আধুনিক পান্তা বুড়ির গল্প
ছোট নাতি রায়ান দাদির কাছে বায়না ধরেছে তাকে ঘুমানোর আগে গল্প শোনাতেই হবে। নাহলে তার ঘুম আসছে না। গল্প শুনতে শুনতে ঘুমাতে যাওয়া তার প্রতিদিনের অভ্যাস। তাকে বলতে বলতে দাদির গল্পের ভাড়ার প্রায় খালি হয়ে গেছে। যা–ও দু–একটা বাকি আছে, বয়সের ভারে আর সেগুলো মনে আসে না। তাই দাদি ভাবল, পুরোনো একটা গল্পকেই নতুন চরিত্র দিয়ে বললে কেমন হয়। রায়ানের বয়স মাত্র পাঁচ বছর ও নিশ্চয় ধরতে পারবে না। বলেই দাদি শুরু করল।
অস্ট্রেলিয়া নামে এক দেশ আছে এখান থেকে সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে। সেই দেশে বাস করত আমাদের আগের পান্তা বুড়ির নাতির ঘরের পুতির ঘরের নাতনি। রায়ান বলল, আগের পান্তা বুড়ি মানে তুমি কি সেই চোরকে জব্দ করা পান্তা বুড়ির কথা বলছ দাদি” দাদি বলল হ রে বাছা হ, সে ছাড়া আর কে আছে পান্তা বুড়ি? সে সহায়–সম্বলহীন ছিল বলেই তো একবেলা রেঁধে বেঁচে যাওয়া ভাতটুকুতে পানি দিয়ে রেখে দিত অন্য বেলায় খাবে বলে। তখন আর তোমাদের এখনকার মতো ফ্রিজার ছিল না তাই। কিন্তু চোর ব্যাটা সেই পান্তাতেই ভাগ বসাত, বুঝলি। রায়ান সমঝদারের মতো ঘাড় নাড়ল।
দাদির গল্প এগিয়ে চলে। তো সেই পান্তা বুড়ির নাতনির বাসায় যদিও ফ্রিজার ছিল, কিন্তু সে ছিল একেবারে মনেপ্রাণে বাঙালি। তাই তার পূর্বপুরুষের প্রায় সবকিছুই সে ধরে রাখার চেষ্টা করত। যদিও অন্যরা সেসব ভুলে নিজেদের আধুনিক বানানোর জন্য অহোরাত্রি খাটত। পান্তা বুড়ির নাতনির এটা দেখে মনে মনে খুব খারাপ লাগত। সে সব সময় ভাবতো, মানুষ এমন কেন? দেশ বদলালেই কেন দেশের মানুষ, দেশের অভ্যাসগুলোকে ভুলে যেতে হবে। তার কাছে এই গায়ে হাওয়া লাগানো আধুনিক মানুষের চলাফেরাকে একেবারে মেকি মনে হতো। সে ভাবল, এগুলো থেকে এদের কীভাবে বের করে আনা যায়। যেই ভাবা সেই কাজ।
একদিন সে একটা খাবার তৈরির প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়ে এল। সেখানে দেশ–বিদেশের বিভিন্ন উপাদেয় খাবার রান্না করে রাজার রসনা তুষ্ট করতে পারলেই মিলবে পুরস্কার আর তার পূর্বপুরুষের খাবার পান্তাও ফিরে পাবে তার সম্মান। পান্তা বুড়ির নাতনি ভাবল, এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর আসবে না। হীনম্মন্যতায় ভোগা বাঙালিকে এবার তাদেরই অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার রাজার মুখ দিয়েই বলিয়ে ছাড়বে যে বাঙালির খানাখাদ্য কত উপাদেয়। এরপর একদিন সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। একেকটা ধাপে সে একেকটা পদ রান্না করে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে শুরু করল।
