তরগাঁও, ছোট্ট একটা গ্রাম। তার পাশ দিয়েই শীতলক্ষ্যা একটা নদী। ছোট্ট ছবির মতো আঁকাবাঁকা সেই নদী। নদীর দুই কোলজুড়ে চোখজুড়ানো সুন্দর ছিমছাম দুটি গ্রাম। নদীর এপারের মানুষের সঙ্গে ওপারের মানুষের সখ্য। আবার কখনো ঝগড়া, কখনো ভালোবাসাবাসি। ঝগড়া করে কদিন থাকা যায়? এপারের মানুষের নিশ্বাসের শব্দ ওপারের মানুষ শুনতে পায়। গলায় গলায়, কাঁধে কাঁধে পথ চলতেই এই দুই গ্রামের মানুষ অভ্যস্ত।
নদীর পারে বড় একটা বটগাছ। সেই বটগাছে টিয়া পাখির বাসা। বটগাছের নিচে মানুষের আনাগোনা। জামাল কাকার পান বিড়ির ছোট্ট একটা দোকান। গাছের কোটরে সারাক্ষণ টিয়া পাখির চিৎকার। আর গাছের নিচে মানুষের গুঞ্জরণ! বটগাছটাকে পেছনে ফেলে দশ মিনিট এগোলেই আমাদের ঋষিপাড়া। সেখানে সুন্দর একটা বকুলগাছ। সেই গাছের নিচে পড়ে আছে অজস্র বকুল ফুল। যত পারা যায় তাজা বকুল ফুল বুকপকেটে ভরে এর স্বর্গীয় ঘ্রাণ নেওয়ার আকুলতা। তারপর ধীরে ধীরে নীরব সন্ধ্যা নামে। পাখির কিচিরমিচির থেমে যায়। গ্রামের ছোট ছোট বাড়িতে হারিকেন আর কুপি বাতি জ্বলতে শুরু করে। মানুষের পথচলার পথটা নিমেষেই যেন ফাঁকা হয়ে যায়। তারপর সুনসান নীরবতা। মাগরিবের আজানের পরপরই দূরে কোথায় যেন উলুধ্বনি শোনা যায়। মন্দিরে কাঁসার ঘণ্টাটা তখনো যেন বাজতে থাকে। এই তো আমার গ্রাম। আমার শৈশবে ফেলে আসার স্মৃতিঘেরা সেই ছোট্ট প্রিয় গ্রাম!
কিছুদিন আগে নিউইয়র্ক জ্যাকসন হাইটসে আমার সেই ছোট্ট গ্রাম থেকে আসা একটি ছেলের সঙ্গে দেখা। আহা, আমার নিজের গ্রামের ছেলে বলে কথা! রাস্তার পাশের একটা রেস্তোরাঁয় বসে এক নিশ্বাসে কত প্রশ্নই না তাকে করেছিলাম! কেমন আছে আমার সেই ফেলে আসা ছোট্ট গ্রামটি? সেই বটগাছটা আছে তো? সেই বুকভরা উত্তাল শীতলক্ষ্যা? আর ওই যে বকুল ফুল গাছটা? জামাল চাচার ছোট্ট দোকানটার কী খবর? ঋষিবাড়ি থেকে সেই কীর্তনের সুর এখনো কি ভেসে আসে?
