করোনাকালীন ভাবনা

মানুষ জেনেছিল, পৃথিবী কেবল দেওয়া-নেওয়া আর পাওনা পরিশোধের চূড়ান্ত স্থান। এরপর গন্তব্যে ফেরা। কিন্তু কালক্রমে তার হিসাব-নিকাশ পুরোটাই যেন পাল্টে গেল। কর্মকাণ্ডের কিছুটা হিসাব যে পৃথিবীতে দিতে হবে, তা কী কেউ বুঝেছিল? আসলে আমরা কেউ কী জানি এরপর কী হবে বা কী হতে পারে? আমরা কেবল ধারণা করতে পারি বা বুঝে নিতে পারি।

যারা ভেবেছিল বাড়ি ফিরে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কাটাবেন অলস সময়। হয়তো তেমন করে আর হয়নি বাড়ি ফেরা, বা হচ্ছে না। তবু বাঁচার লড়াই নিয়ে বেঁচে আছি সবাই। এ বাঁচার মাঝে যেন এক অন্য রকম পরিতৃপ্তি রয়েছে। কারণ কোনো কিছু বিনা মূল্যে পাওয়া আর অর্জন করার মাঝে যে ভিন্নতা অনেক।

অর্জিত প্রেম যেমন তৃপ্তি দেয়, অর্জিত বাঁচাও তেমনি পরিতৃপ্তি দেয়। মাঝে মাঝে এই বাঁচাকে খুব যত্নে পরখ করে দেখতে কার না ইচ্ছা করে? শৈশবে বৈঁচি ফুলের মালা যেমন যত্নে গাঁথা হতো আজও এ বাঁচাগুলো পরম যত্নে কে না অনুভব করছে বলুন?

তবুও হয় কী দেখা তেমন করে? কারণ প্রতিনিয়ত দুঃসংবাদ আর স্বজন হারানোর ব্যথায় বুক চিন চিন করে। স্বদেশে কী বিদেশে কোথাও কেউ ভালো নেই। প্রশ্ন একটাই, কবে আমরা ফিরে যাব পুরোনো বাড়িতে, পুরোনো দিনে। যে দিনগুলোতে কোনো কাছাকাছি মৃত্যু ভাবনা নিয়ে দিন কাটাতে হতো না। অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কা নিয়ে বাঁচতে হতো না।

ভীষণ ইচ্ছা হয় সন্ধ্যা কিংবা চাঁদ মাখা রাতে একা হেঁটে বেড়াই নিজের ভালো লাগাগুলো সঙ্গে নিয়ে। আজ এই অতিমারির দিনে সব স্মৃতি যেন অলক্ষ্যে ভেসে আসে। ভেসে আসে বিমূর্ত সপ্নীল কল্পনাগুলো। তখন করোনা ছিল না। ছিল না দ্রুত বাড়ি ফেরার তাড়া। একে অন্যের কাছ থেকে দূরত্ব মেপে হাঁটা কিংবা দূরত্ব মেপে কথা বলা। আহা! এও কী বেঁচে থাকা? ভালো থাকা? এ কেমন আকাল? যা দূরে সরিয়ে নিচ্ছে আমাদের প্রতিনিয়ত।

‘প্রকৃতি’কিংবা ‘প্রকৃত’ দুটিই কি হারিয়েছি ফেলেছি আমরা? প্রকৃতির কিছু পরিক্রমণ ক্রিয়া রয়েছে। তবে আমরা কী তার চক্রান্ত জালে আটকে পড়েছি? এ কেমন অস্বাভাবিক খেলায় মেতেছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড! এত জটাজাল, এত অনিশ্চিত মৃত্যু! কখনো ভাবিনি এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে চিতা হরিণ কিংবা বন শেয়ালও আমাদের খরিদকৃত জমির অংশীদার? তাদেরও রয়েছে দাবি এইখানে ধূসর জমিনে অবাধে বাঁচার।

আর প্রকৃত! যা খাঁটি, নির্ভেজাল, কিংবা অকৃত্রিম এসবেরও ছিটেফোঁটা নেই কোথাও যেন। এই যে বেঁচে আছি এ কি প্রকৃত বাঁচা? এই যে করোনাকালীন দূরত্ব মেনে চলা সেও কী প্রকৃত?

আমরাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে গিয়ে করেছি বাসের অযোগ্য। সীমিত, পরিমিত, সংযম, সহনশীলতা এসব ভাবনা আমাদের ভাবায়নি। ভেবেছি কে কতটুকু অপরিমিত আর অবাধ হতে পারি। হায়েনার মতো গিলে খেয়েছি অন্যের অধিকার, মর্যাদা আর মানবতাকে। তবে কেন একে অন্যকে দোষারোপ করছি।

চলুন না এবার হিসাবগুলো সোজা পথে নিয়ে আসি। এত দিন যা ভেবেছি বিভোর হয়ে হয়তো সেখানে কোথাও ভুল করেছি। ভুল করেছি ভাবনায়, চিন্তায়, সৃজনশীলতায়, সৃষ্টিতে কিংবা দৃষ্টিতে। তাই তো সবকিছু এত এলোমেলো।

ভাইরাসকে কেন ভাবছি না এটি আমাদের ভুল ভাবনা শুধরে নেওয়ার উপলক্ষ? অথবা নিজেকে শুধরে নেওয়ার অদৃশ্য শক্তি? করোনা কেবল মৃত্যু বয়ে এনেছে তা নয়, পুরো পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তার ক্ষতিপূরণ করতে কার কতটুকু সময় লাগবে কে জানে? আমি শুধু ভাবছি, আর কত দূর হলে হবে এর শেষ? আর কত দূর যেতে হবে আমাদের? ইতিমধ্যেই যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে অনাদিকালের জন্য এই আকাল কী দায়ী থাকবে? নাকি আমরা নিজেরাই? যারা বাঁচতে বাঁচতে মরে গিয়েছে অথবা আমরা যারা মরতে মরতে বেঁচে আছি, আমার কাছে দুটির মাঝে পার্থক্য আছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ সুখ অনুভবের দৈন্যতা আর অসুখ কি এক নয়!

তবে তো সমীকরণ হলো, সবাই মিলে আমরা বাঁচার লড়াই করে সুখে বেঁচে আছি। এ সুখ অন্যরকম। যেমন বিপদে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছালে যে সুখ ভোগ হয় তার মতো। তবুও তো বেঁচে আছি। উন্নতমানের না হোক, সম্ভাবনাময় হোক এ বাঁচা। এ বাঁচা হোক নতুন বিশ্বের নতুন পথের অঙ্গীকার। যেখান থেকে তৈরি হবে আরেক পৃথিবী, আরেক সুখের যাত্রা...