বিয়ের সময় অবনী শুনেছিল ওর বর একটি বেসরকারি কলেজের গণিতের শিক্ষক। কলেজটি এখনো অনুমোদন পায়নি। তবে পেয়ে যাবে দ্রুত। এলাকার ডাকসাইটে সংসদ সদস্যের মায়ের নামে কলেজ। মঞ্জুরি না দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপায় আছে? বিয়ের মাসখানেক পর অবনী বুঝতে পারল, স্বামীর অল্প বেতনের টাকায় দুজনের সংসার চালানো মুশকিল। বেতন বলতে কলেজ ফান্ড থেকে মাসে পাঁচ হাজার। আর ছাত্রছাত্রীকে প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু বাড়তি টাকা। সব মিলিয়ে সাত-আট হাজার। এই সামান্য টাকা দিয়ে দুজনের সংসার চালানো অসম্ভব। প্রথম কিছুদিন প্রতিনিয়ত ওর স্বামীকে জিজ্ঞাসা করতেন। কলেজের কোনো সুখবর আছে কি না। প্রতিবার একই উত্তর। কলেজের মঞ্জুরিটা যেকোনো দিন হয়ে যাবে। প্রিন্সিপাল স্যারকে শিক্ষামন্ত্রী নিজ মুখে কথা দিয়েছে। এবার একটা বিহিত না হয়ে যায় না। মাত্র কয়েকটা দিনের ব্যাপার। কলেজের পুরো বেতন পাওয়া শুরু হলে আমাদের আর কোনো সমস্যা থাকবে না। শুধু শান্তি আর শান্তি। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে চোখের পলকে। অবনী কিছু বলে না। কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে একসময় রান্নাঘরে চলে যায়। ওদিকে কয়েকটা দিন পার হয়ে মাসের পর মাস চলে যায়। কিন্তু কলেজের মঞ্জুরিটা আর হয় না। একদিন খবরের কাগজে এই চাকরিটা চোখে পড়ে। ভয়ে ভয়ে ওর স্বামীকে জিজ্ঞাসা করে,
—শোনো, এই চাকরির জন্য একবার আবেদন করে দেখি?
অবনীর স্বামী ভালো করে বিজ্ঞাপনটা পড়ল। একবার না। বেশ কয়েকবার পড়ল। তারপর বলল,
—এনজিওতে চাকরির কোনো ভরসা নেই। আজ ভালো কাল ফান্ড নেই। আরও কত কী সমস্যা। তবে সারা দিন একা একা এক রুমের ভেতর বন্দী থাকার চেয়ে বাইরের আলো–বাতাসে যাওয়া ভালো। কিছুদিন কাজ করে দেখো। তারপর ভালো লাগলে চাকরি করবা। না হয় করবা না। জোরজবরদস্তি নেই। এটা সত্য সংসারে একটু অভাব যাচ্ছে। এ নিয়ে এত ভেবে কী হবে। আমার বেতনের সমস্যাটা সমাধান হলে চাকরি টিল দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিবা। তুমি করবা সংসার। আমাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে হবে। আমার মতো কালো না। তোমার মতো সুন্দরী হবে। তখন আমাদের তিনজনের জন্য বড় একটা বাসা নেব। সঙ্গে উত্তরমুখী বিশাল ব্যালকনি। অবনীর খুব জানতে ইচ্ছে করে, উত্তরমুখী ব্যালকনিটা কেন পশ্চিমমুখী হবে না। কিন্তু জিজ্ঞাসা করা হয় না। অবনী চেয়ে দেখে ওর স্বামী চোখেমুখে বেতন টাকাপয়সা, নতুন বাড়ি এসব খেলা করছে।

প্রথম চেষ্টাতেই চাকরিটা হয়েছিল। কবে যে দেখতে দেখতে বছর তিনেক পার গেল। টেরই পাওয়া যায়নি। বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কিছুই পরিবর্তন হয়নি। মাঝেমধ্যে স্বামীর সঙ্গে বড় বাসা খুঁজতে যায়। অনেক বাসা পছন্দ হয়। কিন্তু কলেজের মঞ্জুরিটা হয় না। তাই নতুন বাসাতেও ওঠা হয় না। এর ভেতর নতুন বিপদ হিসেবে আজ চাকরিটাই চলে গেল। বিদেশি টাকায় চলা ছোটখাটো এনজিও। যেকোনো দিন বন্ধ হয়ে যাবে, তা অনুমিতই ছিল। আজকে শুধু বাস্তব হয়ে গেল।
অবনী চেয়ে দেখল বাইরে বৃষ্টির তেজ আরও বেড়েছে। এ এলাকায় অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। এমনকি মুষলধারে বৃষ্টিতে কোমরপানি হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। রাস্তায় পানি জমলে আটকে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তখন সমূহ বিপদ। দেখল পাশের কুকুরটি উঠে দাঁড়িয়েছে। সম্ভবত বিপদ আঁচ করতে পারছে। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে বাইরে একটা দৌড় দেবে। আসলেই তাই হলো। একটা গা ঝাড়া দিয়ে বৃষ্টির মাঝেই কোথাও চলে গেল। এদিকে রিকশা এমনিতেই কম পাওয়া যায়। ঝড়–বাদলের দিনে তা রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার। ছাতা খুলে আরেকবার আকাশপানে তাকাল। তারপর বের হতে যাবে, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে শফিক ছুটে আসল। শফিক অবনীর স্বামী।
—তোমাকে দূর থেকে দেখে দৌড়ে ছুটে এলাম।
—তোমার না ছাত্রদের টিউশন করানোর কথা?
