৭৮তম ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬–এর জমকালো উদ্বোধন
বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬ (Frankfurter Buchmesse- 2026)-এর ৭৮তম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় জার্মান সময় ১৭:৩০ মিনিটে ফ্রাঙ্কফুর্টের মেসের কংগ্রেস সেন্টারে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম এই বইমেলার পর্দা উন্মোচিত হয়।
মেলা আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বসাধারণ ও ব্যবসায়িক পরিদর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এবারের মেলায় প্রধান আকর্ষণ গেস্ট অব অনার হিসেবে অংশ নিয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র । আ কান্ট্রি : অন দ্য কোস্ট বা ‘উপকূলের একটি দেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরছে দেশটি।
এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল বেশ প্রাণবন্ত এবং কিছুটা নাটকীয়তায় ভরপুর। মেলার বিদায়ী পরিচালক জার্গেন বোস প্রথাগতভাবে হাতুড়ির প্রতীকী আঘাতে ২০২৬ সালের এই বইমেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। উদ্বোধনী মঞ্চে সমাজ ও রাজনীতিতে সাহিত্যের প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন বক্তারা। বিশেষ করে, চেক প্রজাতন্ত্রের সংস্কৃতিমন্ত্রী ওতো ক্লেম্পির বক্তব্য দেওয়ার সময় দর্শকদের একাংশ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও শিসধ্বনি দেন। দেশের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ ও গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তার বক্তব্য দেওয়ার সময় ‘শেম’ বা ‘লজ্জা’ স্লোগান তোলা হয়। তবে এর বিপরীতে, মঞ্চে আসা বিশিষ্ট চেক লেখক, অনুবাদক ও সাংবাদিক রাদকা দেনেমারকোভা যখন তাঁর দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে সাহসিকতাপূর্ণ বক্তব্য দেন, তখন উপস্থিত পুরো মিলনায়তন দাঁড়িয়ে তাঁকে করতালির মাধ্যমে সম্মান জানায়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান বক্তা এবং জার্মান পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সেবাস্তিয়ান গুগোলৎস বর্তমান যুগে শিক্ষার গুরুত্ব এবং পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘পড়া মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায়। বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপজ্জনক প্রভাবের মুখে সঠিক তথ্য যাচাই এবং সমাজ গঠনে মানুষের পড়ার দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই।’
এ ছাড়া উদ্বোধনী সংবাদ সম্মেলনে পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন ইতিহাসবিদ জিল লেপোর মার্কিন গণতন্ত্রের সংকট ও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ইউক্রেন-রাশিয়া, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধও সংকট নিয়ে তাঁর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লেখক সালমান রুশদী ভিডিও কনফারেন্স বক্তব্য দেন এবং উপস্থিত হয়ে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ফ্রাঙ্কফোর্টের মেয়র যোসেপ মাইক, হেসেন প্রদেশের মিনিস্টার-প্রেসিডেন্ট বরিস রাইনসহ অনেকেই।
বিশ্বজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের মিলনমেলা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামীদামি লেখক, কবি, প্রকাশক, অনুবাদক, সাহিত্য সমালোচক এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। ১৩০টি দেশের প্রায় ৭ হাজার ৫০০ প্রকাশক ও প্রকাশনার সাথে সম্পর্কিত কোম্পানি মেলায় অংশ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। চেক প্রজাতন্ত্র থেকে প্রায় ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় লেখক ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি মেলায় অংশ নিতে ফ্রাঙ্কফুর্টে এসেছেন, যাঁরা মেলাজুড়ে তাঁদের সাহিত্যকর্ম বিশ্ব–পাঠকদের সামনে তুলে ধরবেন।
বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র প্রতিবছরের মতো এবারও একটি বিশেষ প্যাভিলিয়ন বা স্টল স্থাপন করেছে। এই সরকারি প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর লেখা বই আন্তর্জাতিক পাঠকদের সামনে তুলে ধরবে।
আগামী পাঁচ দিন ধরে চলা এই মেলায় আন্তর্জাতিক কপিরাইট বা স্বত্ব কেনাবেচা, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা, এবং অডিও-ডিজিটাল মাধ্যমের নানা আয়োজন নিয়ে মুখর থাকবে ফ্রাঙ্কফুর্টের এই আসর। ১১ অক্টোবর চেক প্রজাতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে পরবর্তী বছরের (২০২৭) অতিথি দেশ চিলির কাছে মেলার দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে এই আসরের সমাপ্তি ঘটবে।