প্রবাসী বাংলাদেশিদের কণ্ঠে কুয়েতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা

আমরা যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কুয়েতে থাকি, তাঁরা কিন্তু কুয়েতকে মধ্যপ্রাচ্যের ইউরোপ কিংবা আমেরিকার সঙ্গে তুলনা করে থাকি। বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কুয়েত কখনো অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালায়নি; বরং দেশটির মূল লক্ষ্য সব সময়ই ছিল তার নাগরিক ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়েও কুয়েত বারবার অকারণে হামলার শিকার হয়েছে। প্রথমে ১৯৯০ সালে ইরাকের আগ্রাসন, এরপর ২০০৩ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আর সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসী তৎপরতা। স্বাভাবিকভাবে এসব হামলার কোনো ন্যায্যতা নেই। প্রশ্ন থেকেই যায়, কুয়েত কীভাবে শান্তিতে বাঁচবে, যখন তাকে বারবার বিনা উসকানিতে আঘাত করা হয়?

কুয়েত ও জিসিসি দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে শুধু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। কারণ, তারা তাদের নিজস্ব অঞ্চলেও নিরাপদ নয়, আর এটাই নির্মম বাস্তবতা।

অদ্ভুত এক বৈপরীত্য হলো, যারা তাদের ধ্বংস করতে চায়, তারাই আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে ক্ষুব্ধ। অথচ এই সামরিক ঘাঁটিগুলোই তাদের রক্ষা করছে সেই প্রতিবেশীদের হাত থেকে, যারা সুযোগ পেলে তাদের ওপর আগ্রাসন চালাতে দ্বিধা করত না। কুয়েতি নাগরিকদের মতে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কখনো কুয়েতের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেনি। তারা কুয়েতের নারীদের নির্যাতন করেনি, তাদের তেলক্ষেত্রে আগুন লাগায়নি, তাদের দেশে ড্রোন হামলা চালায়নি।

যখন রিয়াদে বিস্ফোরণ হয়েছে, যখন কাতারে মানুষ আতঙ্কে দৌড়েছে; যখন জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে, এসব কি যুক্তরাষ্ট্র করেছে? না; বরং যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তার ছায়াতলে রেখেছে, যেন তারা তাদেরই একটি অংশ, এমনটা মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের নাগরিকেরা। সত্য বলতে কি, এই কঠিন সময়ে কুয়েতে বসবাসরত লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির জীবন আজ এই নিরাপত্তার ওপরই নির্ভরশীল। এই দেশ আমাদের কর্মসংস্থান দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে, পরিবারকে বাঁচার অবলম্বন দিয়েছে। আজ যখন সাইরেন বাজে, যখন ঘরে থাকার নির্দেশ আসে, যখন অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বুকেও ঠিক একই রকম ভয় আর দুশ্চিন্তা কাজ করে। আমরা জানি, কুয়েত নিরাপদ থাকলে আমরাও নিরাপদ। কুয়েত শান্তিতে থাকলে আমাদের পরিবারও শান্তিতে থাকে। এই দেশ শুধু আমাদের কর্মস্থল নয়, এটি আমাদের দ্বিতীয় ঘর। যুদ্ধ নয়, শান্তিই কুয়েতের পরিচয়।

কুয়েত কখনো অন্যদের ধ্বংস চায়নি। কুয়েত চায় সবার সঙ্গে শান্তি। কিন্তু শান্তির জন্যও প্রয়োজন নিরাপত্তা। ১৯৯০ সালের আগে কুয়েত বিশ্বাস করেছিল একটি বন্ধুদেশকে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশ দখল হয়ে যায়, সাত মাস ধরে চলেছিল এই দখলদারত্ব। সেই ক্ষত আজও কুয়েতের মানুষের মনে জীবন্ত। এই অভিজ্ঞতা কুয়েতকে শিখিয়েছে ভুল বিশ্বাসের মূল্য অনেক বড়। তাই আজ কুয়েত একা থাকতে পারে না। জিসিসি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটই তার অস্তিত্ব রক্ষার পথ বলে মনে করেন এখনকার জনগণ। ঐক্যই শক্তি প্রমাণ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। আজ কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান একটি পরিবারের মতো। এক দেশে যা ঘটে, তা সবার ওপর প্রভাব ফেলে। কুয়েত শুধু নিজের জন্য নয়, বিশ্বের সব দেশের জন্য শান্তি চায়। মানবিক সহায়তায় কুয়েত সব সময়ই এগিয়ে আসে। এটাই এই দেশের প্রকৃত পরিচয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির আকাশে দুশমনদের নিক্ষেপকারী ড্রোন ও মিসাইল। সেই দিনে সাইরেনের শব্দ ভেসে আসে। ঘরে থাকার নির্দেশ, মানুষের চোখে আতঙ্ক, কুয়েত যেন আরও একবার মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত হলো। দেশটি আজ ক্লান্ত।

বারবার নিজেকে প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত। বারবার আক্রমণের শিকার হয়ে ক্লান্ত।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

তবু কুয়েত ভেঙে পড়েনি। নাগরিক ও প্রবাসীরা একসঙ্গে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিদিন নামাজ শেষে আল্লাহর দরবারে দোয়া করা হয় শান্তির জন্য, হেফাজতের জন্য।

জিসিসি দেশসমূহ ও তাদের জনগণ নিরাপদের জন্য। সব নিরীহ মানুষ যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। যারা শত্রুতা ছড়ায়, তারা একদিন বুঝুক, শান্তিই একমাত্র পথ। কুয়েত আজও এই অঞ্চলের শান্তির বাতিঘর। আমি কোনো দেশকে শত্রু বা বন্ধু বলছি না। যে যার স্থান থেকে সঠিক। তবে আমরা প্রবাসী, যে যেই দেশেই অবস্থান করি না কেন, সেটা আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি বললে ভুল হবে না। আমরা শ্রম, ঘাম, মেধার মূল্য কিছুটা হলেও পেয়েছি এসব দেশ থেকে। কারণ, আজ আমাদের পরিবারের সচ্ছলতা, আমাদের উন্নতি, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি এই দেশ থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে। আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকাকে শক্তিশালী করতে যে রেমিট্যান্স জমা হয়েছে, সেটার বড় একটি অংশও কিন্তু এই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে পাঠানো। আমরা মনে করি, শান্তির প্রতীক এই কুয়েত, এই ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেও শান্তির আকাঙ্ক্ষা খুঁজি।

লেখক: মঈন উদ্দিন সরকার সুমন, সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত