ওয়াটকিনস গ্লেন ও টুগানুক ফলসে একদিন

গর্জ ট্রেইলের শুরুতেই আছে মনোমুগ্ধকর লোয়ার ফলস

নিউইয়র্ক নগর থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের শহর কর্নিং। নিউইয়র্কের ফিঙ্গার লেক রিজিওনের এই জায়গায় গত মাসে বেশ কয়েক দিন থাকার সুযোগ হয়েছিল। ওয়াইনের জন্য এই অঞ্চল সুপ্রসিদ্ধ। তবে আঙুলের মতো ছড়িয়ে থাকা লেক ও অগুনতি ঝরনা এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

ছুটি একদিনের। তাই তাই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বেরিয়ে পড়লাম ওয়াটকিনস গ্লেন ও টুগানুক ফলস দেখতে। সঙ্গে আছে ইউএস আর্মিতে কর্মরত বন্ধু শুভ। মাত্র ২৫০ কিলোমিটার দূরে শুভর মিলিটারি ক্যাম্প। তাই দুজন মিলে উইকেন্ডে এক সঙ্গে ট্রেকিং করার পরিকল্পনা করেছিলাম।

৩০ মার্চ সকাল। নাশতা সেরে প্রথমে রওনা হলাম ওয়াটকিনস গ্লেনের উদ্দেশ্যে। এটি নিউইয়র্কের ফিঙ্গার লেক অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টেট পার্ক। পার্কে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ১৯টি ঝরনা। ঝরনার পাশে ক্যাম্প করার লোভে নিউইয়র্ক তো বটেই আশপাশের স্টেটগুলো থেকেও লোকজন ছুটে আসে। সঙ্গে যোগ হয়েছে অল্প দূরে বয়ে চলা লেক সেনেকার নীল-সবুজ জলের মোহময় আকর্ষণ। ৩৮ মাইল দীর্ঘ লেকটির ঘন ঘন ঢেউ খেলে যাওয়া জল দেখে নদী ভেবে কারও ভুল হতে পারে। আদতে এটি ১১টি ফিঙ্গার লেকের মধ্যে বৃহত্তম এবং নিউইয়র্ক স্টেটের গভীরতম লেক (সর্বোচ্চ ৬৫০ ফুট)। গভীরতার দিক থেকে কোনো কোনো জায়গায় সাগরতলকেও হার মানানো লেকটি শুনেছি পৃথিবীর বুকে ট্রাউট মাছের সবচেয়ে বড় স্বর্গরাজ্য। কনকনে ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও কিছু শৌখিন মৎস্য শিকারিদের আনাগোনা দেখে মনে হলো, কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়।

কর্নিং থেকে ঘণ্টাখানেক ড্রাইভ করে আমরা পৌঁছালাম পার্কের মূল প্রবেশ পথে। এখান থেকে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে হবে। ম্যাপ দেখে নিলাম, মূল ঝরনার দিকে বেশ কয়েকটা ট্রেইল চলে গেছে। আমরা গর্জ ট্রেইল ধরে হাঁটা শুরু করলাম। গর্জ ট্রেইল অনেকটা আমাদের দেশের ঝিরিপথের মতো। পাথরের বিছানার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া অসংখ্য আঁকাবাঁকা সরু জলের ধারা, কোথাও কম, কোথাও বেশি। সেই জল মাড়িয়ে হেঁটে যাওয়া। ঝিরির শুরুতেই ১৯টি ঝরনার প্রথমটি চোখে পড়ল, এর ওপর দিয়ে গর্জের দুই কিনার সংযুক্ত করেছে সেন্ট্রি ব্রিজ। ক্যামেরা বের করে পটাপট কিছু ছবি তুলে নিলাম। আবারও গর্জের পিচ্ছিল পাথুরে পথে হাঁটা ধরলাম।

দেড় মাইল লম্বা এই ট্রেইলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা রেইনবো ফলস। ৯০ ডিগ্রি কোণ করে জলের ধারা সরাসরি আছড়ে পড়ছে গর্জের পাথুরে বুকে। শীত তখনো যায়নি, জল তাই নেই বললেই চলে। আফসোস হচ্ছিল কয়েক দিন টানা বৃষ্টিপাতের পর এলে ফলসের পূর্ণ সৌন্দর্য দেখতে পেতাম। খানিকটা অতৃপ্তি নিয়েই পার্ক থেকে বেরিয়ে এলাম।

দূর থেকে টুগানুক ফলস

পরের গন্তব্য টুগানুক ফলস। এ ঝরনাটা নিয়ে অবশ্য আমরা আশাবাদী। কারণ এখানে সারা বছর বেশ পানি থাকে। রকি মাউন্টেনের পূর্ব দিকে উঁচু সিঙ্গেল ড্রপ ফলস এটি (২১৫ ফুট বা ৬৬ মিটার)। যা নায়াগ্রা ফলস থেকেও ৩৩ ফুট (প্রায় দশ মিটার) উঁচু। এরই পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ফিঙ্গার লেকগুলোর মধ্যে দীর্ঘতম লেক কায়ুগা। পুরো ইথাকা জুড়ে বয়ে চলা ৪০ মাইল দীর্ঘ এই লেকটির বুকে যেন ঘন নীল কালি কেউ গুলে ঢেলে দিয়েছে। মিসরের নদীর নাম যদি ‘নীল’ না হতো, তবে এই নামটা আমি কায়ুগাকেই দিয়ে দিতাম। হ্রদের গাঢ় নীল রঙের আবেশে কিছুক্ষণ কাটিয়ে, ছবি তুলে আমরা আবার ঝরনার পথ ধরলাম।

চমৎকার এই ঝরনা দেখার দুটি উপায় আছে। দ্রুততমটি হচ্ছে টুগানুক স্টেট পার্কের গাড়ি পার্কিং লটের কাছাকাছি ওভারলুক পয়েন্ট থেকে দেখা। হাইকিং করার সময় না থাকলে এখান থেকে এক পলকে আশপাশের ক্লিফসহ ঝরনাটির একটি প্যানোরমিক ভিউ পাওয়া যায়। গোটা এলাকাটা গামলার মতো গোল, দেখতে ঠিক যেন একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার।

দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে হাইকিং করে সরাসরি অ্যাম্ফিথিয়েটারের পেটে ঢুকে যাওয়া। আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় আট মাইল ট্রেইল। আমরা আবার গর্জ ট্রেইল বেছে নিলাম। গর্জ ট্রেইলের শুরুতেই একটা ২০ ফুট উচ্চতার চমৎকার খাটো জলধারা চোখে পড়ল। এত অল্প পরিশ্রমে এত সুন্দর প্রশস্ত ঝরনা এই প্রথম দেখলাম। ঝরনার জলের ওপর রংধনু দেখে মনটাই উৎফুল্ল হয়ে গেল। যত এগোচ্ছি গাছপালা ঘন হয়ে আসছে, পাশের পাহাড়ের গায়ে এখনো টুকরো টুকরো বরফ জমে আছে। লম্বা লম্বা ন্যাড়া গাছগুলোর মাঝে হঠাৎ হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে কচি সবুজ পাতা। তার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে ওম ছড়াচ্ছে নরম সূর্যের আলো।

এক সময় নরম মাটি ছেড়ে হাঁটতে লাগলাম ক্রিকের বেড ধরে। ৩৮০ মিলিয়ন বছর আগে সাগর ছিল এই হালকা ধূসর চুনাপাথরের পথ। পথের পাশে সাইনবোর্ডে লেখা জায়গাটার উৎপত্তির ইতিহাস জেনে মনে হচ্ছিল, প্রাগৈতিহাসিক কোনো স্থানে চলে এলাম বুঝি। ক্ষয়ে যাওয়া পাথরের খাঁজে খাঁজে পানি জমে আছে, সেই পানি ডিঙিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পৌঁছে গেলাম ট্রেইলের শেষ প্রান্তে ব্রিজের গোড়ায়। ব্রিজ পেরোলেই মূল ঝরনা।

চারপাশে গোল করে ঘিরে দাঁড়ানো পাথরের দেয়াল, মাঝখানে একটি মাত্র ধারায় উপত্যকা থেকে প্রবল উন্মত্ততায় পড়ছে জল। তুমুল বেগে আছড়ে পড়া জলের মিহি কণাগুলো গোড়ার দিকে কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া একটা আমেজ সৃষ্টি করেছে। এখানে বাতাস অনেক শীতল, পাথরের দেয়াল ভেদ করে সূর্যের রশ্মি পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারেনি। তাই লেকের চারপাশের গাছের শেকড়-বাকর এখনো বরফাচ্ছাদিত। সব মিলিয়ে অভূতপূর্ব দৃশ্য। উচ্চতার তুলনায় ঝরনাটি পাশে ততটা বিস্তৃত নয়, তবে টুগানুক ফলস হতাশ করেনি।