সুইডেন থেকে হলিউড: সিনেমার মায়ায় আবদ্ধ জীবনস্মৃতি

ছবি: লেখকের পাঠানো

সিনেমা হলের ভেতরে বসে জীবনে অনেক ছবি দেখেছি। ছোটবেলায় অভিনয় করেছি, বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকা এফডিসিতে গিয়েছি। মা–বাবা ধরে নিয়ে আবার স্কুলের পাঠশালায় ভর্তি করেছেন। পরে কোনো এক সময় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। তারপর জেদ চাপে জিডি পাইলট হতে হবে। শুরুর শেষ পর্বে সেটাও ছেড়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছি। সে প্রায় ৪২ বছর আগের কথা। আজ কেন জানি বারবার মন ফিরে যেতে চায় সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে। সব স্বপ্ন, সব স্মৃতি ছেড়ে এসেছি, অনেক কিছু ভুলেছি। কিন্তু ভুলতে পারিনি সিনেমার জগৎ। সেই অন্ধকার হল, নিঃশব্দ অপেক্ষা, পর্দায় আলো জ্বলে ওঠার মুহূর্ত। মাঝেমধ্যে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে যুক্তরাষ্ট্রের লসঅ্যাঞ্জেলসের হলিউডের অস্কার গালায়, অথবা সুইডেনের স্টকহোমের গুল্ডবার্গ।

সিনেমা শুধু পর্দার আলো নয়। এটি মানুষের স্বপ্নকে দৃশ্যমান করার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। সেই ভাষার দুটি বড় মঞ্চ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্কার গালা ও সুইডেনের গুল্ডবার্গ।

লসঅ্যাঞ্জেলসের অস্কার গালা মানে শুধু লালগালিচা, ঝলমলে আলো বা দামি পোশাক নয়। এটি মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র স্বীকৃতির মঞ্চ। এখানে একটি ছবি, একটি চরিত্র বা একটি সংলাপ বিশ্বের কোটি মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। অস্কার এমন একটি জায়গা, যেখানে স্বপ্নকে বৈশ্বিক ভাষা দেওয়া হয়। যেখানে একজন অচেনা অভিনেতাও এক রাতেই ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এই মঞ্চ প্রমাণ করে, সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, এটি সময়কে ধারণ করার একধরনের দলিল।

অন্যদিকে স্টকহোমের গুল্ডবার্গ অনেক বেশি সংযত, অনেক বেশি নীরব। কিন্তু গভীরতায় কোনো অংশে কম নয়। সুইডিশ চলচ্চিত্রজগতে গুল্ডবার্গ হলো আত্মসম্মানের প্রতীক। এখানে বাহুল্য নেই, আছে গল্পের শক্তি, চরিত্রের সত্যতা ও সমাজের প্রতিফলন। ইঙ্গমার বার্গম্যানের মতো নির্মাতারা এই দেশ থেকেই দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব, নিঃসঙ্গতা আর প্রশ্নগুলোও সিনেমার প্রধান বিষয় হতে পারে।

অস্কার কী শেখায়

অস্কার আমাদের প্রথমেই শেখায় সময়কে ধরতে। একটি ভালো সিনেমা কেবল একটি গল্প নয়, এটি একটি যুগের মানসিক দলিল। যুদ্ধ, প্রেম, বৈষম্য, একাকিত্ব, ক্ষমতা, আশা কিংবা পরাজয়। সবকিছু এখানে শিল্পের ভাষায় সংরক্ষিত হয়। অস্কার শেখায়, সত্য সব সময় চিৎকার করে না, অনেক সময় নীরবতার মধ্যেই সবচেয়ে গভীর সত্য লুকিয়ে থাকে।

অস্কার দেখায়, মানুষের গল্পের কোনো সীমান্ত নেই। ভাষা আলাদা হতে পারে, সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ভয়, ভালোবাসা, ক্ষুধা, স্বপ্ন সব জায়গায় একই। একটি ছোট দেশের ছোট গল্পও সঠিকভাবে বলা হলে পুরো পৃথিবীর গল্প হয়ে উঠতে পারে। এখানেই অস্কারের শক্তি।

