আনন্দ–বেদনার ঈদ

বাঙালির মন বড়ই কোমল। বাঙালির মন যে কোমল, সেই প্রসঙ্গ হঠাৎ কেন? ভূমিকা না দিলে আমার বয়ানকে খোলাসা করা যাবে না। লকডাউন শুরু হলো এবার ‘কঠোর লকডাউন’ নাম দিয়ে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়। যখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক শ মানুষ মারা যাচ্ছিল। আক্রান্তের সংখ্যা দিনে চার হাজারের মত। এই কঠোর ‘লকডাউন’ নাম দিয়ে হলো আর এক বিপদ। বাঙালি যে এত কৌতূহলী, নীতি নির্ধারকদের ধারণা ছিল না। পুলিশ চেক পোস্ট বসাল পথে পথে। প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্স, অটো রিকশায়, কেউ আবার হেঁটে, হেঁটে ছুটছে। পথে পথে উৎসব। উৎসব কেন? প্রথম কিছুদিন কিছু মানুষ রাস্তায় নেমেছে, ‘কঠোর লকডাউন’ কী—এই অভিনব বিষয়টি দেখার জন্য, বোঝার জন্য। পুলিশ কঠোর লকডাউনের শুরুতে যানবাহন থামিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার যৌক্তিকতা জিজ্ঞেস করে মানুষজনকে। যুক্তি শুনে আক্কেলগুড়ুম। কারও বাড়ি রং করতে হবে, কারও অনেকদিন বেয়াই সাহেবের বাড়ি যাওয়া হয়নি। কেউ ‘জাতীয় ছুটি’র এই সময়ে মেয়ের বিয়েটা সেরে ফেলতে চান। আমার কথাগুলো কেউ যদি যাচাই করতে চান, তাহলে বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশনের নিউজ ফুটেজ কিংবা সংবাদপত্রের পাতা খুলে দেখতে পারেন।

পথে বের হওয়া মানুষের সঙ্গে পুলিশের কথোপকথন শোনা যুগপৎ আনন্দ ও বেদনাদায়ক। আমার মনে হয়, করোনাকাল শেষ হয়ে গেলে আনন্দদায়ক কারণগুলোর শীর্ষে থাকবে যে কারণ, সেটি হলো, কঠোর লকডাউন দেখার জন্য পরিবার–পরিজন নিয়ে পথে নামা। এই যে বললাম বাঙালির মন কোমল। এই কোমলতার কারণেই কঠোর লকডাউনের প্রাথমিক সময়ে কঠোর আইনের থেকে মানুষের শখ মেটানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো, পথে বের হওয়া মানুষের অহেতুক কারণগুলো কঠিনভাবে না দেখে মানবিকভাবে (!) দেখা হলো। বাংলাদেশে আজকাল অনেকেই অনেক কিছু করে মানবিকতার কারণে। মানবিকতার কারণে আজকাল আমাদের এই কঠিন সংস্কারে পরিপূর্ণ সমাজে চুক্তিভিত্তিক বিয়ে হচ্ছে, আবার অন্ধভাবে ভক্তরা চুক্তিভিত্তিক আইনপরিপন্থী বিয়েকে মেনেও নিচ্ছেন। বাংলাদেশের থেকে ১০ বছর বেশি বয়সী মানুষ আমি। এ রকম চুক্তিভিত্তিক মানবিকতার বিয়ের কথা শোনা হয়নি আমার কোনোকালে। তবে বঙ্গে ও দুনিয়াতে রঙ্গের অভাব হয় না কখনো। আমাদের সিলেটের বিখ্যাত গায়ক অমর পালের সেই বিখ্যাত সংগীতে অনেক আগেই এ কথা বলা হয়েছে, ‘ও ভাই ভাইরে, কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।’ সত্যজিৎ বাবু আবার আমাদের সিলেটী বাবুর গানটির গুরুত্ব বুঝে, যত্ন করে তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘হীরক রাজার দেশে’তে যথাযথভাবে ব্যবহার করেছেন গানটি। ভাবতে ভালোই লাগে, মানবতার নামে করোনাকালের এই চরম বেদনা ভারাক্রান্ত সময়েও বাঙালি রঙ্গরস করে জানান দেয়, দেখো জাতি হিসেবে আমরা কত হিউমারাস!