আমার গ্রাম নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন শুনে বেচারা নতুন আসা এই ছেলেটা একটু যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেল। কিন্তু আমার আগ্রহভরা বিস্ফারিত দুই চোখের দিকে তাকিয়ে সেও যেন কিছুক্ষণের জন্য সেই গ্রামে চলে গেল। ছেলেটি গ্রামের খুঁটিনাটি বর্ণনা দিতে শুরু করল। আমি আরেক প্রস্থ চায়ের অর্ডার দিয়ে নড়েচড়ে বসি। একসময় ছেলেটির কথা শেষ হলো।
ততক্ষণে আমার চোখের সামনেই দাউ দাউ করে আগুনে পুড়ছে আমার প্রিয় স্মৃতিঘেরা গ্রামটি। সেই ঠান্ডা শীতল ছিমছাম ছবির মতো আঁকা গ্রামটি আর নেই। শীতলক্ষ্যা নদীটিতে নাকি এখন চৈত্রের সময় চর পড়ে যায়। লঞ্চ তো দূরের কথা, অনেক সময় নৌকা পর্যন্ত আটকে যায়। নদীর দুকূল ছাপিয়ে অজস্র দোকানপাটের ছড়াছড়ি। না, এপারের মানুষের সঙ্গে ওপারের মানুষের হৃদয়ের কোনো লেনদেন নেই। চারদিকে শুধু ব্যবসাপাতি, টাকার ঘ্রাণ আর উঁচু দালানের সরব প্রতিযোগিতা। গ্রামে ছেলেপেলেরা প্রায় সবাই দেশের বাইরে। দুবাই, আমেরিকা, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে এরা নিজেদের ঠিকানা তৈরি করে নিতে ব্যস্ত। ছোট্ট টিনের বাড়ি ফুঁড়ে এখন সেখানে উঠেছে লম্বা দালান। বটগাছটা নাকি অনেক আগেই কাটা পড়েছে। এখন সেখানে মস্ত বড় ইটের ভাটা। বকুল ফুল গাছটার ওখানে ডাক্তারের ক্লিনিক। না, না। আমার সেই গ্রামটি আর নেই। শহর এর এই যান্ত্রিকতা, তথাকথিত সভ্যতা আমার গ্রামকে অজগরের মতো ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে। এই খেদ থেকেই হয়তো বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন ‘সভ্যতার চন্ডালবৃত্তি’।
মানুষ এখন যন্ত্র হয়ে গেছে। জামাল চাচার ছোট্ট দোকানে মুড়ির মোয়াটি আর কেউ তাঁর মতো করে ডেকে হাত বাড়িয়ে আদর করে খাওয়ায় না। এবাড়ি-ওবাড়ির সখ্য নেই। মানুষ মানুষকে চেনে না, আগের মতো সেই ভালোবাসাবাসি নেই। মানুষের আদরমাখা হাতগুলো ধীরে ধীরে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আমাদের চিরচেনা সেই ভালোবাসার গ্রামটি ধীরে ধীরে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। সেই গ্রামে আর সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে না, হারিকেন জ্বালিয়ে আমাদের রফিজ মোল্লা ফজরের আজান দিতে সেই পশ্চিম পাড়ার মসজিদে আর যান না। আমার সেই শৈশবের গ্রামটিকে চিরতরেই যেন হারিয়ে ফেলেছি।
আমাদের গ্রাম থেকে মাইল দুয়েক দূরে পানাশকুড়ি নামে একটা বিল। সেই বিলে সেই ছোট্ট বেলায় আব্বার সঙ্গে প্রায়ই মাছ ধরতে যেতাম। আব্বার ছিল ছিপ দিয়ে মাছ ধরার নেশা। একদিন সন্ধ্যা হয়ে গেল। গাঁয়ের ছোট আঁকাবাঁকা পথ ধীরে ধীরে দুর্গম আর কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেল। আব্বা পড়লেন বিপদে। আর আমি তো কেঁদে ফেলি আরকি। এমন সময় রাস্তার পাশের একটা ছোট্ট বাড়ি থেকে একজন বৃদ্ধ হারিকেন বাতি জ্বালিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। আমরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম।
আব্বা বললেন আমাদের বিপদের কথা। ভদ্রলোক সব শুনে শুধু বললেন, ‘এই আন্ধারে ছোট্ট পুলাপাইন লইয়া যাইবেন কই? আপনারা আইজকা আমার বাড়ির মেজবান (মেহমান)। চলেন ঘরে যাই। একটু আরাম করবেন। হেরপরে (তারপর) এই গরিবের গরে খাওয়াদাওয়া কইরা হক্কাল (সকাল) বেলায় বাড়িত যাইবেন।’ আব্বা, অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ভদ্রলোককে শান্ত করে একটা হারিকেন জোগাড় করে বাড়ি এসেছিলেন। এখন খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমার গ্রামে সেই লোকগুলো এখনো ঠিক আগের মতোই আছে তো? নাকি শহরের নগ্ন সভ্যতার বন্যায় সবকিছুই ভেসে গেছে। হঠাৎ করেই যেন ভালোবাসাহীন আমার গ্রামের কঙ্কালের ছবিটা আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠল। আমি আবারও শিউরে উঠলাম!