—বৃষ্টির কারণে আজ পড়বে না। বুঝো না। আজকালের পুলাপান। বদের হাড্ডি। শুধু সুযোগ খোঁজে খুঁজে। কীভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়।
অবনী কিছু বলে না। মুচকি হাসে। শফিক বলতেই থাকে,
—আমার কী! তোদের বাপের টাকা নষ্ট তোরা নষ্ট করবি।
অবনী হেসে হেসে জিজ্ঞাসা করল,
—তুমি এত কথা বলছ কেন?
—আমি এত কথা কই বললাম। আর তুমি আমার কথায় হাসছ কেন?
—সত্যি কথা বলব?
—হু। অবশ্যই।
—তুমি এমনভাবে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কথা বলছ। মনে হচ্ছে উল্টো তুমি ওদের বিদায় করে দিয়েছ।
শফিক রেগে গেল। মেয়ে মানুষ সব সময় এক লাইন বেশি বুঝে। অবনী আর ঘাঁটাতে গেল না। শুধু ছোট্ট করে বলল,
—তুমি আজ ছাতা নিয়ে বের হওনি?
—উঃ না। ভুলে গিয়েছি।
—ওহ। তাহলে চল একটা রিকশা নেই।
শফিক রিকশা নিতে রাজি হলো না। অবস্থা বেগতিক দেখে অবনী আবার বলল,
—এই বৃষ্টির মাঝে হাঁটা ঠিক হবে না। বিশ টাকার রিকশা ভাড়া বাঁচাতে গিয়ে হাজার টাকার জুতো নষ্ট।
রিকশা পাওয়া গেল না। শফিকের এ নিয়ে কোনো বিকার নেই। বরং খুশিই মনে হচ্ছে। ভারী বৃষ্টিতে পাশাপাশি হাঁটছে। যতটা সম্ভব কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করল। তবু লাভ হচ্ছে না। অবনীর ছাতাটি ছোট। শফিক অবনীর কাঁধে হাত দিয়ে কাছে টেনে রাখল। অবনীর লজ্জা লাগছে। কিন্তু মুখে প্রকাশ করল না।
—আমাদের কলেজের মিরাজ স্যার কি বলেছে জানো?
—কী?
—বেড়িবাঁধের পাশে ওনার এক আত্মীয় নতুন চারতলা বাড়ি বানিয়েছে। আগামী মাস থেকেই ভাড়া দিয়ে দেবে।
—ও।
শফিক আবার বলল,
—ওই লোক থাকে আমেরিকায়। মাই ডিয়ার টাইপ লোক। তা ছাড়া মিরাজ স্যার বলল আমরা যদি ভাড়া নিই তাহলে নিজদের বাড়ির মতোই থাকতে পারব।
—ওহ।
—সমস্যা হলো ওদের ব্যালকনিটা নাকি পূর্বমুখী। অবশ্য পূর্বমুখী হওয়ায় আরও ভালো হয়েছে। চোখের সামনে সাক্ষাৎ ব্রহ্মপুত্র নদী। সন্ধ্যাবেলায় ব্যালকনিতে বসলে নদীর ফ্রেশ বাতাস পাওয়া যাবে।
—ওহ।
—তুমি এমন ওহ আহ জবাব দিচ্ছ কেন?
