আন্তরিকতা যখন বিপদের কারণ

এই সময়ে কাউকে বাসায় দাওয়াত দিতে চাইলে সেটা কম লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন

বাঙালির আন্তরিকতা নিয়ে আমরা সবাই বেশ গর্বিত। এই আন্তরিকতা যে আমাদের বিপদেও ফেলতে পারে, তা করোনা না হলে বুঝতে পারতাম না। আমাদের আন্তরিকতার অনেকগুলো প্রকাশের মধ্যে একটা হলো জোরাজুরি করা। মানুষ দাওয়াত না দিলে আমরা দুঃখ পাই। কিন্তু শুধু দাওয়াত পেয়েই আমরা খুশি না, দাম বাড়াতে কেউ কেউ একটু অকারণ ব্যস্ততাও দেখায়। তারা আশা করে ‘না’ করার পর যেন তাদের জোরাজুরি করা হয়। একবার দাওয়াত পেয়ে সেটা কবুল করে ফেললে আর মান ইজ্জত থাকে না। আবার দাওয়াত দানকারীরও সমস্যা আছে। কেউ ‘না’ করলে তার যে সত্যিকার কোনো সমস্যা থাকতে পারে, এটা সেও শুনতে রাজি না। এত অন্তরের সম্পর্ক, এত আপন ভেবে ডাকলাম, অথচ আসল না, তো শুরু হলো জোরাজুরি। তারপর আসতে না পারলে ফোলাও গাল। এখন সেই গাল ফোলানোর ভয়ে নিজের অনেক অসুবিধা থাকলেও অনেকে অনুরোধে ঢেঁকি গেলে। কথা হলো অনুরোধে কত বড় ঢেঁকি গেলা যায়? নিজের প্রাণের ঝুঁকি নেওয়া যায়? না, একদম না। কিন্তু মানুষ তাও নিচ্ছে।

আমার এক বন্ধু দম্পতি ভীষণ সাবধান। কোথাও বের হয় না। মেসেঞ্জারে কথা বললেও এমন সাবধানে কথা বলে মনে হয়, টাইপের মাধ্যমেও ভাইরাস যেতে পারে। একটা বছর নিরাপদে ছিল। হঠাৎ দেখি সেজেগুজে এক বিয়ে বাড়িতে গেছে। এরপরই শুনলাম কোভিড পজিটিভ। নিজে থেকেই বলল ‘এত ক্লোজ মানুষের বিয়ে না করতে পারিনি’। আমি জানতাম, আমিও হয়তো পারতাম না। ওরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ওরা তবু প্রাণ নিয়ে ফিরেছে, ঠিক একই কারণে, অর্থাৎ অনুরোধে নিকটাত্মীয়ের বিয়েতে গিয়ে কোভিড আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি প্রাণ হারাতে শুনেছি কয়েকজনের। কিছুদিন আগেই আমার নানার বাড়ির পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের এনগেজমেন্ট হলো। কয়েক দিন দেখলাম আমার আমার মা, বাবা, ভাইয়েরা বেশ চিন্তিত। তাঁরা কোথাও যাচ্ছে না। কিন্তু আপন ভাইয়ের মেয়ের এনগেজমেন্ট। না গেলে নিজের তো খারাপ লাগবেই, ভাইও মন খারাপ করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাননি। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতো যদি ভাই বোনকে, দুলাভাইকে জোরাজুরি করতেন। জোরাজুরি যদি হয় আন্তরিকতার আরেক নাম, তাহলে সেই আন্তরিকতার এখন সময় না। একেবারেই না। কাউকে দয়া করে জোর করে কোথাও আসতে বলবেন না, কেউ না আসলে মাইন্ডও করবেন না।

