকেলের শেষ জীবনের সঙ্গে নজরুলের শেষ জীবনের এ যেন এক অদ্ভুত মিল। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের কথাতেই তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়—‘বাড়ির নিচ থেকে ভেসে আসে গোবর পচা ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। মোষের খাটালের একঝাঁক মশা এসে ঘরের অন্ধকার কোণে কবিকে করে অভিনন্দন। ...মশারা অন্তত সে সম্বন্ধে উদাসীন নয়। অদূরে অনড় অবস্থায় প্রমীলা স্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছেন।’

১৯৭১ সালে জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের ২৪ মে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে কবিকে নিয়ে আসা হলো ঢাকায়। জীবনের শেষ চার বছর কবি এখানেই ছিলেন। নজরুল সংগীত গুরু প্রয়াত ধীরেন বসু কবি সম্বন্ধে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ঢাকায় কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে কাজী সব্যসাচী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, কল্যাণী কাজী, ধীরেন বসু সবাই কবিকে মাল্যদান করতে গেছেন, কিন্তু কবি কিছুতেই মাথা তুলছেন না। এমতাবস্থায় কাজী সব্যসাচী ধীরেন বসুকে বললেন, ‘ধীরেন তোমার গাওয়া সেই গানটি ধরো।’ হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে ধীরেন বসু গাইলেন, ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি।’ গান শেষ হলো, কবি মাথা তুলে সবাইকে দেখলেন, মাল্যদানের পালা শেষ হলো।

কবি আজ আমাদের মাঝে নেই। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি চিরকালের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, যদিও তাঁর মানসমৃত্যু হয়েছিল ১৯৪২ সালেই। তাঁর কবিতা, গান দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করবে কোটি কোটি মানুষকে, অনুপ্রাণিত করবে বীরত্বপূর্ণ ও নিঃস্বার্থ কাজে আত্মনিয়োগ করতে।