আমাদের রোজা ও ঈদ

বাংলাদেশিদের আয়োজনে ইফতার পার্টি
বাংলাদেশিদের আয়োজনে ইফতার পার্টি

জাপানের আসার পর তিনটি রমজান পার করলাম। সবকিছুই করলাম সাধ্যমতো। কিন্তু অপূর্ণতার অতৃপ্তিটা বোধ হয় কোনোভাবেই কাটবার নয়। জাপানিজ মিডিয়ার কল্যাণে ও ক্রমবর্ধমান মুসলমানদের দেখে এখন অনেক জাপানিই রামাদান শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। যদিও এত সময় না খেয়ে থাকি, এমনকি পানি, জুস বা সিগারেট কিছুই খাই না, এটা তারা ভাবতেই পারে। বারবার জিজ্ঞেস করে, কিছুই খাবে না, মানে কিছুই না? কেউ আবার বন্ধুত্বের আরও একধাপ এগিয়ে বলে, খেয়ে নাও আমি/আমরা কাউকে বলব না। মনে মনে হাসি। ধন্যবাদ জানিয়ে খাব না বলি।

ঈদের নামাজে খুতবা
ঈদের নামাজে খুতবা

সারা দিন ল্যাব করে, কিছুটা আগেই ছুটি নিয়ে, বাসায় ইফতার করার জন্য যখন হন্তদন্ত করে ছুটি, তখন রাস্তায় ট্রাফিক বেশি হলে মনে হয়। ভাবি সবাই বাসায় ফিরছে তো তাই এত গাড়ি। কিংবা শপিং মলে বেশি লোক দেখলে মনে হয় ঈদের কেনাকাটা বোধ হয় শুরু হয়েই গেল। সারা দিন খালি পেটে থেকে, প্রথম যে খাবারটা বোধ হয় সবচেয়ে ক্ষতিকর হতে পারত, আমরা সেই খাবারটিকেই ইফতার হিসেবে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি—পেঁয়াজি, বেগুনি, বড়া, চাপসহ ভাঁজা পোড়া। এতটাই ভালোবেসে ফেলেছি যে, এখানে এসেও তার অভ্যাস ছাড়তে পারিনি। অন্য কিছু খেলে মনে হয় ইফতারই হলো না।

নামাজ শেষে সবাই
নামাজ শেষে সবাই

অবশ্য সুশি-সাশিমি খেয়ে ইফতারও স্বাস্থ্যকর হতে পারত, কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। ইফতার করতে যখনই যাই, বারবার মনে পড়ে বাবা-মায়ের কথা। একসঙ্গে ইফতারের কথা। কিছু করার নেই জানি, তাই শুধু দোয়া করি আল্লাহ তুমি তাদের ভালো রেখ। যখন নামাজ পড়তে যাই, বাবার কথা ভীষণ মনে পড়ে। একসঙ্গে প্রতিদিন নামাজে গেছি, এখন আর তা হয়ে ওঠে না। মনে মনে ভাবি কেন যে বড় হলাম!
নামাজে গিয়ে ভীষণ ভালো লাগে যখন ৮-১০ দেশ থেকে আগত মুসল্লিদের সঙ্গে একত্র হই। ভীষণ অবাক হই যখন জানি তাদের অনেকেই ২০-৩০ কিলোমিটার, কেউবা ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে নামাজ পড়তে মসজিদে এসেছেন। আত্মতৃপ্তি পাই যখন মনে হয় আমরা কেউ কাউকে চিনি না, কিন্তু আমরা একত্র হয়েছি একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য। মনটা ভরে যায়।

