ব্যাংককে বসন্ত
সম্মেলনের ডাক এলে আমি প্রায়ই নগরের হৃৎপিণ্ডে গিয়ে আশ্রয় নিই—কোনো উঁচু হোটেলের কাচঘেরা ঘরে; যেখানে মানুষের মুখগুলোও যেন লিফটের মতো ওঠানামা করে, আর দিনগুলো ইস্পাতের রেলের ওপর দিয়ে ছুটে যাওয়া ট্রেনের মতো শব্দ তুলে চলে যায়। সেমিনারের আলো, বক্তৃতার শব্দ, করতালির ক্ষণিক ঢেউ—সব মিলিয়ে জীবন তখন একপ্রকার কৃত্রিম অরণ্য; যেখানে গাছের বদলে দাঁড়িয়ে থাকে স্কাইস্ক্র্যাপার, আর নদীর বদলে বয়ে যায় গাড়ির লাল-সাদা আলোর স্রোত। সাধারণত এমন সফরের শুরু আছে, শেষও আছে; কিন্তু বিদায়ের কোনো মুখ নেই। উদ্বোধনের মঞ্চে মানুষ ফুল দেয়, হাসে, আলোর নিচে ছবি তোলে; অথচ বিদায়ের সময় সবাই এমন নিঃশব্দে সরে যায়, যেন শরতের শেষে কাশবনের ভেতর দিয়ে হাওয়া চলে গেল। কিন্তু সেবার, দুই হাজার আঠারোয় ব্যাংককে ঘটেছিল অন্য রকম কিছু। আগমন যেমন আমাকে স্পর্শ করেছিল, বিদায়ও তেমনি এসে বসেছিল আমার কাঁধে এক বিষণ্ন কোকিলের মতো।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়। ব্যাংককের প্রাণকেন্দ্রে ‘অ্যাম্বাসেডর’ হোটেলে সম্মেলন শেষ হলো। এরপর আমার যাওয়ার কথা ছিল উত্তরের পাহাড়ঘেরা শহর চিয়াং মাইয়ে; বিশ্ববিদ্যালয়ের নরম বিকেলের ছায়ায় কিছু কথা বলব বলে। কিন্তু মানুষের পরিকল্পনার ওপর আকাশেরও তো একটা গোপন অধিকার থাকে—সেই সফর বাতিল হয়ে গেল। হাতে দুদিন অবকাশ এল; যেন ব্যস্ত জীবনের ক্যালেন্ডারে হঠাৎ দুটো সাদা বক নেমে বসেছে। আমি ঠিক করলাম এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির লাইব্রেরিতে যাব। বহুদিনের ইচ্ছা ছিল জায়গাটি দেখার। অর্থনীতির জার্নাল নিয়ে আমার যে নীরব সংসার—কাগজ, প্রুফ, লেখক, ছাপাখানার গন্ধ—তার কিছু কাজও সেরে নেওয়া যাবে। তা ছাড়া কাছেই আমার মামাতো বোন শায়লা থাকে; স্বামী ফারুক আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে। যেন অচেনা বিদেশে হঠাৎ একটি বাংলার উঠান গজিয়ে উঠেছে। বক্তৃতার পালা সমাপ্ত হলো শনিবার বিকেলে।
রোববার সকালে শায়লা গাড়ি পাঠাল। আমি শহর ছাড়িয়ে যেতে লাগলাম। প্রথমে উঁচু দালান, ফ্লাইওভার, স্কাইট্রেন—সব যেন কংক্রিটের বটগাছের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে নগর সরে গেল; আর পৃথিবী নরম হতে শুরু করল। রাস্তা সরু হলো; বাতাসে ঘাসের গন্ধ এল। মনে হলো, ব্যাংকক হঠাৎ খুলে গিয়ে তার অন্তর্লীন গ্রামবাংলাকে দেখিয়ে দিল। ধানখেত, জলাভূমি, নারকেলগাছ, নাম না–জানা ফুল—সব যেন বাংলাদেশের কোনো ভুলে যাওয়া বিকেলের স্মৃতি। আমি গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম; মনে হচ্ছিল, বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের মুখগুলো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সব চেনা—তবু সব অপরিচিত। যেমন বহু বছর পরে নিজেরই মুখ আয়নায় দেখলে যেমন লাগে।
