প্রথম দফায় পিছিয়ে, দ্বিতীয় দফায় ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাফাইল ছবি: রয়টার্স

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় জয় পেয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। গত রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ভোটে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ৮০ বছর বয়সী এই নেতা। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় ঘুরে দাঁড়িয়ে লুলার এই জয় ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেকটোরাল কোর্টের (টিএসই) প্রকাশিত চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লাখ ৫৬ হাজার ২৩২ ভোট, যা বৈধ ভোটের ৫১.৭৯ শতাংশ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লাখ ২৬ হাজার ৪১ ভোট, যা বৈধ ভোটের ৪৮.২১ শতাংশ। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৪৪ লাখের বেশি।

প্রথম দফায় এগিয়ে ছিলেন ফ্লাভিও

৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার নির্বাচনে লুলাকে পেছনে ফেলেছিলেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ওই দফায় ফ্লাভিও পেয়েছিলেন ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট, আর লুলার প্রাপ্তি ছিল ৪৫.১৬ শতাংশ। ফলে দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে লুলার সামনে ছিল ব্যবধান কাটিয়ে জয় নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।

শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধান কাটিয়ে জয় তুলে নেন লুলা। নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার জোরদার করা এবং বিভিন্ন শহরে সমর্থকদের উপস্থিতি তাঁর প্রচারে ভূমিকা রাখে বলে ব্রাজিলের সরকারি সংবাদমাধ্যম Agência Brasil জানিয়েছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ

টিএসইর তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় ভোট দেওয়ার যোগ্য ভোটার ছিলেন ১৫ কোটি ৮০ লাখের বেশি। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১২ কোটি ৮২ লাখ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ভোটদানে বিরত থাকার হার ছিল প্রায় ১৯.২ শতাংশ, যা প্রথম দফার ২১.০৮ শতাংশের তুলনায় কম।

তবে নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ জানায়, কিছু এলাকায় ভোট গ্রহণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণে ভোট গণনার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত সমন্বয় করতে হয়েছিল।

শ্রমিক থেকে প্রেসিডেন্ট

১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের পারনামবুকো রাজ্যের গারানিউন্স শহরে জন্ম লুলার। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ধাতুশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

২০০২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হন লুলা। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরেন। এবার ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয় তাঁকে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনছে।

সামনে অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের চ্যালেঞ্জ

নতুন মেয়াদে লুলা সরকারের সামনে জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, জননিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে। নির্বাচনী প্রচারে তিনি মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি হারে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো, শিক্ষা খাতে সহায়তা সম্প্রসারণ এবং জননিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অন্যদিকে প্রায় ৪৮ শতাংশ বৈধ ভোট পেয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ফলে নির্বাচনের ফলাফল দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনের বাস্তবতাও তুলে ধরেছে। নতুন সরকারের জন্য বিরোধী পক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সামলানো এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, লুলার নতুন মেয়াদের শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি। চতুর্থ মেয়াদে তাঁর সরকার অর্থনীতি, সামাজিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে দেশটির নাগরিকদের।