বাঙালির কোমল হৃদয় আমরা দেখলাম আরও একটি ক্ষেত্রে। কোমল হৃদয়ের নীতি নির্ধারকেরা বড় বড় শপিং মলের ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এই ভেবে এবং তাঁদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে লকডাউনের মধ্যে শপিংমল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। সরকার থেকে বলা হল, স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য চলে। আহা স্বাস্থ্যবিধি! মাস্ক পরা লোকের সংখ্যা খুব বেশি নেই। বেশির ভাগেরই মাস্ক আছে থুতনিতে। কারও কারও পকেটে। কারও মাস্ক বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে মনে থাকে না। মাস্ক পরে না–পরে যারা ঈদের বাজার করতে শপিং মলে ঢোকেন, তাঁরা অতিমারির কালে নিজের জন্য ঈদের বাজার করতে আসেন না। তাঁরা আসেন পরিবারের ছোট ছোট শিশুদের জন্য। সবাই একই কথা বলছেন, ‘আমাদের ঈদের বাজার করার ইচ্ছে ছিল না। শিশুদের জন্য বাধ্য হয়ে আসতে হলো।’ আবার টেলিভিশন সংবাদে আমরা দেখি শিশুদের থেকে বুড়ো খোকা–খুকিদের কাপড় পোশাকের দোকানে ভিড় বেশি। আহারে অবলা শিশুর দল!

কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছিল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, ইংরেজি ১৪ এপ্রিল। লকডাউনকে কঠোরতম করে ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে অনুরোধ করেছিলেন, যে যেখানে আছেন, সেখানে থেকেই ঈদ উদ্‌যাপনের। জলে–স্থলে যখন মানুষ নিজেদের উৎসর্গ করতে পাগলপ্রায়, তখন তিনি আবারও ব্যাকুল হয়ে বললেন, ‘আপনারা পথে নেমে নিজেদের সঙ্গে অন্যদেরও বিপদগ্রস্ত করবেন না।’ আমাদের সরকারি দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তাঁর স্বভাবসুলভ অনন্য ভঙ্গিতে অনুরোধ করলেন এভাবে, ‘ঈদ যাত্রা যেন অন্তিম যাত্রা না হয়।’ এত হুঁশিয়ারি, এত কথা শোনার সময় কোথায়? জলে, স্থলে, অন্তরিক্ষে বাঙালি ছুটছে। বাঙালি প্রতি বছরই নানা উৎসবে বাড়ি ছুটে, এবারও একই উৎসাহে ছুটছে। বাঙালির এই ছোটা আজকের নয়, বঙ্কিম চন্দ্র থেকে নজরুলের আমলেও আমরা এই ছুটে চলার গল্প শুনতে পাই। সে সময় মানুষ সুদূর ব্রহ্ম দেশ থেকে উৎসবে বাড়ি ফিরত। ওই সময়ের উপন্যাসে নায়কেরা গোয়ালন্দ ঘাট হয়ে নানান স্থানে যেতো। এখন ফেরে পাটুরিয়া, শিমুলিয়া ঘাটসহ নানা ফেরিঘাট দিয়ে। বাঙালি ফিরে উৎসবে আর ফিরে দুর্যোগে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য। বাঙালির ফেরাকে ঠেকানোর সাধ্য কার?

একাত্তরে শহর থেকে গ্রামে ফিরেছিল মানুষ প্রাণের ভয়ে। যুদ্ধে প্রথম দিকে গ্রাম কিছুটা নিরাপদ ছিল। মানুষের ওই গ্রামে ছুটার কথা শুনলে কিংবা টেলিভিশনে দেখলে আমার সৈয়দ শামছুল হকের বিখ্যাত কাব্য নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এর প্রথম দৃশ্যের সংলাপ গুলো মনে হয়।