—না, এমনিতেই।
—চলো বাসাটা দেখে আসি।
—এই ভিজা শরীরে? আজ বাদ দাও। অন্য দিন না হয় যাব।
শফিক নাছোড়বান্দা টাইপের মানুষ। একবার মাথায় কিছু ঢুকলে তার শেষ না দেখে থামে না। আধা ভিজা শরীর নিয়েই নতুন বাসা দেখতে আসতে হলো। শফিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাসা দেখছে। অবনীর ভালো লাগছে না। এক কোনায় দাঁড়িয়ে রইল। বেশিক্ষণ থাকতে পারল না। একটু পর শফিক এসে নিয়ে গেল পূর্বমুখী ব্যালকনি দেখাতে।

default-image

অবনীর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। এককথায় অসম্ভব সুন্দর। ব্যালকনি থেকে মনে হচ্ছে হাত ছোঁয়া দূরেই নদীটা। অবনী মুখে কিছু বলল না। একটা লম্বা একটা নিশ্বাস নিল। শফিক বলল,
—বুঝলা। নতুন বাসার এদিক–সেদিক খুব ভালো করে দেখে নিতে হয়। নতুন ঝকঝকা ভাব দেখে প্রথমেই চোখে ধান্দা লেগে যায়। ভুলত্রুটি চোখে পড়ে না। কিছুদিন পর দেখা যায় সমস্যার শেষ নাই। দরজার ছিদ্র দিয়ে পানি আসে। ওয়াল ভিজে ফার্নিচার নষ্ট হয়। তা ছাড়া আরও কত কি নিত্যনতুন ঝামেলার উদয় হয় বলা মুশকিল। অবনী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে। একবার ইচ্ছে হয় জিজ্ঞাসা করতে,
—আপনি এত কিছু কীভাবে জানেন?
কিন্তু জিজ্ঞাসা করা হয় না। মানুষটি এত শখ করে নতুন বাসা দেখছে। যদি জানত আজ অবনীর চাকরি চলে গিয়েছে তবে নিশ্চয়ই বাড়ি দেখতে আসত না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ংকর খবরটি এখন দেবে না। ঠান্ডা মাথায় একসময় বলা যাবে। অবশ্য শফিকের প্রতিক্রিয়া কী হবে আগাম বলে দেওয়া যায়। মন খারাপ হবে। মুখে কিছুই বলবে না। বরং একটু হাসার চেষ্টা করবে। হাসিটা মেকি হবে। মেকি হাসি বোঝার সামর্থ্য শফিকের নেই। তবু শফিক অভিনয়ের সব রকম চেষ্টা করে যাবে। বোকাসোকা মেয়েরা স্বামীর এসব অভিনয় বুঝতে পারে না। সমস্যা হলো অবনী খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। আর বুদ্ধিমতীরা স্বামীর কষ্টের অভিনয় সহ্য করতে পারে না।
রাতের বেলা বিছানায় অবনী আকাশকুসুম অনেক ভাবল। কাল থেকে কী করবে। সংসার কীভাবে চলবে বুঝতে পারছে না। একবার শফিকের একটু কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করল। লাভ হলো না। মনে হয় ঘুমাচ্ছে। শফিকের ঘুম খুব অদ্ভুত। বিছানায় এলেই রাজ্যের ঘুম চলে আসে চোখে। বিয়ের পর প্রথম যেবার দেখা হয়, সেদিনই এটা টের পেয়েছিল। সারা দিন তুমুল বৃষ্টি। তার ওপর বিকেল থেকে বিদ্যুৎ নেই। এর ভেতর বিয়ে। সব কাজ শেষ হতে হতে প্রায় মাঝরাত। মধ্যরাতেই বাসরঘর সাজানো হলো। বাসরঘরে ঢুকে দেখল শফিক ঘুমাচ্ছে। হারিকেনের নিবু নিবু আলোতে মানুষটার মুখ ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। অবনীর কেমন যেন মায়া লাগল। বেচারা হয়তো কয়েক দিন ঠিকমতো ঘুমানোর সুযোগ পায়নি। তার ওপর কাদা রাস্তায় অনেক কষ্ট করে এসেছে।
শফিকের ঘুম ভাঙল ভোররাতে। টিনের চালে তখনো অঝোরে বৃষ্টির শব্দ।
সজাগ হয়ে শফিক থতমত খেয়ে গেল।
—আমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?
