ক্যানবেরায় অন্য রকম একুশ

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার নীল আকাশে গতকাল প্রতিধ্বনিত হলো বাঙালির হৃৎস্পন্দনছবি: লেখকের পাঠানো

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার নীল আকাশে গতকাল শনিবার প্রতিধ্বনিত হলো বাঙালির হৃৎস্পন্দন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ১৩তম বার্ষিক পালনে ক্যানবেরার আইকনিক স্থাপত্য ন্যাশনাল ক্যারিলনে বেজে উঠল আমাদের প্রাণের গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’। যখন দক্ষ ক্যারিলনিস্ট থমাস লাউয়ের নিপুণ স্পর্শে এই অমর সুরের মূর্ছনা ক্যানবেরার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, তখন উপস্থিত শত শত বাঙালির চোখেমুখে খেলা করছিল এক অদ্ভুত গর্ব, আবেগ আর কৃতজ্ঞতার আবেশ।

পৃথিবীর একমাত্র জাতি হিসেবে বাঙালিরা মাতৃভাষার জন্য রাজপথে রক্ত দিয়েছে। ১৯৫২ সালের সেই আত্মত্যাগের ঋণ আজ সারা বিশ্ব বিনম্রচিত্তে স্বীকার করে নিয়েছে। বাঙালির সেই একুশে ফেব্রুয়ারি আজ ৮০০ কোটি মানুষের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই ঐতিহাসিক অর্জনকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ মুভমেন্টের (আইএমএলএম) অন্যতম উদ্যোক্তা জিয়াউল হক বাবলু। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় আয়োজিত এই ল্যাঙ্গুয়েজ ওয়াক বা ভাষাপদযাত্রা এখন ক্যানবেরার বার্ষিক ক্যালেন্ডারে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

পদযাত্রা শেষে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘সসেজ সিজল’ এবং উন্মুক্ত /////////সাংস্ক্ররতিক//////////////
ছবি: লেখকের পাঠানো

শনিবার সকালে ক্যানবেরার ইন্টারন্যাশনাল ফ্ল্যাগ ডিসপ্লে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে জনসমাগম শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে দক্ষিণ সুদানের নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনা এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে। এমসি শাদে নোয়াবির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটিতে ‘ওয়েলকাম টু কান্ট্রি’ পরিবেশন করেন এনগুননাওয়াল সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ডক্টর ক্যারোলিন হিউজ। তিনি বলেন, ‘ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, বিশ্বদর্শন এবং পূর্বপুরুষদের জ্ঞানের বাহক।’ এরপর আইএমএলএমের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হেলেন মুসা ও ইউনেসকোর মহাপরিচালকের বাণী পাঠ করেন ওমর মুসা।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এফ এম বোরহান উদ্দিন এবং বহুসংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী মাইকেল পেটারসন। আমন্ত্রিত অতিথিরা যৌথভাবে ২০২৬ সালের ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ওয়াক’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। ব্যানার, ফেস্টুন আর রঙিন বর্ণমালায় সজ্জিত হয়ে পদযাত্রাটি কিংস অ্যাভিনিউ ব্রিজ অতিক্রম করে ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স মেমোরিয়ালের কাছে কিংস পার্কে গিয়ে শেষ হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে দক্ষিণ সুদানের নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনা এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে
ছবি: লেখকের পাঠানো

আয়োজনটির সফল উদ্যোক্তা জিয়াউল হক বাবলু এক আবেগঘন মন্তব্যে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের আত্মপরিচয় আর শিকড় লুকিয়ে আছে আমাদের মাতৃভাষায়। সিডনি বা ক্যানবেরা—আমরা যেখানেই থাকি না কেন, একুশ আমাদের মেরুদণ্ড। আমরা চাই, এই ভাষাপদযাত্রার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার বহু সংস্কৃতির এই দেশে প্রতিটি জাতি তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষাকে মর্যাদার সঙ্গে লালন করুক। ক্যারিলনের ঘণ্টাধ্বনিতে যখন আমাদের শোক আর গৌরবের গানটি বাজে তখন মনে হয়, আমাদের ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ আজ সার্থক। আমরা কে, আমাদের পরিচয় কী—তা যেন পরবর্তী প্রজন্ম কখনোই ভুলে না যায়, সেই লক্ষ্যেই আমাদের এই অবিরাম পথচলা।’

পদযাত্রা শেষে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘সসেজ সিজল’ এবং উন্মুক্ত /////////সাংস্ক্ররতিক//////////////। সেখানে বাংলাদেশের /////////////সম্মলিতিত/////////// একুশের গান গেয়ে ওঠেন। দুপুর সাড়ে ১২টায় ন্যাশনাল ক্যারিলন থেকে থমাস লাউ পরিবেশন করেন বিশ্ব মাতৃভাষার গান। সেই সুরের মায়াজালে একাত্ম হয়ে যায় পৃথিবীর ৬০টির বেশি ভাষার মানুষ। উপস্থিত জনতা স্বীকার করে, এটি কেবল একটি পদযাত্রা নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আত্মপরিচয় এবং সুমহান ঐতিহ্যের এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।

আরও পড়ুন