ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন

শুধু শাহবাগে নয়, প্রতিটি পরিবারে, পাড়া-মহল্লায় ধর্ষণবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে জলাশয়—কোথায় হচ্ছে না ধর্ষণ? পাঁচ বছরের শিশু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী—কেউই এ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। কিছু দিন আগে মেয়ের ধর্ষণের বিচার না পেয়ে মেয়েসহ আত্মহত্যা করেছেন একজন বাবা। আর বাকি যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁরা না মরে বেঁচে আছেন। ঠিক যেমনটি বেঁচে আছেন তনুর মতো মেয়েদের বাবারা।
আমাদের অন্যায্য পুরুষশাসিত সমাজে ধর্ষকেরা নন্দিত, ধর্ষিতারা নিন্দিত। ধর্ষণের সমস্ত দায়ভার, সমস্ত লজ্জা, সমস্ত অপমান আর উপহাসের ভারী পাহাড় সমাজ তুলে দেয় নারীর ওপর। আর পশুসম ধর্ষক মানুষেরা পৈশাচিক অত্যাচার করেও তাদের ক্ষমতা আর ওপর তলার ব্যক্তিদের সহযোগিতা ও অর্থের বলে পার পেয়ে যায় কৃত অপরাধের হাত থেকে। সমাজে লজ্জিত, লাঞ্ছিত হন ধর্ষিত নারী। অত্যাচারিত হয়েও তাঁকে মুখ ঢেকে চলতে হয় সমাজের উপহাস এড়াতে। কারণ, কলঙ্ক শুধু নারীর জন্য, পুরুষের জন্য নয়। সমাজের এই কলঙ্কজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা সম্মিলিতভাবে না করা পর্যন্ত সমাজ ও দেশে এ ধরনের অত্যাচার চলতে থাকবেই। সামাজিক অবহেলায় তিল তিল করে মরে যাওয়া ধর্ষিত নারীদের অভিশাপগ্রস্ত দেশটির নাম বাংলাদেশ। মাঝেমধ্যে ভয় হয়—ধর্ষকের অভয়ারণ্যই কি হয়ে যাচ্ছে আমার-আপনার প্রিয় এই বাংলাদেশ!
যারা আমাদের চারপাশের সমাজকে নারীর বসবাসের অযোগ্য করে যাচ্ছে, মানুষ নামের সেসব হিংস্র পশুকে আর ছাড় দেব না—এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা। প্রতিটি ব্যক্তি মেরুদণ্ড সোজা করে এদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, যারা ভাবে ধর্ষণ করার লাইসেন্স তাদের বিত্তবান বাবা ও বিচারহীন সমাজব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের দিয়েছে। যেহেতু রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা চোখে ঠুলি আর মুখে কুলুপ দিয়ে বসে আছে, তাই আমাদের সন্তানের দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।
ধর্ষণ প্রতিটি নারীর মেধা, বল, আশা, স্বপ্ন, লক্ষ্য ও সম্ভ্রমকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। ধর্ষিত মায়ের সন্তানের বেদনা, ধর্ষিত বোনের ভাইয়ের কষ্ট, ধর্ষিত মেয়ের বাবার শোক আর সর্বস্ব হারানো নারীর অপরিমেয় মর্মজ্বালা উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। বর্বর ধর্ষকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাতেই হবে।
গত ২৮ মার্চ জন্মদিনের পার্টিতে নিয়ে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলার প্রধান আসামি সাফাত আহমেদ দেশের শীর্ষস্থানীয় অলংকারের ব্র্যান্ড আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে। নারীর সম্মানে যারা হাত দিয়েছে, তাদের প্রতি ঘৃণা জানিয়ে আসুন প্রতিজ্ঞা করি—‘কোনো নারী আর নিজেকে সাজাবে না আপন জুয়েলার্সের অলংকারে—যদি সে অলংকার বিনা মূল্যেও হয়, তবু নয়।’ ঠিক তেমনিভাবে ধর্ষক ও ধর্ষক পরিবারকেও সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যান করুন | পৃথিবীর যে প্রান্তেই তারা পালাক না কেন, তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করুন |
আমরা যদি একটু পেছনের দিকে তাকাই দেখব, একটা সময় নারীর প্রতি ‘অ্যাসিড-সন্ত্রাস’ মারাত্মক একটা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল | তথ্য-উপাত্ত অনুসারে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে ১৯৬৭ সালে। এরপর আবার অ্যাসিড-সন্ত্রাস আলোচনায় আসে ১৯৯৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে শামিমা নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর প্রতি অ্যাসিড নিক্ষেপ করার ঘটনার মধ্য দিয়ে। অ্যাসিড সারভাইভাল ফাউন্ডেশনের হিসেবে ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ৩ হাজারেরও বেশি অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০০২ সাল। ওই বছর ৫০০টি অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে হামলার ঘটনা কমতে থাকে। ২০১১ সালে ৯১টি ও ২০১২ সালে ৭১টি হামলা হয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার অ্যাসিড-সন্ত্রাস দমনে কঠোর আইন প্রণয়ন করে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের পাশাপাশি অ্যাসিডের ব্যবহার, মজুত ও বিক্রির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। অ্যাসিড নিক্ষেপকারীর জামিন নামঞ্জুর ও এক বছরের মধ্যে তাদের বিচার শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়; আগে যেখানে বছরের পর বছর লেগে যেত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি দেওয়ায় বিধান করা হয়েছে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী অ্যাসিড ছোড়ার শাস্তি হিসেবে রয়েছে সর্বনিম্ন ৭ থেকে ১২ বছরের জেল এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
এই পরিসংখ্যানে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা দেরিতে হলেও কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে। তাহলে ধর্ষণের ক্ষেত্রে কেন হচ্ছে না? নাকি আরও কিছু নারীর অভিশাপে অভিশপ্ত হতে হবে আমাদের? এটাও স্বীকার্য, আইন থাকলেও অনেক সময় আইনের অপর্যাপ্ত প্রয়োগের কারণে অ্যাসিড নিক্ষেপকারীরা দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা শূন্যের কোঠাতে না নামলেও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। যে হারে ধর্ষণের মাত্রা বাড়ছে, এটা একটা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। নারীকে ঘরে বসিয়ে রাখলে বা চটের বস্তা পরিয়ে রাখলেও যারা শকুন, তাদের চোখ ঠিকই খুঁজে বের করবে। শুধু মৃত্যুদণ্ডই পারে এদের প্রতিহত করতে। এই ধর্ষিত নারী-শিশুরা আমার-আপনার সন্তান না হতে পারে, কিন্তু তাতে কী? কাল যে এই বিষধর সাপের ছোবল থেকে আপনার সন্তানকে বাঁচাতে পারবে, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? এবার যদি বিত্তশালী এই বাবাদের কুপুত্ররা রেহাই পেয়ে যায়, তবে বলব—সামনের দিন আরও ভয়াবহ! তাই আর দেরি নয়, আসুন প্রতিজ্ঞা করি—আমাদের সমাজের নারীদের সম্মান, তাঁদের স্বপ্নের সূর্যস্নাত দিন আর চন্দ্রিমার আলোয় স্নাত নিরাপদ রাত আমরা ফিরিয়ে আনবই।
বি.দ্র.: ধন্যবাদ সংবাদমাধ্যমকে/ সংবাদকর্মীকে যাঁরা ধর্ষিতার ছবি প্রকাশ করেন না।