অবনী কী বলবে বুঝতে পারল না। ছোট করে বলল,
—হুম।
—ওহ। একে তো বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। তার ওপর গত দুদিন শরীরের ওপর দিয়ে খুব ধকল গেছে। কাদা রাস্তায় গাড়ি আসেনি। অবশ্য গাড়ি বলতে একটা সিএনজি ভাড়া করেছিলাম। বাধ্য হয়ে, কিছু রাস্তা লোকাল অটো আর বাকি রাস্তা হেঁটেই এসেছি।
—ওহ। এই ছোট শব্দটি ছাড়া অবনী আর কিছু বলল না। শফিক নিজের মনেই বলতে লাগল,
—গতকাল রাতের বাসে ময়মনসিংহ থেকে বাড়ি এসেছি। আমি আবার বাসে ঘুমাতে পারি না।
অবনীর একবার মনে হলো জিজ্ঞাসা করবে। বাসে ঘুম আসে না কেন। পরক্ষণেই বাদ দিল। হাস্যকর প্রশ্ন হয়ে যায়। হয়তো পকেটমারের ভয়। অথবা বসে ঘুমানোর অভ্যাস নেই। অবনীর জিজ্ঞাসা করতে হলো না। শফিক নিজ থেকেই আবার বলতে শুরু করল,
—বাসের চোখ বন্ধ করলে আমার কি মনে হয় জানো?
অবনীর গা শিরশির করে উঠল। কী সুন্দর করে তুমি করে কথা বলছে। মনে হচ্ছে কত দিনের পরিচয়। কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল,
—কী মনে হয়?
—মনে হয় বাস দুলছে। কখনো মনে হয় বাস রাস্তা ছেড়ে পানির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। আর ঝাঁকি খেলে মনে হয় পানিতে দুলছে। একবার তো এক অদ্ভুত স্বপ্নও দেখলাম। দেখি আমাদের বাস পানি দিয়ে যাচ্ছে। একসময় বাসের নিচের ছিদ্র দিয়ে ভেতরে পানি আসতে লাগল। ধীরে ধীরে পানি গলা পযন্ত উঠে যাচ্ছে। হঠাৎ বুঝলাম আমার পা আটকে আছে। নড়তে পারছি না। ভয়ে চিৎকার করছি। কিন্তু বাস থেকে বের হতে পারছি না। মজার ব্যাপার কি জানো?

অবনী অসম্ভব বুদ্ধিমতী মেয়ে। শফিক না বললেও আসল ঘটনা অনুমান করতে পারছে। এ রকম দুর্ঘটনা আসলেই ঘটেছিল। এ ঘটনার পর থেকে শফিক বাসে ঘুমাতে পারে না। বাসররাতে এই বাজে স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। কথার মোড় ঘোরানোর জন্য অবনী কয়েকবার লম্বা করে হাই তুলল।
শফিক লজ্জা পেয়ে বলল,
—ওহ, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। তোমার মনে হয় ঘুম পেয়েছে।
—হুম।
—আচ্ছা, ঘুমাও তাহলে।
কিছুক্ষণ পরেই অবনী খেয়াল করল, শফিক আবার ঘুমিয়ে গিয়েছে। বিছানা থেকে নেমে ঘড়ি দেখল। ভোর চারটা। পাশের হারিকেন বাতিটি নিবু নিবু করে জ্বলছে। যেকোনো সময় নিভেই যাবে। ওদিকে ঝড়বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করেছে। খুব ইচ্ছে করছে শফিককে সজাগ করে দিতে। কিন্তু পারল না। মানুষটা সহজ সরল। এ রকম মানুষদের চলার পথে বক্রতা থাকে না। আবার জমিয়ে বলার মতো তেমন গল্পও তৈরি হয় না এদের জীবনে। আজ এত চমৎকার একটা সময় চলে যাচ্ছে। অথচ এ নিয়ে কোনো স্মৃতি থাকবে না। শফিকের জন্য অবনীর খারাপ লাগছে। তাকিয়ে দেখল মানুষটা কী সুন্দর করেই না ঘুমাচ্ছে। অবনী বাকি রাতটুকু আর ঘুমোতে পারল না। সজাগ হয়েই কাটিয়ে দিল।
অনেক দিন পর আজ আবার শফিকের জন্য মন খারাপ লাগছে। অবনীর খুব ইচ্ছে হলো শফিকের ঘুম ভাঙিয়ে দিতে। ওদের বিয়ের পেছনে গোপন একটি গল্পটি আছে। কয়েকজন মানুষ ছাড়া আর কেউ জানে না। এমনকি শফিকও না। আজ খুব ইচ্ছে করছে বলতে। বিয়েটা প্রায় ভেঙেই যাচ্ছিল। শফিকরা অবনীকে দেখে পছন্দ করেছিল। কিন্তু ঝামেলা বেধেছিল অন্য জায়গায়। শফিকের আপন মা নেই। বাড়িতে সৎমা। নিজের মা অনেক আগেই মারা গিয়েছে। অবনীর বাবা গোঁ ধরেছিল। এ রকম বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দেবে না। শফিকের বাবা যতই বলে,
—দেখুন, মা তো মা। এখানে সৎ আর আসল কী?
