একদিকে বসন্ত, অন্যদিকে মুক্তির ডাক। একদিকে কৃষ্ণচূড়া বা শিমুল মেঘে মুখরিত দিন, অন্যদিকে মার্চের রক্তঝরা রাজপথে ইতিহাসের লং মার্চ। একদিকে বাংলার বসন্তে বিপথগামী রাজনীতির পোড়া ঘ্রাণ, অন্যদিকে চেরি ফুলের শুভ্রতায় দোল খায় পুবের বিশুদ্ধ হাওয়া। এ রকম একটা দিনে, একটা অন্যরকম লগ্নে টোকিওতে জমে ওঠে এক অনবদ্য সৃষ্টিশীলতার আসর। আসরের মধ্যমণি যিনি, তিনি সদ্য আশির পাটাতনে পা রেখেছেন, কোনো সন বা দশকে সাহিত্য বা চোরাবালির রাজনীতিতে পা না ফসকেই।
আজকের বাংলাদেশের সাহিত্যের নির্মাণ যাঁদের হাতে, সেই পথিকৃতদের অন্যতম সৈয়দ শামসুল হক। যিনি বাংলা সাহিত্যে সব্যসাচী রূপে কবিতা-নাটক-উপন্যাস-গল্প-প্রবন্ধ সবদিক উন্মোচন করেছেন। পাশাপাশি এঁকেছেন নানা আঙ্গিকের ছবি। চলচ্চিত্রেও যাঁর ছিল সরব পদচারণা এককালে, চিত্রনাট্য রচনা ও নির্মাণে। এখনো সচল তাঁর হাত, প্রখর তাঁর দৃষ্টি, অনবদ্য বলা বা চলার ভঙ্গি। সেই ভঙ্গিমায় তিনি মাতিয়েছেন সুদূর বাংলাদেশ থেকে উড়ে এসে প্রাচ্যের আরেক রানি জাপানের বসন্ত বাতাস।
পুরো আয়োজনের কেন্দ্রে ছিল প্রথম আলো বন্ধুসভা জাপান আর এর উপদেষ্টা প্রথম আলোর জাপান প্রতিনিধি মনজুরুল হক। বসন্তে জাপানের অন্যতম আকর্ষণ “সাকুরা” বা প্রস্ফুটিত শুভ্র চেরি ফুলে ফুলে ঢাকা টোকিওর তামাগাওয়া পার্কে, গত ২৯ মার্চ সকালে, সৈয়দ হককে ঘিরে জড়ো হন একদল প্রবাসী বাঙালি সাহিত্যানুরাগী। বন্ধুসভার বিশেষ অনুরোধে পুরো আয়োজনটি সঞ্চালনা করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গবেষক মঈনুল শাওন। সভাপতিত্ব করেন বন্ধুসভা জাপানের সভাপতি কবি মোতালেব শাহ আইয়ুব। টোকিওর বাঙালিদের সৃজনশীল এই জমায়েতে কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বন্ধুসভা জাপানের সহসভাপতি চিত্রশিল্পী সলিমুল্লাহ কাজল, প্রবাসী সাংবাদিক কাজী ইনসানুল হক, জাপান আওয়ামী লীগের সভাপতি সালেহ মোহাম্মদ আরিফ প্রমুখ।
অন্যান্য অনেকের সঙ্গে জাপানের এনএইচকে বেতারের বাংলা বিভাগও এতে যোগ দিয়েছিল তাদের দুজন কর্মী এবং বিভাগীয় প্রধান কাজুও ওয়াতানাবের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। আয়োজনের নানা পর্যায়ে কবিতা ও নাট্যাংশ পাঠ করেন লেখক ও আবৃত্তিকার জুয়েল আহসান কামরুল ও টোকিও প্রবাসী কবি মিল্টন। পুরো অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন বন্ধুসভা জাপানের সাধারণ সম্পাদক ফটোসাংবাদিক খন্দকার আনিসুর রহমান।
শুরুতেই কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোকপাত করে সঞ্চালক মঈনুল শাওন তাঁকে আশির পাটাতনে দাঁড়িয়েও সৃষ্টিশীলতার দুর্নিবার চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য অভিনন্দন জানান। এরপর কাব্যনাট্য “নুরলদীনের সারাজীবন”-এর একটি অংশ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রত্যুত্তরে কবি উন্মুক্ত করেন তাঁর সাহিত্য জীবনের বিচিত্র ও ঋদ্ধ অভিজ্ঞতার ডালি। ব্রিটিশ আমলে কুড়িগ্রামে নদীর ঢলে ভেঙে যাওয়া বসতবাটি থেকে যে নির্মাণের শুরু, তার পথটা কখনই ছিল না মসৃণ। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে সাম্প্রদায়িক নীতি এবং বিশেষ করে, বাংলা ভাষার ওপর শুরুতে যে আঘাত, তার বিপরীতে একদল তরুণ সাহিত্যিকদের করতে হয় নিরন্তর লড়াই। যার মাঝে কবি নিজেকে প্রবলভাবে যুক্ত করেছিলেন, কবির কণ্ঠে আমরা শুনি তাঁর নস্টালজিক বয়ান।
লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলেও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে লড়াইটা এখনো অব্যাহত আছে, সে কথা কবি স্মরণ করিয়ে দেন। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বাংলা ভাষার উচ্চারণ ও ব্যাকরণের অনন্যতা নিয়েও গর্ব বোধ করেন তিনি। আর বলার ফাঁকে বিশেষ করে স্মরণ করেন, তাঁর জীবনকালে এই জনপদের সব সংগ্রামের প্রেরণা ও নায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যাঁকে নিয়ে এখন তিনি বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ আগ্রহে নির্মাণ করছেন ৩০ মিনিট দৈর্ঘ্যের একটি অন্যরকম চলচ্চিত্র। মূলত ঢাকার নভো থিয়েটারের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জাপানেরই একটি প্রতিষ্ঠান।
প্রবাসীদের পক্ষ থেকে নানা আবৃত্তি, নাট্যাংশ পাঠ বা আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে, কবি তাঁর চমৎকার উচ্চারণ আর ভঙ্গিমায় পড়ে শোনান স্বরচিত কাব্য সম্ভারের নানা নির্বাচিত অংশ। “তুমি আমার কতটা এবং কি?....” অথবা “পরানের গহিনের ভেতর”–এর গভীর অভিব্যক্তিতে উপস্থিত শ্রোতাদর্শক ভেসে যান বাঙালপনায়। কবি তখন আলপনা আঁকেন নয়া নির্মাণের বিচিত্র ভাঁজে ভাঁজে...বলেন, ওই পোড়া পেট্রলের কোনো সাধ্য নাই কালি দিয়ে ঢাকে বাংলার মুখ...যে মুখ হতে নিঃসৃত হয় পৃথিবীর মধুরতম ভাষা...“বাংলা”। কবি নিজে যে ভাষার নিপুণ কারিগর।
মনে পড়ে তখন “পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়” এর সেই অনবদ্য পংক্তি...“উঠায়া নিলে সব উঠান কি যায়, দাগ একটা দাগ থাইকা যায়...”। চেরি ফুলে ফুলে ভরে ওঠা টোকিওর তামাগাওয়া পার্কে অথবা বাংলার সাহিত্যের খোলা ময়দানে সৈয়দ শামসুল হক যে দাগ রেখে গেলেন, সমকাল নয়, আগামীকালের সাধ্য নাই তা সহজে মুছে ফেলার। জয়তু কবি! জয়তু তাঁর ঋদ্ধ সাহিত্য সম্ভার!