অনু গল্প
ঘুণ পোকারা
রাজিয়া নাজমী
—হাতকড়া লাগাইতেছেন কেন? চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ কোনোটাই তো করি নাই।
—কেন তা গোল মাথার মগজ পর্যন্ত যাচ্ছে না? তা যাবেই বা কেমন করে। চুপচাপ হাত পেছনে রেখে আমার সঙ্গে চল। কী কাজ করিস, সেসব কি আমাদের জানতে দেরি হয়।
—কাজ তো আমি একটাই করি। ব্যবসা করি।
—ব্যবসা? অনৈতিক কাজকে বলিস ব্যবসা? হারাম পয়সায় পকেট ফোলাচ্ছ! আবার বড় গলায় বলে ব্যবসা করে! নে এখন গাড়িতে ওঠ। দেশটাকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছিস একবারে।
—হাসাইলেন বাবু! আমার কাজ অনৈতিক, আমার টাকা হারাম? বেশ কইলেন। এই হইল আপনাগো উর্দির জোর। রসাতলে কী আমি একাই নিয়া যাচ্ছি বাবু, সবাই মিলেই তো নিচ্ছি। মগজ ঘাইটা আপনার ভাগের হিসাবটা একবার দেখেন।
—এই শালা, বেশি তেল দেখাচ্ছ? ভদ্রভাবে কথা বল। নয়তো...।
—বাবু, ভদ্রভাবেই বলছি, হাতকড়া খুইলা দেন, হাতে লাগে। চিন্তা করার কারণ নেই। পালামু না। আপনার নজরেই থাকমু। তয় কইছিলাম যে, আপনার পকেটে জায়গা আছে তো? সবগুলা পকেট যে ফুইলা রইছে!
—আরে ও বাবু, পর্দার আড়ালের সোফায় কারে বসায় রাখছেন? পারফিউমের গন্ধ চেনা চেনা লাগছে। পর্দার নিচে দিয়ে জুতা দেখা যায়। বড় দামি জুতা। একজন বড় মাথা ধরা পড়ছে শুনছি। তয় এই মামলা গড়াইব না। মাঝখানে কামাইটা ভালো হইল আপনার।
—কী ভাবছেন বাবু? কাজের সময় অন্যমনস্ক হইলে চলে? সেলফোন বাজছে, ফোনটা ধইরা অঙ্কটা কইয়া দেন। বাবু আমাদের কাজ করে খাইতে হয়। আমার কি আপনার মতো রাজকপাল? আমরা এক পকেট থাইক্কা মাল দিয়ে অন্য পকেটে পয়সা ঢুকাই। বেচাকিনিতেই দিন রাইত যায়।
নেন, ফোন ধরেন, আমার দর কত কন। দেরি হইলে বস খেপব। সময় নষ্ট কইরেন না। তাতে আপনার খুব সুবিধা হইব না। সময়ই খালি আমাগোরে বিপদে ফালাইতে পারে।
আরে ও বাবু কি হইল, এত জোরে শ্বাস নিতেছেন কেন? আমার দিকে কী দেখতেছেন? আরে না, আমারও মেরুদণ্ড ঘুণে এমন খাইছে যে সোজা হইয়া খাড়াইতে পারি না। ভয় নাই, আমি আপনার ঘাড়ে হাত দেওয়ার কেউ না! হা হা হা... নেন পানি খান।
কমলপ্রিয়ার আকাশটুকু
অর্ঘ্য রায় চৌধুরী
চিঠিটা যখন এল, তখন বারান্দার ওপর ঘন হয়ে এসেছে মেঘ, দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলের গলিপথগুলোয় নিবিড় নির্জনতা।
চিঠি আসার দিনগুলো আর নেই, তবুও চিঠি লিখত একজনই। চিঠি লেখার দিন চলে গেলেও চিঠি লিখত সে। বলত, ‘চিঠির মধ্যে যে ডাক জেগে থাকে, সেই ডাক আর কোথাও পাওয়া যায় না।’
ওই মেঘের বারান্দায় এক কোণে একটা বেতের চেয়ার, একটা দুপুর, আর বহুযুগ আগের এক নির্জন বনভূমি হেঁটে এসেছিল, বেশ কিছু কবিতার লাইন।
কমলপ্রিয়া চিঠিটাকে গোপন করেননি, চিঠির কথা বলেছিলেন অনিরুদ্ধকে। অনিরুদ্ধ জানতেন এ চিঠি আসতে পারে, এক সন্ধ্যায় ওই ব্যালকনিতেই পাশাপাশি কমলপ্রিয়া বলেছিলেন, বহুদিন পর হঠাৎ তথাগতর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা, আকুল দুই চোখ, একাকী জীবন। বলেছিলেন, ডেনভারের এক ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট দরজা খুলে রেখেছে তাঁর জন্য। বলেছিলেন, তথাগতর বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে কমে আসা চিঠিগুলোর কথা, কোনো এক স্বর্ণকেশীর সুনীল চোখ। তারপর বহু বহুদিন নির্জন পথ, নির্ঘুম রাত, ফিকে হয়ে আসা রং, আর বাবা মার মৃত্যুর পর একাকী জীবনের কথা তো অনিরুদ্ধ জানতেনই। জীবনের বহু পথ পাড়ি দিয়ে ডানা ভাঙা পাখির মতো অনিরুদ্ধ যেদিন তাঁর জীবনের প্রথম কিশোরীর কাছে ফিরে এসেছিলেন, কমলপ্রিয়া সেই ফিরে আসা উপেক্ষা করতে পারেননি। দুজনের উড়ন্ত দিনগুলোতে তাঁদের এক হওয়া সম্ভব ছিল না, তাঁরা মামাতো পিসতুতো ভাই-বোন, কিন্তু প্রেম, কবে আর হিসাব করে পথ চলেছে? সংসার করেননি তাঁরা, সহাবস্থান আঁকড়ে ধরেছেন।
এখন এই পড়ন্ত বেলার চিঠি, চিঠির ভেতর সুদূরের এক ডাক, সেই স্বর্ণকেশীর অবর্তমানে এক নিঃসঙ্গ জীবন আবারও সেসব ফেলে আসা পথের দিকে উন্মুখ হয়ে আছে।
তথাগত বলেছিলেন উত্তর দিতে, চিঠির উত্তর দেওয়াটাই সহবৎ। কমলপ্রিয়া উত্তর দিয়েছিলেন। সেই উত্তরের ভেতরে এক বন্ধ দরজার আত্মকথন। ফেরারও সময় থাকে।
আরশোলা জীবন
আফরোজা মামুদ
রাতের আঁধারে পথ চলেছে সে। দ্রুত বাড়ি পৌঁছাতে হবে। পেটের ধান্দায় সেই কখন থেকে ঘুরছে। নির্দয় মানুষের মনে আজকাল কোনো দয়া মায়া নেই। চাইলে তাদের কাছে খাবার পাওয়া যায় না। সে অবশ্য কখনো চেয়েও দেখেনি। চাইতে হয় কীভাবে তা সে জানে না। তাই খাবার হয় সে আদায় করে নেয়, না হয় চুরি করে। দুটোতেই যদিও ধরা পড়া এবং জীবনহানির ঝুঁকি আছে। তবু ঝুঁকি নিতে হয়। কাজ করে খাওয়ার সুযোগ তো আর নেই।
পেটের ক্ষুধাও আজব এক ব্যাপার। একবারে খেয়ে নিবারণ করা যায় না। এসব ক্ষুধার ব্যাপার না থাকলে জীবনটা খুব সুন্দর উপভোগ করা যেত।
বউটা এখনো ঘরে ফিরল কিনা কে জানে। যা দিনকাল পড়েছে। জীবনের কোনো ভরসা নেই। কি পুরুষ, কি মহিলা আর কি শিশু! কেউই বাঁচতে পারে না নিষ্ঠুর মানুষগুলোর ঘৃণা ও ক্রোধ থেকে। দয়া মায়াহীন একটি নিষ্ঠুর প্রজাতি এই মানুষ। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, সে বিশ্বাস করে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী ওই তারাই। এদের মানুষ না বলে দানব বলা গেলে বেশ জুতসই হতো।
হাঁটার গতি সে বাড়িয়ে দিল। বউ বাচ্চাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। দূর থেকে দেখতে পেল ঘরের দরজার কাছে বউ দাঁড়িয়ে আছে। অপেক্ষা করছে তার জন্য।
বউয়ের হাজার পুঞ্জাক্ষি চোখজোড়ায় তাকে দেখে খুশির ঝিলিক বয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। পরক্ষণে তা বিচলিত হয়ে ভয়ার্ত নেত্রে রূপ নিল। সে দেখল বউয়ের চোখ তার শরীর ছাপিয়ে পেছন দিকে স্থির। বউয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকাল। ঠিক তখনই ঝলমল করে আলোকিত হয়ে গেল চারপাশ। এনার্জি সেভিং লাইটের সাদা আলোয় তার দৃষ্টি খানিকটা ঝাপসা হয়ে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো শরীরের ওপর মানুষ নামের দানবের একটি পা এসে পড়ল প্রচণ্ড আক্রোশে। ঠকাস করে ভোঁতা এক ধরনের আওয়াজ হলো পেট ফাটার। তবু পায়ে থাকা চপ্পলটা এদিক সেদিক ঘুরিয়ে তাকে চিড়ে-চ্যাপ্টা বানানোর চেষ্টা চলতে থাকল।
সেই সঙ্গে মানুষটা রান্নাঘর থেকে গ্লাস নিতে নিতে বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল—‘উফ! এই তেলাপোকার যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। কি দ্রুতগতিতেই না এদের বংশবৃদ্ধি ঘটে। আলো বন্ধ হলেই ঘরজুড়ে এদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।’
স্বার্থপর
কেয়া চ্যাটার্জী
সমুদ্রতটে লোনা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে বালিয়াড়িতে পায়ের ছাপ রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মধুরিমা। স্বামী শুভময় আমেরিকা থেকে ফেরার পর সপরিবারে ঘুরতে এসেছে শংকরপুর। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল একটি পুরুষ। বয়সে তার থেকে সামান্য বড়ই হবে। উত্তাল হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার চুল। তার চোখে বিস্ময় মাখা আনন্দ। একদৃষ্টে সে তাকিয়ে আছে মধুরিমার দিকে। মধুরিমা কি চিনতে পারছে ছেলেটিকে? সে বলে উঠল, ‘মধু আমায় চিনতে পারছ? আমি রাতুল। দার্জিলিং থেকে কলকাতা ফিরে তোমায় কত খুঁজেছি। ফোন নম্বর ছাড়া তো আর কিছুই ছিল না। সেটাও বদলে গেছে। এত বড় শহরে তোমায় হন্যে হয়ে খুঁজে গেছি। আজ কেমন পেয়ে গেলাম দেখো।’
মধুরিমার পাশে এসে দাঁড়ায় শুভময়, ‘কী ব্যাপার? ও কে মধু?’ পায়ে-পায়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মধুরিমার বাবা, মা, শ্বশুর, শাশুড়ি। সে বলে, ‘আমি ওকে চিনি না।’ ছেলেটি সবিস্ময়ে বলে ওঠে, ‘চেনো না? তুমি ভুলে গেলে, তোমার বাবাকে আমি কথা দিয়েছিলাম যত দিন না নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব তত দিন তোমার সঙ্গে দেখা করব না। তুমিও তো অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে মধু। স্যার আপনি ভুলে গেলেন?’ মধুরিমা ছেলেটির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফিরে আসে গাড়িতে। শুভময়ও তাকে শাসিয়ে গাড়িতে এসে বসে। যত্তসব ঝামেলা। ছেলেটিকে পাস কাটিয়ে এগিয়ে যায় দুটি গাড়ি। ছেলেটি ঘৃণাভরে মধুরিমার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়।
লাঞ্চের জন্য একটা হোটেলে দাঁড়ায় ওরা। মধুরিমা ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশ রুমে ঢোকে। ঝাপসা চোখে হ্যান্ডব্যাগ থেকে বের করে একটা ছবি। এক জোড়া কিশোর-কিশোরী। রাতুল আর মধুরিমা। ব্যাকগ্রাউন্ডে দার্জিলিংয়ের চা বাগান। মধুরিমার ব্যবসায়ী বাবা জানতেন কিশোর মনকে কীভাবে সামাল দিতে হয়। তাই রাতুলের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মেয়েকে নিয়ে আসেন কলকাতায়। তারপর ১৫ বছরের প্রবাহে জীবন গেছে পাল্টে। মধুরিমাও মেনে চলেছে বাবার দেওয়া শর্ত, রাতুলের হাত অথবা রাতুলের জীবন। ছবিটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে ফ্লাশ করে দিল মধু। এত বছর পর রাতুলের ঘৃণার দৃষ্টিই হোক তার জীবনের রসদ। শর্ত সাপেক্ষ জীবন দানের পরিবর্তে রাতুল আজীবন মধুরিমাকে স্বার্থপর হিসেবেই মনে রাখুক।
অনুলেখা কবি হতে চায়
অমিতা মজুমদার
অনুলেখা অনেক কিছু হতে চেয়েছিল। যখন সে অবুঝ বয়সে প্রথম সিনেমা দেখে তখন সিনেমার সেই চরিত্রটা হতে চাইত যাকে সবাই ভালোবাসে। বালিকা বয়সে যখন দেখত মা কাকিমারা কেমন নিপাট সিঁথি কেটে মাথা আঁচড়িয়ে খোঁপা করে এক মাথা ঘোমটা দিয়ে ঘর গৃহস্থালি সামলাচ্ছে, তখন তাদের মতোই হতে চাইত। যখন স্কুল জীবনে বই পড়তে শুরু করল তখন ইচ্ছেগুলো বদলে যেতে লাগল। কখনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কখনো শিক্ষক, কিংবা বইয়ে পড়া কোনো চরিত্র হয়ে উঠত মনে মনে। মাঝে মাঝে তার পাখিও হতে ইচ্ছে করত। এতসব ইচ্ছে দানাগুলো মনের মাঝে অঙ্কুরিত হতে হতেই রোদ বৃষ্টি, হাওয়া আর যত্নের অভাবে শুকিয়ে যেত।
শেষ পর্যন্ত অনুলেখা হয়ে পড়ে গৃহস্থবাড়ির গিন্নি। তারপর ইচ্ছেগুলোও কেমন যেন ব্যাঙের শীতনিদ্রায় যাওয়ার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল। কালচক্রের আবর্তনে অনু আজ প্রৌঢ়ত্বের সীমানা অতিক্রম করে ফেলেছে। সংসারে তার প্রয়োজন কিছুটা শিথিল হলে অনুলেখার মনে এক অদ্ভুত ইচ্ছা জাগে। সে কবিতা লিখবে। সেই কলেজজীবনে দু-চার লাইন লিখত, তখন তো বন্ধুরা বেশ বাহবা দিত। তাই মন স্থির করল কবিতা সে লিখবেই। কী এমন কঠিন কাজ কবিতা লেখা? ইটের পরে ইট সাজিয়ে কেমন সাতমহলা বাড়ি বানায় রাজমিস্ত্রি! তেমনই শব্দের সঙ্গে শব্দ জুড়েই তো কবিতা হয়। তার মনের জমানো কথাগুলোকে সাজিয়ে তুলবে শব্দের পর শব্দ বসিয়ে। হবে তার স্বপ্নের কাব্যগ্রন্থ। কর্তা যখন দুপুরবেলা দিবানিদ্রায় থাকে অনুলেখা তখন কবিতার খাতা খুলে বসে। বেশ একটা ভাব আসে মনে। শব্দের পর শব্দ জটলা করে হৃদয়ের গহিনে, মস্তিষ্কে। স্নায়বিক চাপ অনুভব করে, রক্তের চাপও বেড়ে যায়। কিন্তু শব্দেরা কবিতার রূপ পায় না। কবিতার খাতা সাদা ধবধবে ঊষর মরুভূমি হয়েই রয়ে যায়। একটি কবিতার ফুলও সেখানে ফোটে না। কাব্যগ্রন্থের মরূদ্যান সে তো স্বপ্নেই হারিয়ে যায়। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু না, অনুলেখা এই ইচ্ছেটা কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবে না। সে তার এই স্বপ্নটা সত্যি করবেই। আর লিখে ফেলে অনুপম কথামালায় সাজানো এক একটা কবিতা। অনুর খাতার সাদা পাতাগুলোয় কবিতারা ফুটে উঠে পারিজাত ফুলের মতো।
প্রতিবাদ
লুনা রাহনুমা
ব্যানার্জির ছেলের জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে মোটা লোকটিকে দেখে বিরক্তি চেপে রাখতে পারে না ইন্দ্রনীল। এখানেও এসেছে?