মানুষ আসতে আছে কালীপুর হাজীগঞ্জ থিকা

মানুষ আসতে আছে ফুলবাড়ি নাগেশ্বরি থিকা

মানুষ আসতে আছে যমুনার বানের লাহান

মানুষ আসতে আছে মহরামের ধুলার সমান।

যদিও এখন যুদ্ধ দিন নেই। কোনো শত্রু আমাদের পেছন থেকে অস্ত্র নিয়ে তাড়া করছে না। তবুও যুদ্ধ দিনের মতো আমাদের ‘যমুনার বানের লাহান’ বাড়ির দিকে ছুটতে হবে। যুদ্ধ দিনের মতোই প্রাণ হাতে নিয়েই ছুটতে হবে কেন? এবার কেন মানুষ স্বজনদের বিপদে ফেলার জন্য ছুটবেন? প্রতি বছর এই ছুটে চলাকে কেউ নেতিবাচক ভাবে দেখে না, দেখার কোনো কারণও নেই। ঈদ, পূজার মতো পার্বণে নাড়ির টানে মানুষ কাছের মানুষের কাছে যেতে চায়। এই যাওয়া, যেতে চাওয়ার ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অন্যের জন্য মৃত্যুর আয়োজনকে ত্বরান্বিত করে এ রকম পাগলের মতো ছুটাকে শুধু সরকার নয়, সব শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ অশনিসংকেত বলে মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞরা ভয়ে আছেন, দ্বিতীয় ঢেউ যখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে তখন আমরা সবাই মিলে কী তৃতীয় ঢেউকে ঈদের পর আমাদের এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে আমন্ত্রণ জানানোর চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে করোনার মারাত্মক ‘ভারতীয় ধরন’ বাংলাদেশে ধরা পড়েছে। ৯ মে পর্যন্ত সরকারিভাবে ছয়জনকে শনাক্ত করা হয়েছে যারা করোনার ভয়ানক ভারতীয় ধরন বহন করছেন। আর যারা শনাক্ত হননি, তারা যদি এই ভিড়ের মধ্যে পড়ে অন্যদের শরীরে একবার ভারতীয় ধরনের করোনা ছড়িয়ে দেন, তাহলে? ভাবতেই ভয় লাগছে। নেপাল ইতিমধ্যে যথেষ্ট বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ভারতের মতো নেপালের সঙ্গেও আমাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এত কিছু দেখার পরও মৃত্যুকূপে ঝাঁপ দেব?

মজার ব্যাপার হলো, যারা ছুটছেন কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো তাঁদের ডেকে জিজ্ঞেস করেন, কেন এভাবে ছুটছেন তাঁরা। তাঁদের সবাই আপনাকে করোনা বিশেষজ্ঞের মতো চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দেবেন, ছুটা মোটেই ভালো কাজ নয় ছোটাছুটি করে জাতিকে বিপদে ফেলা বড়ই অনৈতিক কাজ। শুধু নিজেদের ছোটার মধ্যে পৃথিবীর অলঙ্ঘনীয় কিছু যুক্তি আছে। আপনি সংবেদনশীল মানুষ হলে হয়তো নিজেই লজ্জা পাবেন। এই হলো বাঙালি চরিত্র। সব সময় জেনেশুনে বিষ পান করে বাঙালি গান গাইবে, ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান।’

সব মহামারি অতিমারিকে এক সময় পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়েছে কিংবা মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসতে হয়েছে। করোনা অণুজীবও এক সময় আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেবে অথবা নিয়ন্ত্রণে আসবে। আমরা হয়তো আগামী বছর ঈদসহ যাবতীয় উৎসব পালন করব মহাআনন্দে। আমাদের আগামীর উৎসবগুলোকে আরও সুন্দর করে তোলার জন্য আমরা কী পারতাম না, এ বছর নিজেদের আরেকটু সংযমী করে তুলতে? সংযমী হওয়ার জন্য জ্ঞান, বুদ্ধিতো আমরা পেয়েছি। এই অতিমারিকালের ভয়াবহতার জন্য আমাদের উত্তরসূরিরা যেন ভবিষ্যতে আমাদের কাণ্ডজ্ঞান, বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন না তোলে।

ঈদযাত্রার সমূহ বিপদের পরও আমরা বলব, ঈদের মতো আনন্দদায়ক উৎসব যেন আমরা নির্ঝঞ্ঝাটে পালন করতে পারি। আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু–বান্ধব যারা বাড়িতে চলে গেছেন নানাভাবে, তাঁরা ফিরে আসুন নিরাপদে। তাঁদের উদ্‌যাপন হোক আনন্দময়। আমরা প্রার্থনা করি, ঈদের পর যেন দাবানলের মতো করোনার তৃতীয় ঢেউ দেশে ছড়িয়ে না পড়ে। ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে। সমতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সবাইকে কাছে টানার ঈদের যে মর্মার্থ—তা যেন আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পারি। এবারের ঈদ কাটুক আকুল প্রার্থনায়। অপেক্ষায় থাকি ভবিষ্যতের আনন্দময় ঈদের জন্য। আন্তরিক ঈদ শুভেচ্ছা।