পুরানো সেই দিনের কথা...
নর্থ আমেরিকায় কফির দোকানগুলোতে কফির সঙ্গে চা, ডোনাট ও স্ন্যাকস বিক্রি করে। গ্রীষ্ম ঋতুতে বরফ ও ক্রিম মিশ্রিত ক্যাপাচিনো থাকে গরমে কাতর তৃষ্ণার্তদের জন্য। সময় ও সুযোগ অনুযায়ী বয়স্করা চা, কফি ও ক্যাপাচিনো পানের পাশাপাশি আড্ডা দিয়ে থাকেন। দেখা করা ও কুশল বিনিময়ই আড্ডার মুখ্য উদ্দেশ্য। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত বয়স্করাও মেতে ওঠেন ক্লান্তিহীন আড্ডায়। ‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’। শীত ঋতু ও স্নোর কারণে কোণঠাসা হলে স্প্রিং ও সামারে আড্ডা জমে ওঠে। কফির দোকানগুলো ফ্র্যাঞ্চাইস। একই নামের এসব দোকান ছড়িয়ে রয়েছে শহরের সর্বত্র। যেমন টিম হরটনস, স্টার বাকস, সেকেন্ড কাপ।
নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চায়ের নেশায় ধরাশায়ী হই। নবম–দশম শ্রেণিতে বন্ধু শফিকুর রহমান রতনের (প্রয়াত) সঙ্গে নিউ মেট্রো সিনেমা হলের কাছে গাছের গুঁড়ির ওপর বসে আড্ডা দিয়েছি প্রতিদিন বিকেলে। কখনো কখনো অনেক রাত পর্যন্ত। রাস্তার মোড়ে বিশালকার লোহার পানির ট্যাংক ছিল তখন। পানির ট্যাংকের উত্তরে বন্ধু সিরাজুল ইসলাম সেন্টুর বাসা। সেন্টুর বাসার সামনেই ছিল ওদের গম ভাঙানোর মেশিন। ১৯৭২ সালের বিকেলে সেন্টুর দোকানের চৌকিতে বসেও আড্ডা দিয়েছি। আড্ডার শুরু ও শেষে সবাই চায়ের জন্য তৃষিত হয়েছি। ছুটির দিনগুলোতে রতনের বাসায় আড্ডাচলাকালীন কাজের বুয়া চা দিয়ে যেতেন বারবার। কৈশোরে খানপুরে কুমুদিনীর চর হাউজে সাঁতার করতে গিয়ে গলাসমান পানিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছি শফি ও জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। ‘স্বাধীনতা তুমি রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার’।
১৯৭৪-৭৫ সালে কলেজে যাওয়ার সময় মেঝদা প্রতিদিন এক টাকা দিতেন, এরপর দুই টাকা। চাষাঢ়া রেললাইনের পাশে দুটি চায়ের দোকান ছিল। মনুবাবুর দোকানে সেন্টু, জাহাঙ্গীর, ইকবাল, মনির, জামান আড্ডা দিত। মনুবাবুর দোকানের পশ্চিম পাশের দোকানটি ছিল ঘোষের দোকান। আমরা ঘোষের দোকানে আড্ডা দিয়েছি। দোকান দুটিতে বসার জন্য চেয়ার–টেবিল ছিল না। বসার জন্য বেঞ্চ ও চায়ের কাপ রাখার জন্য ছিল লম্বা উঁচু টুল। দোকান দুটি ছিল খুবই সাধারণ। দোকানে পরোটা ভাজি, মিষ্টি ও ভাত বিক্রি করত। কলেজ ছুটির পর সবাই আড্ডায় জমায়েত হতো। চা–শিঙাড়া না হলে আড্ডা আড্ডাই মনে হতো না। কলেজ বন্ধ থাকলেও সকালে-বিকেলে আড্ডা দিতেই হবে। নিউ মেট্রো হলের দক্ষিণে সখিনা হোটেলে ছিল। রেস্তোরাঁগুলো সাইনবোর্ডে হোটেল লেখা হতো তখন। কলেজ বন্ধ থাকলে সখিনা হোটেলটি আমাদের আড্ডার জন্য উপযুক্ত স্থান হয়ে ওঠে। শিঙাড়ায় সবজি দেওয়া হয়, সমুচায় মাংস। সে সময়ে সমুচায় মাংসের পরিবর্তে সুজি দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়। মাংসের সমুচা বাই বাই। টমেটো-পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সালাদের পরিবর্তে শুধু কাঁচা পেঁপের কুচি সালাদ হয়ে উঠল। বেকার জীবনে আড্ডায় অনেকেই খালি পকেটে আসত। তারপরও যার কাছে যা-ই থাকত, সবটুকু মিলিয়ে আড্ডায় চা-শিঙাড়া সুবাস ছড়াত।
সখিনা হোটেলের উত্তর দিকে একটি দরজির দোকান ছিল। দোকানের মালিক বড় ভাই চায়ের পাতা প্যাকেট করে বিভিন্ন দোকানে ফেরি করে বিক্রি করতেন। ছোট ভাই মোহাম্মদ হোসেন কাপড় সেলাই করতেন। আশির দশকে দরজির দোকানটি হয়ে উঠল আমাদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। যৌবনের শুরুতে দরজির দোকানে আড্ডায় মাতাল হয়ে মেতে উঠি। এখন যৌবন যার, আড্ডায় যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার। আকণ্ঠ ঋণ আমাদের সেই দরজির কাছে। সুধীজন পাঠাগারের বইয়ের নেশায় কেটেছে কয়েকটা বছর। পাঠাগারের বিপরীত দিকে ছিল আলম কেবিন। রিকশায় বাজার থেকে ফেরার সময় দেখেছি—রুমির আব্বা (প্রয়াত ভাষাসৈনিক সফি হোসেন খান) আলম কেবিনের কাছে রোদেলা সকালে চেয়ারে বসে আছেন। সন্ধ্যার পর আমরা সবাই ঢুঁ দিই আলম কেবিনে। বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই কর্মময় জীবন শুরু করেছে। আড্ডা জমে ওঠে আলম কেবিনের সুস্বাদু খাস্তা পরোটা, বুটের ডাল ও চায়ের কারণে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