ব্যানার্জির কাছে গিয়ে দু-এক কথার পর আর চেপে থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, এই শ্রীকান্ত লোকটিকে তুমিও ইনভাইট করেছ? লোকটিকে না আমার সহ্য হয় না, জানো?
—কেন? তোমাকে কিছু বলেছে?
—না। কিছু বলেনি। কিন্তু জানো তো, এই সব ছন্নছাড়া বেনিফিট খাওয়া লোকগুলোকে আমাদের সঙ্গে মানায় না। পরিবেশের একটা ব্যাপার আছে তো। এই লোকটি দেখতে কেমন অসুস্থ। পাগলাটে। বেখাপ্পা লাগে সবার মাঝে।
ইন্দ্রনীলের হাত টেনে হলঘরের বাইরে নিয়ে আসে ব্যানার্জি। সিগারেটে চুমুক দিতে দিতে শ্রীকান্তের গল্প শোনায়, ২০০৭ সালে ইউকেতে হাইস্কিল মাইগ্রেশনে আসা শ্রীকান্ত একটা ব্রিটিশ কোম্পানিতে আইটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করছিল। পরপর দুইটি প্রমোশন পেয়ে সাদা সহকর্মীদের চক্ষুশূল হয় সে। সহকর্মীদের বুলিংয়ের শিকার হয়ে শ্রীকান্ত একদিন সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে রেসিজমের অপরাধে চাকরিচ্যুত করা হয় দুজন হোয়াইট ব্রিটিশকে। এই ঘটনার এক মাসের মাথায় শ্রীকান্তকে রাতের অন্ধকারে কয়েকজন লোক মেরে রাস্তায় ফেলে রাখে। শ্রীকান্ত জানে এদের ভেতর দুজন তার পুরোনো কলিগ। কিন্তু কোথাও সিসি ক্যামেরা বা চাক্ষুষ প্রমাণ না থাকায় কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। দীর্ঘ চার মাস হাসপাতালে থেকে শ্রীকান্ত শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হলেও, এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটে। আর ডিপ্রেশনের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে অনেক ওয়েট গেইন করে ফেলেছে। মুখের কথা পরিষ্কার বোঝা যায় না।
ব্যানার্জির ছেলের জন্মদিনের পার্টি থেকে ফিরে এসে সারা রাত ঘুমোতে পারে না ইন্দ্রনীল। ইস্ট-লন্ডনে তার ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টটি বেশ জমজমাট পসার জমিয়েছে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে পুরোপুরি সফল বলা যায়। অনেক বছর আগের একটি ঘটনা আজ তার মস্তিষ্কের ভেতর মজগটাকে ঠুকরে ঠুকরে ক্ষতবিক্ষত করছে। ২১ বছর আগে ইংল্যান্ডে এসে একটা অ্যাকাউন্টস ফার্মে চাকরি শুরু করেছিল ইন্দ্রনীল। ক্লায়েন্টের ট্যাক্স রিটার্নের অ্যামাউন্ট ভুল ক্যালকুলেট করায়, ইন্দ্রনীলের ব্রিটিশ ম্যানেজার ওর মুখে থুতু ছুড়ে মেরেছিল। বলেছিল, ইউ ব্লাডি এশিয়ান, ইউ শুড ডু অনলি ক্লিনিং জবস।
ইন্দ্রনীলের আজ মনে হচ্ছে, সেদিন লজ্জায় কাউকে কিছু না জানিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে না এসে বরং তার উচিত ছিল যথাযথ প্রতিবাদ করা।