এরপর আমরা ঢুকলাম এক অদ্ভুত আবাসিক এলাকায়। বন যেন তার বুক চিরে মানুষের জন্য সামান্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। বড় বড় বাড়িগুলো লতাপাতার আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে ছিল, যেন তারা পৃথিবীর নয়, বরং কোনো নিঃশব্দ পাখির বাসা। কলাগাছ, সুপারি, নারকেল, অর্কিড, মৌমাছি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন বৃষ্টিভেজা এক উষ্ণ উপকথা। ঠিক তখনই ঘটল সেই বিস্ময়। বাড়ির কাছে পৌঁছাতেই মাথার ওপর থেকে ভেসে এল—‘কুহু…কুহু…’, আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। হাজার মাইল দূরে, বিদেশের আকাশতলে, হঠাৎ সেই কোকিলের ডাক! মনে হলো, বাংলাদেশের কোনো ফাল্গুনী দুপুর মেঘের ভেলায় চড়ে এখানে এসে নেমেছে। আমার গ্রামের বাড়ির মরা ধামাই গাঙ, শিমুল ফুলের আগুনরঙা ছায়া, কৈশোরের বিকেল—সব একসাথে বুকের মধ্যে জেগে উঠল। পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব তখন গলে গিয়ে কেবল একটি শব্দে এসে দাঁড়াল—‘কুহু’।
আমি শায়লাদের বললাম, তোমাদের আগে আমাকে স্বাগত জানিয়েছে এই পাখি। সে যেন বলে গেল—‘...মধুর বসন্ত এসেছে...।’ প্রায় ৫০ বছর আগে বাড়ি ছেড়ে কলেজে গিয়েছিলাম; তারপর কত নগর, কত সভা, কত বিমানবন্দর পেরিয়ে এসেছি—কিন্তু এমন উচ্ছ্বাসময় কোকিলের ডাক আর কোথাও শুনিনি। ফারুক হাসল। বলল, ‘এখানে ১২ মাসই কোকিল ডাকে।’ আমি অবাক হলাম। কোকিল কি তবে ঋতুরও নাগরিকত্ব বদলে ফেলেছে? নাকি থাইল্যান্ড এমন এক দেশ, যেখানে বসন্ত চিরদিন ঘাসের ভেতর ঘুমিয়ে থাকে? শায়লা বলল, ‘ভাইয়া, হোটেলে ফিরে না গিয়ে আজ আমাদের সাথে থেকে যান। সকালে ঘুঘুর ডাক শুনে ঘুম ভাঙবে।’ তার কথায় আমি যেন বাংলা সাহিত্যের কোনো কবিতার ভেতরে ঢুকে পড়লাম। মনে হলো, পৃথিবীতে এখনো এমন ঘর আছে, যেখানে পাখির ডাক দিয়ে সকাল শুরু হয়; অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দ দিয়ে নয়। আমি শায়লাকে বললাম, তোমার পরিবেশটা এমন, কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে? বিনয়ের সাথে বলল, ‘ভাইয়া, এ কম্ম আমার নয়।’ তা তো হবেই—যারা অঙ্কে ভালো, তারা সাহিত্যে কাঁচাই হয়।
সেই বাড়িতে চায়ের সঙ্গে এল সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মেড়াপিঠা। দূর দেশে বসে হঠাৎ নানাবাড়ির রান্নাঘরের সুগন্ধি ধোঁয়ার কথা মনে পড়ে গেল। তারপর শায়লা গেল ছাত্রছাত্রীদের অঙ্ক পড়াতে। আর ফারুক আমাকে নিয়ে বের হলো পাড়া বেড়াতে। বাড়ির পেছনে বিশাল জলাধার। গলফ কার্টে করে ঘুরলাম; নির্মল হাওয়া খেতে খেতে একটা চক্কর মেরে এলাম। নারকেলের সুবাস চারদিকে। গাছের মাথায় ঝুলন্ত নারকেলগুলো জালে বাঁধা—যেন আকাশের সন্তানদের মাটিতে পড়ে আহত হওয়া থেকে বাঁচানো হচ্ছে। যেন ব্যাংককের নেড়ারা বেলতলায় একবার গেলেও নারকেলতলায় বারবার যেতে পারে—নিরাপদে।
