নারীর সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়নে একটি নব উদ্যোগ

সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রথম আলোয় লেখার অভিজ্ঞতায় আমি বুঝতে পেরেছি, এটি পাঠকদের কাছে তুলনামূলক নতুন বিষয়। আজ পাঠকদের সামনে আমি সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনা করতে চাই। এর দুটি মূল ভিত্তি আছে—দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক সম্পদ (tangible heritage) ও অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (intangible heritage)। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশের নারীদের ক্ষেত্রে ক্ষমতায়নের জন্য অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা ইনট্যানজিবল হেরিটেজের ভূমিকা অনেক বেশি গভীরে প্রোথিত। কারণ, নারীরা যুগ যুগ ধরে সৃজনশীল শিল্প, মৌখিক ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের প্রধান ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে আসছেন। এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নারীকেন্দ্রিক এই ঐতিহ্য আজও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও ক্ষমতায়নের প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে।

সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত—

আমরা এখন মৌখিক ঐতিহ্য (Oral tradition), এই ঐতিহ্য কীভাবে প্রজন্মান্তরে ঐতিহ্য স্থানান্তর (heritage transmission) করে এবং নারী ও শিশুর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখে, তা নিয়ে আলোকপাত করব।

মৌখিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম হলো স্টোরিটেলিং বা গল্প বলা। এটি নিছক বিনোদন নয়, বরং জ্ঞানের স্থানান্তর, ইতিহাসের বাহন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের শক্তিশালী উপায় হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, গল্প বলাটা শিশুদের তাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিশেষ করে লোককাহিনি, পৌরাণিক কাহিনি কিংবা কিংবদন্তি ইত্যাদির মূল্যবোধ শিশুদের নৈতিকতা, পরিচয়বোধ ও আত্মবিশ্বাস গড়তে বড় ভূমিকা রাখে (সেলিম, ২০০১; ডেভিস এট. অল, ২০১৯; ক্যাগিন, ২০২৩)। সুন্দরভাবে বললে এই গল্পগুলো শিশুদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে, যা পরোক্ষভাবে তাদের ক্ষমতায়নের দিকে এগিয়ে নেয়।

সাধারণত এসব গল্পের কথক হয়ে থাকেন নারী; অর্থাৎ মা–খালা–ফুফু ও দাদি–নানি। মজার ব্যাপার হলো, আমার ক্ষেত্রে গল্প শোনানো মানুষটি ছিলেন আমার বাবা।

বাবার একটি স্মৃতি আজও মনে আছে—পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো বাংলাদেশে এসেছিলেন, আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। বিমানের সিঁড়ি দিয়ে বেনজিরকে নামতে দেখে বাবার চোখ গড়িয়ে পানি পড়ল। তা দেখে আমি অবাক। পরে জানলাম, তিনি ভাবছিলেন—তাঁর মেয়েরাও যেন এমন নেতৃত্বের অধিকারী হয়।

স্বপ্নটা বাবার, গল্পটা আমার—

আমার বাবা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর পৈতৃক নিবাস সিলেটের বিয়ানীবাজার। সিলেটের লন্ডনমুখী সংস্কৃতি এবং মেয়েদের শিক্ষার নিম্নহার তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনা না করিয়ে লন্ডনে ‘বিবাহের নামে বেচে দেওয়ার’ প্রবণতা তাঁকে ভীষণভাবে তাড়িয়ে বেড়াত। এ রকম পরিস্থিতি থেকে নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে তিনি আমাদের খুলনায় তাঁর কর্মস্থলে নিয়ে আসেন। একটাই লক্ষ্য ছিল তাঁর, মেয়েরা যেন শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়; অর্থাৎ সত্যিকারের ক্ষমতায়ন লাভ করে।

আমার বাবার ক্ষমতায়নের ধারণা অন্যদের চেয়ে ভিন্নতর ছিল—শুধু চাকরি পাওয়া নয়; বরং নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও সমাজে পরিবর্তনের ধারার সঙ্গে তারাও যেন সমানতালে পা রেখে চলতে পারে।

