ইবনে বতুতার শহরে যা যা দেখলাম
দুপুরবেলা। আমি প্রখর রোদে পুরোনো তানজিয়ারে হাঁটছি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফিনিশীয়, রোমান, আরব ও ইউরোপীয় শিল্পী, কূটনীতিক ও পর্যটকদের পদচারণে তানজিয়ার গড়ে উঠেছে। মরক্কোর প্রতিটা শহরে দুর্গ দিয়ে ঘেরা পুরোনো অংশকে মেদিনা অথবা কসবা বলা হয়। আমরা এসেছি তানজিয়ারের মেদিনায় কয়টা দিন ছুটি কাটাতে।
ইউরোপীয় ও মরক্কোর সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো তানজিয়ার। ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত এই শহর সাদা শহর (হোয়াইট সিটি) হিসেবে পরিচিত। শহরজুড়ে ঝকঝকে সাদা রঙের সব ভবন, কোনোটিই খুব উঁচু নয়, সঙ্গে গোলকধাঁধার মতো আঁকাবাঁকা গলিযুক্ত মেদিনা এবং জিব্রাল্টার প্রণালির নীল পানি, শহরটি আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
হাঁটতে হাঁটতে আমি মেদিনায় অবস্থিত ইবনে বতুতা জাদুঘরটি খুঁজে পেলাম। তানজিয়ারের বিমানবন্দরটির নাম তাঁর নামেই করা হয়েছে। ইবনে বতুতার জীবন ও ভ্রমণকাহিনি আমাকে পর্যটক হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে। তাই এই জাদুকর দেখার সুযোগ আমার জন্য বিশেষ কিছু।
তানজিয়ার বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার জন্মস্থান। পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা। ইসলামি আইনবিশেষজ্ঞ ও বিচারক (কাজি) হিসেবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর, ১৩২৫ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি নিজ শহর তানজিয়ার থেকে বেরিয়ে পড়েন। শুরুতে মক্কায় হজ পালন ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। সেই আগ্রহ থেকেই পরে ভ্রমণের প্রতি তার এক অদম্য নেশা জেগে ওঠে।
ইবনে বতুতা মক্কা, চীন, ইরাক, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৩০ বছরে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেন। মধ্যযুগীয় কোনো পর্যটকের জন্য এ ছিল অচিন্তনীয় ও দুঃসাহসিক । ভ্রমণের একটা বড় অংশ তিনি হেঁটে সম্পন্ন করেছিলেন। বলা হয়, ইবনে বতুতা মার্কো পোলোর আগেই চীনে পৌঁছেছিলেন।
তানজিয়ার মেদিনার ‘বাব আল-বাহর’-এর কাছে জাদুঘরটি তাঁর জীবন ও দেশভ্রমণ কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হয়েছে। জাদুঘরজুড়ে সুমাত্রা, কাবুল, ভারত, চীন, মালদ্বীপ, কনস্টান্টিনোপল, কায়রো এবং টিম্বাকটু—দীর্ঘ ৩০ বছরের বিশ্বভ্রমণের অনন্য সব নিদর্শন রয়েছে। আছে চমৎকার ‘ধো’ ও ‘জাঙ্ক’ জাহাজের মডেল এবং অসাধারণ সব মানচিত্র! তাঁর ব্যবহৃত ব্যাগ ও ডায়েরির প্রতিলিপিসহ নানা নিদর্শনও রয়েছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp<bha>@</bha>prothomalo.com
ইবনে বতুতা ১৩৩৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে আসেন। তিনি দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের জাঁকজমকপূর্ণ রাজদরবারে প্রায় আট বছর অতিবাহিত করেন। চতুর্দশ শতাব্দীর ভারত সম্পর্কে তাঁর লিপিবদ্ধ বিবরণী আজ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি উপমহাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য , আচার–ব্যবহার, কৃষ্টি, খাবারের স্বাদসহ নানা বিষয় নথিবদ্ধ করেছিলেন। নারকেল, পান-সুপারি তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সুলতানের রোষানল থেকে বাঁচতে তিনি একসময় দিল্লি থেকে মালদ্বীপে পালিয়ে যান। এরপর শ্রীলঙ্কা, করমণ্ডল উপকূল ও বাংলা হয়ে চীনের পথে যাত্রা করেন।
ইবনে বতুতার ভ্রমণ এবং সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষণ ‘রিহলা’ (ভ্রমণ) শিরোনামে একটি বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনিতে সংকলিত করা হয়েছে। প্রায় ৭০০ বছর ধরে রিফ্লা একজন মুসলমান পর্যটকের প্রাচ্য আফ্রিকা ও আরব দেশগুলো সম্বন্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণকাহিনি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তানজিয়ার শহরটি যেমন আধুনিক ও নান্দনিক, তেমনি ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ; এর পরিবেশ যেমন প্রশান্ত, তেমনি প্রাণবন্ত। শহরটি এত নিরাপদ যে গভীর রাতে রাস্তার দুই পাশে খোলা মাঠে সবাই পরিবার– পরিজন নিয়ে সময় কাটান। জীবন এখানে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। তানজিয়ারের বৈচিত্র্য যেমন অসাধারণ, স্থানীয় খাবারও তেমনি চমৎকার। প্রাণচঞ্চল মেদিনা, বোহেমিয়ান অতীত ও সমৃদ্ধ ইতিহাস—সব মিলিয়ে ইবনে বতুতার শহর তানজিয়ারে বারবার আসা যায়।
আমি এখন জাদুঘরের ছাদে বসে আছি। ছাদ থেকে ভূমধ্যসাগরের নীল পানি দিগন্ত ছাড়িয়ে গেছে। ৭০০ বছর আগে নিশ্চয়ই ইবনে বতুতা এই সাগরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আজ তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে আমি সেই একই সাগরকে দেখছি। এই সাগর কি জানে ৭০০ বছরের ব্যবধানে দুজন পরিব্রাজক তাকে একই ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে অপলক নয়নে দেখছে?