নোবেল প্রাইজের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটা সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর। নোবেল প্রাইজ মানব সভ্যতার চিন্তা, জ্ঞান ও নৈতিক উচ্চতার স্বীকৃতি। অস্কার সেই একই মানব সভ্যতাকে অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ করে। নোবেল বলে মানুষ কী ভেবেছে, অস্কার দেখায় মানুষ কী অনুভব করেছে। একজন লেখক শব্দ দিয়ে ইতিহাসে ঢুকে যান, একজন নির্মাতা আলো ও নীরবতা দিয়ে ইতিহাস আঁকেন। তাই অস্কারকে বলা যায় অনুভূতির নোবেল।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

সিনেমা স্বপ্নকে বাস্তব করে, কিন্তু সেই বাস্তব কখনো কঠিন, কখনো নির্মম। আবার বাস্তবকে অবাস্তব করে তোলে, যাতে আমরা তা সহ্য করতে পারি। দারিদ্র্যকে রূপকথা বানায় না, বরং চোখের সামনে ধরে রাখে। প্রেমকে অতিমানবিক করে না, বরং অসম্পূর্ণ রাখে। সিনেমা আমাদের শেখায়, জীবন ঠিক যেমন তেমনই সুন্দর নয়, আবার পুরোপুরি অন্ধকারও নয়।

আরও একটি কাজ সিনেমা করে, যা অন্য কোনো শিল্প এত গভীরভাবে পারে না। সিনেমা আমাদের নিজের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। পর্দার চরিত্রের সঙ্গে আমরা নিজেদের ভুল, ভয়, সাহস আর ব্যর্থতাকে মিলিয়ে দেখি। এক অচেনা মানুষের কান্নায় আমরা নিজের হারানো কাউকে খুঁজে পাই। এক নীরব দৃশ্যে নিজের বলা হয়নি এমন কথাগুলো শুনতে পাই।

এই অস্থিরতার মধ্যে, যেখানে পৃথিবী যেন ব্যস্ত একটি সুন্দর পৃথিবীকেই ধ্বংস করতে, ঠিক সেই সময়ই সিনেমা হলের অন্ধকার দরজাটা ধীরে খুলে যায়। বাইরে যুদ্ধ, হাহাকার, মুনাফার হিসাব, ক্ষমতার লড়াই। ভেতরে ঢুকলেই আলো নিভে যায়, শব্দ থেমে আসে, আর মানুষের মন একটু হলেও বিশ্রাম পায়।

এখানে তুমি পেতে পারো একটু বিনোদন। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। পেতে পারো একটু হোপ, একটু স্বস্তি। এমন এক স্বস্তি, যা বাস্তব পাল্টায় না, কিন্তু মানুষকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচায়। সিনেমা আমাদের শেখায়, সবকিছু ভেঙে পড়লেও গল্প বলা থামে না, স্বপ্ন দেখাও থামে না।

এই অন্ধকার হলে বসে তুমি দুই ঘণ্টার জন্য অন্য এক পৃথিবীতে ঢুকে পড়ো। সেখানে হয়তো যুদ্ধ নেই, অথবা যুদ্ধ থাকলেও তার ভেতর মানবিকতা বেঁচে আছে। সেখানে ভালোবাসা এখনো কথা বলে, ন্যায় এখনো প্রশ্ন তোলে, আর মানুষ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

এই সময়ে সিনেমা আর বিলাসিতা নয়। এটি প্রয়োজন। কারণ, যে পৃথিবী স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়, সেই পৃথিবী ধ্বংসের পথেই হাঁটে। সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা শুধু ভোক্তা নই, শুধু দর্শক নই, আমরা অনুভব করতে পারি, কাঁদতে পারি, আশা করতে পারি।

সিনেমা শেষ হলে আলো জ্বলে ওঠে। আমরা আবার বাস্তবে ফিরি। কিন্তু পুরোপুরি ফিরি না। কিছু দৃশ্য, কিছু সংলাপ, কিছু নীরবতা আমাদের সঙ্গে থেকে যায়। ঠিক শৈশবের মতো। ঠিক সেই দিনের মতো, যখন তুমি এফডিসির গেটের ভেতরে ঢুকে ভেবেছিলে, এখানেই হয়তো তোমার পৃথিবী।

সেই পৃথিবী বদলে গেছে। কিন্তু সিনেমা বদলায়নি। কারণ, সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সব স্বপ্ন পূরণ না হলেও, স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটাই মানুষকে মানুষ করে তোলে।

*লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

[email protected]