এভাবে একসময় সে একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল। ঠিক তখনই এল সেই সময়। রাজা নিয়ে এল কয়েকটা জাদুর বাক্স। সেসব জাদুর বাক্সের মধ্যে বেলের মতো দেখতে কিছু বস্তু রাখা। একেকটা বাক্স থেকে একেকটা বেল তুলে ফাটিয়ে ফেললে তার মধ্যে যে শর্ত থাকবে, সেই শর্ত মেনে রান্না করতে হবে। নাতনীর ভাগ্যে পড়ল একটা বেল। সেটা ফাটিয়ে দেখা গেল, তাকে এমনভাবে রান্না করতে হবে, যেন তাতে ধোঁয়ার ব্যবহার থাকে। এখন বুঝতেই পারছ, ওদের তো আর মাটির চুলা না যে ধোঁয়া হবে। তখন নাতনির মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল।
সে করল কি, প্রেশার কুকারে ভাত বসিয়ে দিল। এরপর ভাত সেদ্ধ হয়ে এলেই দিল প্রেশার কুকারের নব খুলে। ব্যস, রেলগাড়ির মতো হুইসেল দিয়ে ফোয়ারার মতো ধোঁয়া বেরিয়ে এল। রাজদরবারে ধন্য ধন্য রব পড়ে গেল। আর করতালিতে সারা রাজদরবার মুখর হয়ে গেল। চারদিকে নাতনির প্রশংসা শুরু হয়ে গেল, কিন্তু নাতনি সেখানেই থেমে গেল না। সে ভাতগুলো কুকার থেকে নামিয়ে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রেখে তরকারি রান্নায় মনোযোগ দিল। প্রথমেই সে করল আলুর ভর্তা, তারপর বাংলাদেশের আদলে গ্যাসের চুলার আগুনে একটা টকটকে লাল মরিচ পুড়িয়ে নিল। পান্তাটা পরিবেশন করল শানকির মতো একটা পাত্রে। তার মধ্যে স্তূপ করে দিল আলুর ভর্তা আর তার ওপর সাজিয়ে দিল পোড়া মরিচটা।
এরপর লেগে গেল তরকারি রান্না করতে। বাংলাদেশে পান্তা বুড়ির মতো গরিব মানুষেরা পান্তার সঙ্গে শুধু এই পোড়া মরিচটাই খায়। ভাগ্য ভালো হলে একটু আলুভর্তাও কপালে জুটতে পারে। কিন্তু রাজারা পান্তার সঙ্গে শখ করে ইলিশ মাছ খায়, সালাদ খায়। এখন এই দূরদেশে নাতনি ইলিশ মাছ পাবে কোথায়। কারণ, ইলিশ মাছ শুধু পাওয়া যায় বঙ্গীয় উপদ্বীপে। সে অনেক খুঁজে ইলিশের মাছের কাছাকাছি স্বাদের সার্ডিন মাছ তেল দিয়ে মুচমুচে করে ভাজি করে দিল। আর ধনেপাতা, পেঁয়াজ দিয়ে বানিয়ে দিল সালাদ। সব কটি খাবার যখন একসঙ্গে সাজিয়ে রাজার সামনে পরিবেশন করল, তখন রাজা মহাশয়ের তো চক্ষু চড়কগাছ।
রাজা মহাশয়কে পান্তা খেতে হবে ভেবে উনার অনেক মোসাহেবই শুরুতে নাক সিটকাচ্ছিল, কিন্তু পান্তা বুড়ির নাতনির পরিবেশনা দেখে সবাই থ হয়ে গেল। রাজা মহাশয় বসলেন টেস্ট করতে। শুরুতেই পান্তার শানকি থেকে আলুভর্তাসহ এক চামচ ভাত মুখে দিলেন। এরপর সেটা মুখের মধ্যে রেখেই মাছের টুকরাতে দিলেন এক কামড়। এরপর চোখ বন্ধ করে চিবুতে থাকলেন। চিবুতেই আছেন আর চিবুতেই আছেন। চোখ আর খুলেন না। মুখের খাবারটুকু অবশেষে পেটে চালান করে দিয়ে চোখ খুললেন। খুলেই একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন, মারহাবা মারহাবা।