আমাদের আরেক আন্তরিকতা খাওয়া নিয়ে জোরাজুরি। মা-বাবা ছেলে-মেয়েকে যে জোরাজুরি করে সেই জোরাজুরি না। মেহমান আসলে আমরা তাদের খাওয়া পাতে তুলে দিই। অনেক সময় সেটা তুলে না দিলে মেহমানও অপমানিত বোধ করে। এভাবেই চলে আসছে আদিকাল থেকে। খাওয়া মানুষের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। আপনি খেতে পছন্দ করেন লেজ, আপনাকে দেওয়া হলো মাথা, তাহলে খাওয়ার তৃপ্তি হয়! এর চেয়েও বড় ব্যাপার মানুষের অনেক অসুখ-বিসুখ থাকে। কেউ দেখতে কম বয়সী বা তরতাজা মানে এই না যে, তার কোনো অসুখ নেই। সে হয়তো সেই খাওয়াটা খেতে ভালোও বাসে। তাকে সেই নিষিদ্ধ জিনিস নিয়ে জোরাজুরি করে দিলেন তার নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে। আমরা ‘না’ বলতে শিখি না। তাই আবার অন্যের মন রাখতে অনুরোধে ঢেঁকি গেলো। এই আন্তরিকতায় কার কী লাভ হলো?

আরেক আন্তরিকতা হলো শেয়ার করা। শেয়ার করা খুব ভালো জিনিস, কিন্তু রোগ জীবাণু বা অসুখ নয়। আমরা আন্তরিক তাই আমরা এক গ্লাসে পানি খাই, এক কাঁপে চা খাই, এক বাটিতে মুড়ি খাই, একের এঁটো আরেকজন খাই, এক গামছায় দশজন গা মুছি। সবাই না করলেও অনেকেই করি। যারা এভাবে অভ্যস্ত, তারা কিন্তু তাদের সঙ্গে এসব না করলে ভীষণ অপমানিত বোধ করে ‘আমি কী অস্পৃশ্য?’

ছোটবেলায় বান্ধবীদের লিপস্টিক পর্যন্ত শেয়ার করতে দেখেছি, পাউডারের পাফ। এখন অভাবের কারণে যদি বাড়িতে যথেষ্ট গ্লাস, কাপ, বাটি কেনার ক্ষমতা না থাকে আর সে কারণে শেয়ার করা হয় সেটা অন্য কথা। সেটা দারিদ্র্যের সাইড এফেক্ট, আন্তরিকতা না। কিন্তু এত দিনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, এই আন্তরিকতা রোগ জীবাণুর সংক্রমণের একটা বড় কারণ। আপনি হাঁচি দিয়ে যে গামছায় মুখ মুছলেন আপনার সন্তান একই গামছায় মুখ মুছে সেই জীবাণু পেয়ে অসুস্থ হলো। আন্তরিক হতে গিয়ে বাড়ির সবার অসুস্থ হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।

আমাকে কেউ ভুল বুঝবেন না। আন্তরিকতা অমূল্য জিনিস। কিন্তু সেটা প্রকাশের সময় বুদ্ধিটাও একটু খাটাতে হবে যদি আপনি আপনার কাছের মানুষদের সত্যি ভালো চান। আরেকটা কথা এই মহামারিকালে কাউকে দুঃসাহসী হওয়ার জন্য জোরাজুরি করবেন না। আপনি বিরাট সাহসী, করোনাকে থোরাই কেয়ার করেন, কিন্তু আপনার আত্মীয়, বন্ধু প্রতিবেশীকে এটা নিয়ে হাসাহাসি করবেন না ‘আরে তুই বেশি ভিতু, বেশি সাবধানীদের অসুখ বেশি হয়, আমাকে দেখ।’ জোরাজুরি করবেন না ‘মাস্কটা খোল না, পুরো ছবিটাই মাটি হয়ে যাচ্ছে।’ কেউ গা ঘেঁষে বসতে না চাইলে কিছু মনে করবেন না। কেউ পাশ থেকে উঠে গেলেও না। সে আপনাকে না, জীবাণুকে ভয় পাচ্ছে এবং নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। অধিকার ফলাতে গিয়ে কাছের মানুষদের মানসিক চাপ দিয়ে প্রকারান্তরে তাদের ক্ষতি করছেন। সবাইকে নিজের মতো থাকতে দিন, যেন সে তার নিজস্ব উপায়ে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা পেতে পারে।