বাংলাদেশিরা
বাংলাদেশিরা

সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিতে একসঙ্গে মসজিদে ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। সাধারণত একেক সপ্তাহে একেক দেশের কমিউনিটি ইফতার আয়োজন করে সবাইকে দাওয়াত দেন। ফলে একসঙ্গে ইফতারও করা হয়, আবার বিভিন্ন দেশের খাবার ও সংস্কৃতিও জানা হয়। এবারও বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ ইফতারের ব্যবস্থা করেছেন।
রমজান মাসের দিনগুলি যতই ফুরিয়ে আসতে থাকে, মনটা যেন ততই খারাপ হতে থাকে। ঈদ যত এগিয়ে আসে খারাপ লাগাটাও বাড়তেই থাকে। ফেসবুকের কল্যাণে খারাপ লাগাটা আরও বেড়ে গেছে। যখন দেখি বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনেরা বাড়ি যাচ্ছি এমন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন বা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ইফতারের ছবি আপলোড করছেন, মনটা হঠাৎই কেমন যেন হয়ে যায়। অবশ্য দেশ থেকে যখন বাবা-মা, ভাই-ভাবি বা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা পছন্দের শুকনো খাবার, পোশাক পাঠান মনটা ভীষণ ভালো হয়ে যায়।

মেয়ের সঙ্গে লেখক
মেয়ের সঙ্গে লেখক

ইএমএসের কল্যাণে পাঠানো পার্সেল কত দূর এল জানা যায়। এক পার্সেল বাসায় আসার আগেই হয়তো হাজারবার সেটির অবস্থান চেক করা হয়ে যায়। সেটা তো শুধু পার্সেল নয়, ভালোবাসা। এরপর সবাই একসঙ্গে বসে পার্সেল খোলা, একে একে জিনিস বের করা, অন্যরকম মজা। পোশাকগুলো ধরে থাকতেও যেন ভালো লাগে, মনে হয় সেখানে সেই মানুষগুলোর ছোঁয়া লেগে আছে। পার্সেলের সঙ্গে আসা পুরোনো খবরের কাগজগুলো পড়তে কী যে ভালো লাগে! অনলাইন খবরের কাগজ পড়ে আসলে মন ভরে না।
এখানে মোটামুটি সবারই একটা কামনা থাকে, ঈদটা যেন সাপ্তাহিক ছুটির দিন বা অন্য কোনো ছুটির দিনে হয়। যদিও তা হবে কি না বেশ আগেই বোঝা যায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঈদ হবে না জানলে প্রথম কাজই হলো, ছুটির ব্যবস্থা করা। তেমন অতি জরুরি কাজ না থাকলে ছুটি ম্যানেজ করা সাধারণত সম্ভবপর হয়, সারা দিন না হলেও কম করে আধাবেলা। অবশ্য ছুটির ব্যবস্থা করতে পারে না এমন লোকের দেখা পাওয়াও তেমন কঠিন নয়।

নারীরা
নারীরা

এবারের ঈদ ছিল কর্মদিবসে, অবশ্য আমরা এখানকার সব বাংলাদেশিই ছুটি পেয়েছিলাম, সেও সারা দিনের। তাইতো সবাই মিলে একসঙ্গে ঈদের নামাজ পড়ে, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মজাদার খাবার খেয়ে, বেড়িয়ে পড়লাম একসঙ্গে। ঘুরে বেড়ালাম মজা করে। সত্যি কি তাই। হয়তো। কে জানে হয়তো মনের দুঃখ ভুলে থাকবার জন্যই।
যা হোক, ফিরে এলাম সন্ধ্যার পর। দাওয়াত খেলাম সুমন ভাই-অন্তরা আপুর বাসায়। সবশেষে যখন বাসায় ফিরে দেশে ফোন করলাম তখন ইফতার শেষে সবাই ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্কাইপে চোখ লাগিয়ে থাকি, যা দেখি সবই যেন ভালো লাগে। রাতে ঘুমোতে যাই, সকালে তড়িঘড়ি করে উঠি, ঈদের নামাজে যেতে হবে না। কিন্তু ল্যাবে তো যেতেই হবে। সারা দিন ল্যাবে থাকি কিন্তু মনটা পড়ে থাকে সেই দেশেই, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবের মাঝেই। আল্লাহ, সবাইকে ভালো রাখুন, নিরাপদে রাখুন এই কামনা করি।