এরপর মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, এই খাবার আমাকে এত দিন কেন খেতে দেওয়া হয়নি। মন্ত্রী বললেন, রাজা মহাশয় মাফ করবেন। এটা তো চাষাদের খাবার। গরিব চাষারা রাতে খাবার পর যে ভাত বেঁচে যায়, সেটাতে পানি দিয়ে রেখে দেয়, যাতে পচে না যায়। তারপর সকালে উঠে সেই পানি দিয়ে ভেজানো ভাতের মধ্যে লবণ ছিটিয়ে দিয়ে হাত দিয়ে ভালোমতো মাখিয়ে খেয়ে লাঙল গরু নিয়ে বেরিয়ে পড়ে জমিতে চাষ দিতে। পান্তা খাওয়ার আরও একটা লাভ হলো, ভাতের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পানিও খাওয়া হয়ে যায়, তাই দ্রুতই পেট ভরে যায়। সেই খাবারই খেত আমাদের পান্তা বুড়ি। সেই খাবার জাহাঁপনা আপনার সম্মুখে আনি কোন সাহসে।
রাজা মহাশয় বললেন, আমি অতশত বুঝি না। এই খাবার এখন থেকে আমার সকালের নাশতা। এই খাবার দেখতে খুবই সাধারণ হলেও, এটা খুবই সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। এই যখন রাজদরবারের অবস্থা, তখন এ কান–ও কান হতে হতে নাতনির কথা ছড়িয়ে গেছে রাজ্যময়। যার ঘরে ভাত ছিল গরম কিংবা ঠান্ডা, সবাই তাতেই পানি ঢেলে দিয়ে পান্তা বানিয়ে ফেলল এবং ধনী–গরিবনির্বিশেষে ঘরে ঘরে মানুষ চাষাদের খাবার বলে খ্যাত সেই পান্তা অবলীলায় খেতে শুরু করল। অবশ্য গরিবদের আর আলাদাভাবে পান্তা তৈরি করতে হলো না। তাদের বেশির ভাগেরই ঘরে ভাত ছিল না, যেটুকু ছিল সেটুকু পান্তাই ছিল।
যা–ই হোক, পান্তা বুড়ির নাতনির অছিলায় সবাই আবার পান্তা নতুন করে চিনল। জানল দেশের একটা বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী এই খাবার খেয়েই জীবনধারণ করে। আর এই খাবার খেলে যেহেতু রাজার জাত যায় না, তাই তদেরও জাত যাওয়ার ভয় নেই, তাই নির্ভয়ে খাওয়া যায়। আর এই খাবার তৈরি করাও অনেক সহজ। রাজা মহাশয় পান্তা বুড়ির নাতনিকে উপযুক্ত পুরস্কার দিয়ে বিদায় দিলেন। আর মন্ত্রী মহাশয়কে হুকুম দিলেন তার রাজ্য ঢেরা পিটিয়ে সবাইকে সকালবেলা এই খাবার খাওয়ার নিয়ম জারি করলেন। আর পার্শ্ববর্তী সব রাজ্যে লোক পাঠিয়ে জানিয়ে দিলেন পান্তার গুণের খবর। সেটা জেনে সব রাজ্যেই সকালবেলা পান্তা দিয়ে নাশতার চল শুরু হয়ে গেল। স্বর্গ থেকে পান্তা বুড়ি তার নাতনির এহেন কর্মযজ্ঞ দেখে খুশি হলেন। নটে গাছটি মুড়াল, আমার গল্পটি ফুরাল।
এই গল্প শুনতে শুনতে রায়ানের ঘুম চলে এসেছিল। সে বলল, কাল সকালে উঠে আমিও পান্তা খাব। এটা শুনেই তার দাদি বললেন, তা–ই তো, রাতের খাবার শেষে কিছু ভাত পাতিলের তলায় পড়ে আছে। যাই সেটাতে পানি দিয়ে রেখে আসি।