করোনা থেকে বাঁচতে অজ্ঞাতে নিজের ক্ষতি নয়

করোনাভাইরাস। ছবি: রয়টার্স
করোনাভাইরাস। ছবি: রয়টার্স

করোনাভাইরাস কেড়ে নিয়েছে মানবসভ্যতার চিরায়ত আচার, আচরণ, শিক্ষা, বিনোদন, উন্নয়ন, প্রগতি—সবকিছু। এ যেন অচেনা পৃথিবী, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দৃশ্য ভয়াবহ আতঙ্কের। এরূপ দৃশ্য কেবল রূপকথায় আর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্রে সম্ভব ছিল। আজ বাস্তবে সারা পৃথিবী এ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। কেউ জানে না, এর শেষ কোথায় ও কবে?
আমাদের ধ্যান-জ্ঞান এখন করোনাভাইরাস নিয়ে। সকালে চোখ মেলে প্রথম এর খবর নিই। ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত করোনাভাইরাস নিয়েই আমাদের যত আলোচনা, গবেষণা ও তর্ক-বিতর্ক। আর কোন বিষয় নেই এখন আমাদের ভাবনায়।
আমাদের তথ্য ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম টেলিভিশন। কিন্তু টেলিভিশন চালু করলে করোনাভাইরাস ছাড়া আর কিছু দেখতে পাবেন? যত সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, সব এই ভাইরাস নিয়ে। যত আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছে তার বিষয় এ ভাইরাস। নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখার নির্দেশের কারণে কোন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নির্মিত হচ্ছে না। কোন কোন চ্যানেল পুরোনো অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার করছে, কিন্তু সেখানেও কোন না কোনোভাবে করোনা বিরাজমান।
টেলিভিশন ছেড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজর দিন, সেখানেও করোনাভাইরাস। প্রিয়জনের অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর নিয়মিত প্রচার আপনাকে হতাশাগ্রস্থ করছে। এ ছাড়া আর যত প্রচার তাও এই ভাইরাস নিয়ে। নানাবিধ তথ্য প্রচারিত হচ্ছে, যার অধিকাংশই হয়তো সঠিক নয়। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ ও মতবাদ। এর মধ্যে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ (conspiracy theory) তো রয়েছেই। এসবের ফাঁকে কিছু গান, কবিতা বা প্রামাণ্যচিত্র থাকছে, কিন্তু সেসবের বিষয়ও করোনাভাইরাস। এ নিয়ে ব্যঙ্গচিত্রও নির্মিত হচ্ছে।
আপনি সংবাদ ও বিনোদন ছেড়ে এবার পেশাগত কাজে মন দিন। অনেকেই ঘরে বসে কাজ করছেন, জরুরি সভা, পেশাগত আলোচনা, রিপোর্ট জমা, আরও কত কিছু। কিন্তু লক্ষ্য করুন, সর্বত্রই কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে করোনাভাইরাস বিরাজমান। আপনি বা আপনার পেশাগত প্রতিষ্ঠান চিকিৎসাপেশার সঙ্গে কোনভাবেই সংশ্লিষ্ট না হয়েও চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে, পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
যারা কিছুটা আরামপ্রিয় তারা সাধারণত আড্ডা বা গালগল্প নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। এদের সময় কাটানোর প্রধান মাধ্যম ছিল গসিপ, পরিচিতজন বা তারকাদের নিয়ে নানারকম মুখরোচক গল্পে মশগুল থাকত তারা। কিন্তু এখন এরা সবাই পড়ে আছে করোনাভাইরাস নিয়ে। ফোনে, ইন্টারনেটে বা টেলিভিশনে এরা দিনরাত এ ভাইরাসের ওপর সব আলোচনা অনুষ্ঠান মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
আমরা সবাই করোনাভাইরাস নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা ও প্রচারণা উপভোগ করছি। এ রোগের আদ্যোপান্ত আমাদের সবার মগজে টগবগ করছে। এমনকি গ্রামের একজন অশিক্ষিত মানুষও আজ এ ভাইরাস নিয়ে একটি দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে দিতে পারবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যদি এ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তবে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের এ ডিগ্রি অর্জনের সৌভাগ্য হবে। পৃথিবীতে আর কোন বিষয়ে পুরো মানবজাতির এত জ্ঞানলাভ কখনো সম্ভব হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না।