বাবার একটি স্মৃতি আজও মনে আছে— ১৯৮৯ সালে যখন পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো বাংলাদেশ সফরে এলেন, আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। টিভিতে তাঁকে বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে আমার বাবার চোখ গড়িয়ে পানি পড়তে শুরু করল। তা দেখে আমি অবাকই হয়েছিলাম। পরে জানলাম, তিনি ভাবছিলেন—তাঁর মেয়েরাও যেন এমন নেতৃত্বের অধিকারী হয়।

সেখান থেকেই শুরু আমার গল্পের। আমি স্বপ্ন দেখতাম—কেমন করে বেনজির ভুট্টো হওয়া যায়। কিন্তু পরের বছরেই সে স্বপ্ন ভেঙে গেল, যখন আমার বাবা মাত্র ৫৮ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। বাবার মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ পর আমাকে অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমি বৃত্তি পেলাম।
আমরা পাঁচ বোন ও তিন ভাই। বড়রা তত দিনে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের নেতৃত্ব বর্তাল আমার মেজো ভাইয়ের ওপর। কিন্তু তাঁর আচরণগত জটিলতায় আমাদের পরিবার বিপাকে পড়ে। কারণ, তিনি পাড়া–মহল্লায় সবার উপকার করে বেড়ালেও পরিবারের প্রতি ছিলেন উদাসীন। বাড়ির সীমিত ভাড়া–আয়ের ওপর তিনি হাত দিতেন। ফলে আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। এতে আমার অল্প বয়সী বিধবা মায়ের মানসিক চাপ বেড়ে যায়। তাই আমি মেজো ভাইয়ের অবাধে অর্থ ব্যয় করা রুখে দিতে শুরু করি। এতে আমি আমার মায়ের হাতের লাঠি হয়ে উঠি এবং তাঁর ক্ষমতায়ন বাড়ে। আমিও টেকসই ক্ষমতায়নের পথে এগোতে থাকি।

‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

লিঙ্গভিত্তিক নেতৃত্ব থেকে দক্ষতাভিত্তিক নেতৃত্ব

আমরা সাধারণত নেতৃত্বকে লিঙ্গ বা বয়সের ভিত্তিতে বিচার করি। যদিও ক্ষমতায়নের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব হলো দক্ষতা, সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নীরবতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

আমাদের যৌথ পরিবার ব্যাবস্থায় বয়োজ্যেষ্ঠরা স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা ভোগ করেন, প্রশ্নহীন। এতে পরিবারে মতপ্রকাশের অধিকার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ গবেষণার ভালো প্রশ্ন তৈরি করার ক্ষমতা আসে মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের মাধ্যমে।
বাংলাদেশে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন সাধারণত সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আলোচিত হলেও পরিবার, শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে এই অধিকার কার্যত অনুপস্থিত।
আমাদের পৃথিবী মেধাবীদের প্রতি সব সময়ই কঠোর, বিশেষ করে গ্যালিলিও থেকে আইনস্টাইন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিপীড়িত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। আবার ভারতীয় উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে—রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরি গেছে, অমর্ত্য সেনের জমি দখলের চেষ্টা হয়েছে এবং অধ্যাপক ইউনূসকেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
আমি ঠিক করেছি, আর চুপ থাকা যাবে না এবং এমন কিছু করতে হবে, যাতে বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা হয় এবং তাতে সবাই অংশ নিতে পারেন।

নতুন উদ্যোগ ডব্লিউসিইআই

ওয়েবসাইট:

নারীদের সাক্ষরতা বৃদ্ধি পেলেও আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বে তাঁদের সংখ্যা এখনো সীমিত। সে জন্য নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নসহ মানসিক, সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রত্যয়ে বর্তমান অবস্থান কানাডা থেকে উইমেন কালাচারাল এমপাওয়ারমেন্ট (ডব্লিউসিইআই) নামে অনলাইনভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম (wceia.org) তৈরি করেছি। এতে আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে শুরু করে এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, আমরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত হয়েছেন। ডব্লিউসিইআইয়ের লক্ষ্য হচ্ছে, নারীদের শিক্ষা, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিতে কাজ করা। এ কাজে আমরা কারও কাছ থেকে কোনো ডোনেশন বা অনুদান না নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছি। আমাদের দুটি স্লোগান হলো, ‘ডোনেশনের প্রতি না, সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়নের জন্য হ্যাঁ’; অর্থাৎ দাননির্ভর উন্নয়ন নয়।