শায়লার কোচিং শেষ হলে গেলাম অধ্যাপক ফজলে করিম সাহেবের বাড়ি। বিশাল আয়োজন। টেবিলভর্তি খাবার। চিকন চালের পোলাও, কাবাব, সবজি, মাছ, মাংস, হালুয়া, জামরুল—লাল রঙের কচমচে। মেকং ডেল্টার পাবদা মাছের দোপিয়াজি যেন স্বপ্নের মতো লাগল। ঘরের কাচের দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, আমি বাংলাদেশের কোনো শান্ত গ্রামে বসে আছি। লেমন গ্রাসের ঝোপ বাতাসে দুলছে; পেছনে স্থির জলভরা খাল; তার ওপারে জংলি ঘাস। মনে হচ্ছিল, এইমাত্র যদি কোনো রাখাল বালক বাঁশি বাজাতে বাজাতে চলে আসে, তাহলে পৃথিবী আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। দুপুরের রোদের তেজ নরম হলে আমরা বাইরে গিয়ে গাছের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। ছোট ছোট আমগাছে আম পলিথিনে মোড়া—পাখির ঠোকর থেকে বাঁচানোর জন্য। ভাবলাম, মানুষ কেবল নিজের সন্তানকেই নয়, ফলকেও রক্ষা করতে চায়; অথচ পাখির ক্ষুধার কথা কেই ভাবে না। পৃথিবী বোধ হয় এমনই—ভালোবাসা আর স্বার্থ পাশাপাশি জন্মায়। খাওয়া শেষ হলে এআইটি লাইব্রেরিতে গেলাম। কাজ সারলাম, একটু ঘোরাঘুরি করে ছবি তুললাম।
বাসায় ফিরে এসে সন্ধ্যায় মসজিদের মেলায় গেলাম। থাই শিশুদের হাসি, থাই খাবারের খুশবু, মাগরিবের নামাজে ইমামের কিরাত—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব মুসলমানের হৃদয়ে হয়তো একই চাঁদ পলে পলে জ্বলে। বাসায় ফিরে কিছুক্ষণ গল্প-আড্ডা, হাসি-তামাশা। তারপর আবার ডিনার। একটু বিশ্রাম। ফারুক ট্যাক্সি ডাকতে দিল না। তারা দুজন আমাকে গাড়িতে করে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেল।
পরদিন ফিরে এল বিদায়ের ক্ষণ। সন্ধ্যার ব্যাংকক। তখন ট্রাফিক জ্যামে স্থির হয়ে আছে। কংক্রিটের বন, ধোঁয়া, স্টিলের দালান—সব মিলিয়ে নগর যেন ক্লান্ত এক দানব। ঠিক তখনই, সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্তে দূর থেকে আবার ভেসে এল—‘কুহু… কুহু…’, আমি চমকে উঠলাম। এ কেমন শহর! এখানে তো নদী নেই, বটগাছ নেই, শিমুল ফুল নেই; তবু কোকিল আছে! হ্যাঁ, সত্যিই পাখি ছিল, কোকিলের ডাক ঠিকই শুনেছি? এভাবেই ব্যাংকক আমাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছিল—এক বিষণ্ন, মায়াভরা কণ্ঠে।
আজও সেই ডাক কানে বাজে। মনে হয়, পৃথিবীর সব সফরের শেষে মানুষ আসলে একটি শব্দই সঙ্গে করে নিয়ে ঘরে ফেরে—একটি পাখির ডাক, একটি ক্লান্ত বিকেলের বাতাসের ঘ্রাণ, অথবা কোনো অচেনা মানুষের অকারণ মমতা। থাইল্যান্ড হয়তো আর কোনো দিন যাওয়া হবে না। কিন্তু সেই কোকিল—সে আজও আমার ভেতরে ডেকে যায়; যেন দূর দেশের কোনো বন থেকে হারিয়ে যাওয়া শৈশব আমাকে বারবার ডাকছে। ফিরে ফিরে ডাকছে।
লেখক: আবু এন এম ওয়াহিদ, অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, সম্পাদক—জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াস
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]