এ রোগ নিয়ে এত আলোচনা, গবেষণা ও প্রচারণার ভালো দিক অবশ্যই রয়েছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি একটি বড় কাজ যা সহজে করা যায় না। এখন মৃত্যুভয় মানুষকে আপনা–আপনি সচেতন করে তুলছে। এ সব তথ্য সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করছে। চিকিৎসাসেবকেরাও অনেক ক্ষেত্রে পরামর্শ নিচ্ছেন এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে। কারণ এ রোগ সম্পর্কে আগের কোনো জ্ঞান বা প্রতিষেধক ছিল না। ফলে মানবজাতি একে অন্যের থেকে নিরাপদ দুরুত্ব বজায় রেখেও পাশাপাশি থাকছে।
তবে এর নেতিবাচক দিক ভুললেও চলবে না। এখন এ বিপদসংকুল সময়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিক সুস্থতা। একজন মানুষ শারীরিক অসুস্থতায় যতটুকু শ্রান্ত হয়, তার চেয়ে বহুগুণে শ্রান্ত হয় মানসিক অসুস্থতায়। কিন্তু সকাল-সন্ধ্যা যদি করোনাভাইরাস ও তার কারণে মৃত্যুভয় আপনাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তবে আপনার মনোবল দূর্বল হতে বাধ্য। তার ওপর যাকে নিয়ে ভয়, তাকে দেখা যায় না। ফলে সারাক্ষণ মনে হতে পারে, এই বুঝি করোনাভাইরাস গ্রাস করল। শারীরিকভাবে আক্রান্ত না হয়েও অনেকে মানসিক বিপর্যয়ে ভুগছেন।
অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে গিয়ে অন্য উপসর্গও তৈরি হচ্ছে। কেউ লাইসোল দিয়ে নিজের হাত-পা পরিষ্কার করতে গিয়ে ত্বকের ক্ষতি করছে। কেউ আদা ও গরম পানি দিয়ে অতিরিক্ত গার্গল করতে গিয়ে কণ্ঠনালীর ক্ষতি করছে। এই রোগের চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে নানা ওষুধের নাম শোনা যায়। একটির নাম প্রচার হওয়া মাত্রই কিছু মানুষ হুমড়ি খেয়ে সে ওষুধ কিনে খাওয়া শুরু করে দিচ্ছে। এ কারণে একদিকে যেমন বাজারে সেসব ওষুধের সংকট তৈরি হচ্ছে, তেমনি আবার অকারণে ওষুধ সেবনের ফলে শরীরে অন্য সমস্যার জন্ম হচ্ছে।
সর্বোপরি এই রোগের সার্বক্ষণিক চিন্তায় মানুষের কর্মদক্ষতা কমে যাচ্ছে। মৃত্যু অতি সন্নিকটে জানলে মানুষ হাল ছেড়ে দেয়। এ কারণেই সৃষ্টিকর্তা মানুষকে তার আয়ু জানার কোন ব্যবস্থা রাখেননি। মানুষ অবশ্যই মৃত্যুর কথা স্মরণে রাখবে, পরকালের শাস্তির ভয়ে সৎপথে চলবে। কিন্তু মৃত্যুর ক্ষণ জেনে গেলে মানুষ হয় উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাবে, নতুবা হতাশাগ্রস্থ হবে। এ দুটির কোনোটিই সভ্যতার জন্য ইতিবাচক নয়, সৃষ্টিকর্তাও তা চান না।
সৃষ্টিকর্তা এই সুন্দর পৃথিবী তৈরি করে মানুষকে পাঠিয়েছেন তাঁর সৃষ্টি উপভোগ করার জন্য। মহামারি, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ আরও নানা বিপদ থাকবেই। সে সব বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় আবিষ্কার করার ক্ষমতাও মানুষকে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু সে সৃজনশীলতাকে ব্যবহার না করে হতাশায় ভুগলে তো প্রতিকার মিলবে না।
কবিগুরুর ভাষায়, ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর, এ নহে মোর প্রার্থনা। বিপদে আমি না যেন করি ভয়’। আমাদের এখন প্রয়োজন মানসিক শক্তি। মনে রাখতে হবে, এখানেই পৃথিবীর শেষ নয়। নতুন একটি ভোর অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সে ভোরের সন্ধান আমাদেরকেই বের করতে হবে। সব প্রচার মাধ্যমের কাছে অনুরোধ, সেই নতুন আলোর কথা বলুন, সেই আলোর পথে এগিয়ে যেতে সবাইকে উজ্জ্বীবিত করুন।

লেখক: অধ্যাপক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র