দাতানির্ভর উন্নয়ন প্রায়ই উচ্চ সুদের বোঝা বাড়ায়, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগের চাপ দেয় ও স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করে। ফলে যাঁদের উন্নয়নের কথা বলা হয়, তাঁরা খুব কমই উপকৃত হন।

থ্রি জিরো ম্যাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন

অধ্যাপক ইউনূসের ‘থ্রি জিরো, তথা শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য দারিদ্র্য ও শূন্য বেকারত্ব’— এই ধারণাকে সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে একত্র করে ডব্লিউসিইআই একটি সেলফ–সাসটেইনিং ক্ষমতায়ন মডেল তৈরি করছে, যার মূল ভিত্তি হলো ‘শূন্য দান, শূন্য দারিদ্র্য ও শূন্য বৈষম্য’। আমাদের মতে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাই টেকসই উন্নয়নের নৈতিক ভিত্তি।

উচ্চশিক্ষা: একাডেমিক  মেন্টরিং ও নেতৃত্ব তৈরির মডেল

রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ ও গবেষণার জন্য উচ্চশিক্ষা অপরিহার্য। যদিও মাস্টার্স ও পিএইচডিতে এখনো নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত। সে জন্য ডব্লিউসিইআই নারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও মেন্টরশিপ ও স্কলারশিপ সহায়তা, রিসার্চ প্রপোজাল তৈরি, পাবলিকেশন  ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্স প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে। আইইএলটিএস, জিআরই, টোফেল ইত্যাদি কোর্স চালু করা হবে। ইতিমধ্যেই বিশ্বের তিনটি অঞ্চলে আমরা মেন্টর নেটওয়ার্ক চালু করেছি।

কারিগরি শিক্ষা: মিডলম্যান ছাড়া মালিকানা

ডব্লিউসিইআই ভোকেশনাল এডুকেশন ট্রেনিং বা কারিগরি শিক্ষার প্রশিক্ষণ (ভিইটি) প্রদানের মাধ্যমে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবিকা উপার্জনের ধরন বদলে দিতে চায়। আমরা দেশীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানের যৌথ সহায়তায় এই কর্মসূচি চালাব।

প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে আমরা শুরু করছি হেরিটেজ মার্কেটিং বা সাংস্কৃতিক বিপণন, যেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ঐতিহ্যবাহী পণ্য সরাসরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হবে। এই মডেল বিভিন্ন কমিউনিটিতে সাংস্কৃতিক মালিকানা নিশ্চিত করবে বলে আমরা আশা করি।

গবেষণা ও সোশ্যাল বিজনেস পাবলিকেশন

উন্নয়নশীল বিশ্বে গবেষণা একেবারেই অবহেলিত। এসব দেশে ইন্টারনেট, জার্নাল ও অভিজ্ঞ গবেষকের অভাব দীর্ঘকাল ধরেই ক্ষমতায়নের পথে বাধা হয়ে আছে। আমরা বিশ্বাস করি, গবেষণার ক্ষমতা/ সুযোগ পাওয়াও একটি মানবাধিকার।

একটি সামাজিক ব্যবসা মডেলের ভিত্তিতে আমরা এমন একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গঠন করছি, যেখানে গবেষকদের ন্যায্য রয়্যালটি দেওয়া হবে এবং শিক্ষার্থীরাও সাশ্রয়ী মূল্যে বই–জার্নাল ইত্যাদি পাবে। সব মিলিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন এবং সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন ও ঐতিহ্য সুরক্ষার পথে এগিয়ে যাবে বিভিন্ন সমাজ, তথা দেশ।

পরিশেষে, এখনো ঠিক জানি না, আমি আমার বাবার স্বপ্নের বেনজির ভুট্টোর মতো বড় হতে পারি কি না। তবে আমি এমন একটি মডেল তৈরি করছি, যেকোনো মেয়েই চেষ্টা করলে বেনজির ভুট্টোর মতো সফল হতে পারবে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে এগিয়ে নেবে।

  • লেখক: শাহিদা খানম, সিইও ও ফাউন্ডার, ওমেন কালচারাল এমপাওয়ারমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল (ডব্লিউসিইআই)।