সিডনিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের চায়ের আড্ডায় এখন কেবল বাংলাদেশের নির্বাচন

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বাঙালিপাড়াখ্যাত লাকেম্বায় প্রবাসীদের চায়ের আড্ডায় জমে উঠেছে বাংলাদেশের নির্বাচনের আলাপ। ১০ ফেব্রুয়ারিছবি: প্রথম আলো

অস্ট্রেলিয়ার ব্যস্ত নগর সিডনির বাংলাদেশি–অধ্যুষিত শহরতলির অলিগলিতে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ঢেউ লেগেছে। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রাত্যহিক জীবনের বড় অংশজুড়ে এখন শুধুই দেশের রাজনীতির চালচিত্র।

লাকেম্বা, মিন্টো, ক্যাম্পবেল টাউন কিংবা ব্ল্যাকটাউনের প্রবাসী বাংলাদেশিদের এলাকাগুলোতে এখন আর প্রবাসজীবনের প্রথাগত আলাপ নেই; বরং রেস্তোরাঁ আর চায়ের আড্ডায় ঠাঁই করে নিয়েছে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ আর আগামীর ভাগ্যনির্ধারণী নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

এবারের নির্বাচনে প্রবাসীদের জন্য বড় প্রাপ্তি হয়ে এসেছে ডাকযোগে ভোট বা পোস্টাল ব্যালট। ক্যানবেরার বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি ইতিপূর্বে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১১ হাজার ১৫৮ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৭ হাজার ৩০০ জনের বেশি প্রবাসী ব্যালটের মাধ্যমে তাঁদের ভোটের রায় পাঠিয়েছেন। ঘরোয়া আড্ডা থেকে শুরু করে ফুটপাতের জটলা—সবখানেই এখন ভোটের হিসাব-নিকাশ।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের অনুসারীরা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।

সিডনির বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত সচেতন বাঙালিদের রাজনৈতিক ভাবনা ও মাঠপর্যায়ের চিত্র বুঝতে প্রথম আলো কথা বলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে।

বাঙালিপাড়াখ্যাত লাকেম্বার বাসিন্দা এ এন এম মাসুম বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর আমরা প্রবাসীরা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি, এটি আমাদের নাগরিক অধিকারের বড় স্বীকৃতি। এই এলাকায় বাঙালিদের মধ্যে এবার ভোট নিয়ে বেশ আগ্রহ রয়েছে।’

লাকেম্বায় গ্রোসারি শপ বঙ্গবাজারের সামনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আড্ডা। ১০ ফেব্রুয়ারি
ছবি: প্রথম আলো

তবে ভোটের সঠিক মূল্যায়ন হবে কি না, তা নিয়ে প্রবাসীদের মনে একটি সুপ্ত শঙ্কাও কাজ করছে মন্তব্য করে মাসুম বলেন, ‘আমরা চাই, বাংলাদেশে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসুক। কোনো উগ্রবাদী শক্তি যেন অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারে, সেদিকেও আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।’

ভিন্ন এক পটভূমি তুলে ধরেন লাকেম্বার আরেক বাসিন্দা দানিয়াল নাহিন। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গতানুগতিক ধারার পরিবর্তন চাই। বহু বছর তো একই ধারা চলল। এবার আমাদের চাওয়া এমন এক নেতৃত্ব, যারা মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো ফিরিয়ে দেবে।’

দানিয়াল নাহিন বলেন, ‘লাকেম্বার পথে-ঘাটে এখন সবাই এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছে। আমরা চাই এমন এক নির্বাচন, যেখানে সত্যিকারের জনমতের প্রতিফলন ঘটবে এবং একটি প্রকৃত সৎ, গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হবে।’

ক্যাম্পবেল টাউনের বাসিন্দা নিজাম উদ্দিনের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর কেবল ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রবাসীরা বিভক্ত হতে পারেন, কিন্তু দিন শেষে সবার চাওয়া দেশের স্থিতিশীলতা।’

নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সিডনির রাজপথে এখন এক মিশ্র চিত্র। একদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দিচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ পোস্টাল ব্যালট হাতে নিয়ে একধরনের ভোটাধিকারের উৎসব পালন করছেন। প্রবাসীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই বলে দেয়, আমরা দেশের জন্য কতটা ভাবি।’

সিডনির ব্যস্ততম রাজপথ থেকে শুরু করে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোর টেবিলে এখন একটাই প্রশ্ন—কে দিতে চলেছে আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব?

প্রবাসীদের এই গভীর আগ্রহ, উদ্বেগ আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা বারবার এটাই প্রমাণ করছে, প্রবাসে থাকলেও তাঁদের হৃৎস্পন্দন এখনো মিশে আছে প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতে।