আমার বাবা

অলংকরণ: তুলি

আমার বাবা একজন নিরক্ষর মানুষ। লিখতেও পারেন না, পড়তেও জানেন না। তবে স্মরণশক্তি খুব ভালো; সহজেই সবকিছু মনে রাখতে পারেন। হিসাব করতে দিলে মুখে মুখেই হিসাব করে ফেলেন। কথাও বলেন শিক্ষিত মানুষের মতো। শিক্ষাগত যোগ্যতার একাধিক সার্টিফিকেট থাকলেই যে তিনি শিক্ষিত, আমি তা বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করি না এ জন্য যে যদি তাঁর আচার-ব্যবহার খারাপ হয়, তাঁর দ্বারা যদি কারও ক্ষতি হয়, হন যদি দুর্নীতিবাজ, তিনি কখনো শিক্ষিত হতে পারেন না।

বাবা আমার গায়ে কখনো হাত তোলেননি। তবে শাসন করেছেন তাঁর নীতিকথা দিয়ে, যৌক্তিক কথা দিয়ে।

আমি ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি বাবা খুব পরিশ্রম করে আসছেন। তিনি পরিশ্রম করা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। তিনি জানেন, পরিশ্রমই সফলতার কাঠি। এখন বয়স্ক, তবু পরিশ্রম করা ছেড়ে দেননি। কাজকর্ম এখনো করছেন। তিনি জানেন, নিজেকে কর্মে রাখলে শরীর ভালো থাকে।

এখনো মনে পড়ে যায়, বাবা আমার জামাকাপড় ধুয়ে দিতেন, রাতে শোয়ার সময় বিছানা ঝেড়ে দিতেন এবং মশারি টাঙিয়ে দিতেন। বাবা আমার মায়ের রান্নার কাজে এমনকি থালাবাসন ধোয়ার কাজেও খুব সাহায্য করতেন।

২.

আমি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমি এক স্যারের সঙ্গে রাগ করে চিঠি লিখে বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমার প্রিয় মা-বাবা, আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি তা আমি জানি না। ভুল হলে ক্ষমা করে দিয়ো, আর নাও আসতে পারি।’ ভোরে বাড়ি ছেড়ে চলে যাই।

আমার ছোট বোন সন্ধ্যার দিকে চিঠিটা দেখতে পেল। চিঠিটা পড়েই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। মা-বাবাও কাঁদছেন। যখন গভীর রাত হলো, তখন বাবা ঘর থেকে বের হয়ে কাঁদতে থাকেন। আবার যখন ঘরে আসেন, তখন আমার জামাকাপড়, বই–খাতার দিকে চেয়ে কাঁদতে থাকেন। আবার ঘর থেকে বের হয়ে কাঁদতে থাকেন। তাঁর এভাবেই রাতটি পার হয়ে যায়।

ভোরে সকালেই সবাই আমার খুঁজতে বের হলেন। আমার মেজ চাচা খোঁজ করে আমার দেখা পেয়ে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় বাবা কেমন করেছিলেন, চাচা তা বললেন। আমি চাচার সঙ্গে কোনো কথা বলছিলাম না, চুপ করে শুধু শুনছিলাম। বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। আমি কারও সঙ্গে কথা বলছি না। মা আমাকে দেখে কাঁদতে থাকেন। আমার বাবা তখন পর্যন্ত ভাতও খাননি। অবশেষে আমি বাবার সঙ্গে বসে একই থালায় ভাত খাই।

৩.

পাঁচ বছর পর, কোনো এক ভুলের কারণে আমার কঠিন বিপদ এল। পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। আমি আমার নানাবাড়ি পালিয়ে রইলাম। নানাবাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। যখন রাত দুইটা বাজে, যখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন আমি দরজার সামনে বাবার কাশি দেওয়া শুনতে পেয়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি দরজাটি খুলে দেখি, বাবা দরজার সামনে বসে আছেন। আর ঠান্ডায় কাশছেন। বাবা আমাকে বললেন, ‘বাবা তুমি ঘুমাও, আমি এখানেই আছি। পুলিশ এখানে আসে কি না দেখছি। অনেক লোক আছে, তুমি যে এখানে আছ, তা জানিয়ে দিলে ওই শত্রু পরিবারে খবর পেয়ে এখানে পুলিশ নিয়ে আসতে পারে। রাত পোহালেই তুমি ঢাকায় চলে যাবে। আমি পাহারা দিচ্ছি, কোনো চিন্তা কোরো না, তুমি ঘুমাও।’

ভোর সকালেই রওনা দিয়ে আমি ঢাকায় চলে এলাম। এর কিছুদিন পর চেয়ারম্যান আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি ঢাকা থেকে এলাম। বিপক্ষের লোকজনও এলেন। আমার বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হলো। আমার বিরুদ্ধে এক লোক যেভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন, আমি নিশ্চিত আমার শাস্তিসহ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। অবশেষে চেয়ারম্যান সাহেব আমার বক্তব্য শুনলেন। কিছু প্রমাণ ছিল আমার কাছে, তা জানানো হলো। বাধ্য হয়ে রাগের মাথায় আমি যে অন্যায় করেছি, জানি, আমার কিছু শাস্তি পেতে হবে।

গ্রামের কিছু মুরব্বি এবং আমাদের তিন নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যসহ আমার পক্ষ হয়ে যুক্তিযুক্ত কিছু কথা বললেন। তারপর চেয়ারম্যান সাহেব বাবাকে বললেন, ‘আপনার ছেলেকে শাসন করে নিয়ে যান।’

বাবা এই প্রথম আমাকে মারবেন, গায়ে হাত তুলবেন। এবার মুখে শাসন করলে হবে না। আমার বাবা তো আমাকে কোনো দিন মারেননি, গায়ে হাত তোলেননি, আজ কি আমাকে মারবেন? গায়ে হাত তুলবেন? বাবার চোখে জল আসার মতো। ছোট চাচা আমাকে শাসন করে, কিছু বেত্রাঘাত করে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

আজ আমি বাবার কাছ থেকে অনেক দূরে আছি, আছি দূর প্রবাসে। খুব মনে পড়ে বাবাকে। আল্লাহ যেন তাঁকে সুস্থতা ও নেক হায়াত দান করেন।

লেখক: শেখ সজীব আহমেদ, মালদ্বীপ