সন্ধ্যার পর বঙ্গবন্ধু সড়কের ইএফইউ বিল্ডিংয়ের পাশে চাচার দোকানে আড্ডা হতো জমজমাট। চাচার দোকানের বৈশিষ্ট্য ছিল লাঠি বিস্কুট ও চা। নজরুল তখন রেডিওতে আবৃত্তির জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিল। আড্ডায় এসে বলত, ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর’। শান্তনু মার্কেটের পশ্চিমে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছি। সন্ধ্যায় জুয়েল, স্বপন, হাসনাত, বাবু ঢাকা থেকে ফিরলে মুখরোচক চিতই পিঠা ও নানা রকমের ভর্তার পর থাকত চা। সন্ধ্যার পর চিতই পিঠাকেন্দ্রিক আড্ডার কথা মনে হলে বেদনার চর জেগে ওঠে হৃদয়ে। জোয়ার–ভাটার কারণে ও নদীর পাড় ভাঙলে নদীর ঘাটের স্থানবদল হতে থাকে। তেমনি বিভিন্ন কারণে আমাদের আড্ডার স্থানের পরিবর্তন ঘটতে থাকল। সবার জীবন-জীবিকার ব্যস্ততায় একসময় আস্তে আস্তে আড্ডার প্রদীপ নিবু নিবু হয়ে এল। সবার বিয়ের সানাই বাজতে থাকলে আড্ডার চাপ কমতে থাকল। শফির বিয়ের পরপরই খানপুরে শফির খালুর বাসায় সন্ধ্যার পর তুমুল আড্ডা হয়েছিল কিছুদিন। স্বপন ও জুয়েল কাজ শেষে ঢাকা থেকে সরাসরি আড্ডায় চলে আসত। বিকেলে খানপুর জেটিতে অনেক দিন আড্ডা দিয়েছি রুমির সঙ্গে। রুমি মাঝেমধ্যে মাউথ অর্গ্যান বাজাত। নদীতে পানির বয়ে চলার শব্দ ও আকাশে গোধূলির রং—সব মিলিয়ে সেসব ছিল এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা। পড়ন্ত বিকেল থেকে রাত অবধি খোলা আকাশে বার একাডেমি স্কুলের কাছে খানপুর মাঠের আড্ডা আজও স্মৃতিতে ভাস্বর। এই আড্ডার মধ্যমণি ছিল সেলিম। ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়’।
এরশাদের শাসনামলে বিশ্বরোড তৈরি শুরু হয়। ভোরে রহিমের বাসার কাছে ছাতিম ফুলের গন্ধ নিয়ে নতুন রাস্তায় জগিং শুরু করি। রাইফেল ক্লাবের কাছে দাঁড়িয়ে গলা খুলে দর্পণকে ডাকি। সকালে জগিং শেষে চাষাঢ়ায় চাচার দোকানে লিটন, রামুদা, এজাজ, দর্পণসহ আড্ডা দিই। চাচার দোকানে রং চা ও বিস্কুট ছিল প্রতিদিনের আড্ডায়। সকাল-সন্ধ্যা চা ও আড্ডার জন্য নারায়ণগঞ্জে বোস কেবিনের জয়জয়কার। সবার প্রাণ প্রিয় রেস্টুরেন্টের নাম বোস কেবিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে একদিন পড়ন্ত বিকেলে সাঈদুর রহমান স্যার বাসায় এসে বললেন, ‘রিকশায় ওঠো, চলো বোস কেবিনে গিয়ে চা খাব।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডায় ছিল সহপাঠী, বন্ধু কাঞ্চন ও রিনা।
নারায়ণগঞ্জ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রেস রিলিজ দেওয়ার জন্য সন্ধ্যায় সুনীলদা মোটরবাইক নিয়ে বাসায় এসে বলতেন, ‘চল বোস কেবিনে যাই।’ বোস কেবিনেই দর্পণ, রুমন, আসিফের সঙ্গে পরিচয়ের পর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। কবি রেজা ফারুক বোস কেবিনে এসে মানিব্যাগ খুলে বলত, ‘কামাল, নাও তোমার জন্য কবিতা নিয়ে এসেছি, পড়ো।’ দর্পণ নিয়ে আসত ছড়া। কখনো কখনো দর্পণ কবীর চায়ের টেবিলে ছড়া লেখা শুরু করত। পকেটে কাগজ না থাকলে বলত, ‘সুবল একটা কাগজ নিয়ে আয়।’ সকালের আড্ডাপর্ব শেষে দুপুরে বোস কেবিন থেকে সবাই গিয়েছি ফ্রেঞ্চ মার্কেটে নাফিজ আশরাফ ভাইয়ের দোকানে আড্ডার জন্য। এই আড্ডায় সবাই ছিলেন প্রগতি সাহিত্য পরিষদের সদস্য। জীবনের টানে ‘মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায়।’ ‘নিখিলেশ প্যারিসে মঈদুল ঢাকাতে’ তেমনি কেউ কেউ আজ আটলান্টিকের ওপারে। কয়েকজন চলে গেছেন না–ফেরার দেশে। ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’। আড্ডাটি না থাকলেও হৃদয়ে স্মৃতি আজও জাগরূক। ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’!