অবনীর বাবা নাছোড়বান্দা। এমন ঘরে মেয়ে পাঠানো যাবে না। বিয়ের কথা যখন ভেঙে যায় যায় অবস্থা অবনী আড়চোখে শফিকের দিকে তাকাল। শফিকের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। এমনকি চোখ টলমল করছে। অবনী উঠে ওর রুমে চলে গেল। ছোট মামাকে জানাল শফিককে তার খুব পছন্দ হয়েছে। এই ছেলের সঙ্গে বিয়ে না হলে বিষ খাবে। এটা কথার কথা না। আজ রাতেই ইঁদুরের বিষ খাবে। এমন কথায় অবনীর বাবা হার মানল। শুধু তা–ই না। বিয়ে সেদিনই রাতেই হলো। অবনী ভেবেছিল বাসররাতে এই গল্পটি শফিক কে এসে বলবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বলা হয়নি।
অবনী সিদ্ধান্ত নিল বিয়ের গল্পটা আজ শফিককে বলবে। অবশ্যই বলবে। এমন সময় বজ্রপাতের আওয়াজ হলো।
—কী ভয় পেয়েছ?
শফিকের কথায় আবনী চমকে উঠল। জিজ্ঞাসা করল,
—কী তুমি ঘুমাওনি?
—নাহ।
—তাহলে?
—চোখ বন্ধ করে একটা জিনিস ভাবছিলাম।
—কী?
—নদীর ধারের বাসাটির কথা। খুব সুন্দর তাই না? আমার তো খুব পছন্দ হয়েছে। অনেক দিন ধরে ঠিক এমন একটি বাসাই খুঁজছিলাম।
অবনী শফিকের চুলে হাত ভুলিয়ে দিল। তারপর জড়িয়ে ধরে বলল,
—তোমাকে একটা জরুরি কথা বলা দরকার।
—হুম। আমিও একটা জরুরি কথা বলব।
অবনী চমকে ওঠে জিজ্ঞাস করল,
—তোমার কি চাকরি চলে গিয়েছে নাকি?
—নাহ। এর চেয়েও বেশি কিছু। তোমাকে বরং একটা জিনিস দেখাই। আমার ব্যাগটা কোথায় রেখেছি বলতে পারো?
—দাঁড়াও আমি খুঁজে দেখছি।

মোবাইলের আলোতে অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর শফিকের ব্যাগ খুঁজে পাওয়া গেল। চেয়ারের নিচে পড়ে ছিল। কৌতূহলবশত অবনী ব্যাগটি খুলল। দেখল, ব্যাগের ভেতর শফিকের ছাতাটি ভাঁজ করে রাখা। বুঝতে পারল শফিক বাহানা করেই এক ছাতার নিচে বৃষ্টিতে ভিজেছে। আরো মন খারাপ হয়ে গেল মানুষটির জন্য। ছাতা যথাস্থানে রেখে ব্যাগটি নিয়ে শফিকের কাছে এল।
—অবনী চা খাবে?
—নাহ। তুমি খাবে?
—হুঁ
—তাহলে বানিয়ে দিই।
—তোমার জন্য কাপ বানিয়ো।
অবনী নিঃশব্দে রান্না ঘরে চলে গেল। ওর খুব কান্না পাচ্ছে।
শফিক চা খেতে খেতে বলল, অবনী?
—হুঁ, বলো।
—কী মন খারাপ?
—হুঁ
—কারণটা জানতে পারি?
—এখন আর বলতে ইচ্ছে করছে না।
—ও। তাহলে আমি কী বলতে চাই শুনবে?
—হুঁ
—আমাদের কলেজ মঞ্জুরি কমিশন থেকে অনুমোদন পেয়ে গিয়েছে। আজকে দুপুরেই চিঠি পেয়েছি।
অবনী কিছু বলল না। শক্ত করে শফিককে জড়িয়ে ধরল। বাইরে তখনো ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে তীব্র বিজলির চমক। শফিক আবার বলল,
—আমাদের বিয়ের রাতেও এমন বৃষ্টি ছিল তাই না?
অবনী কোনো উত্তর দিল না। শফিক দেখল, অবনী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এই খুশির খবরে এভাবে কেন কাঁদছে তার কিছুই বুঝতে পারল না।

* লেখক: বদরুজ্জামান খোকন (পিএইচডি গবেষক, মলিকুলার মেডিসিন), ন্যাশনাল হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, তাইওয়ান

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন