ছবি: লেখক

স্কুলে সামার ভ্যাকেশন চলছে! সাধারণত এ সময়ে আমি দূরে বা কাছে কোথাও ঘুরতে যাই। কিন্তু এ বছর নানা কারণে বাড়িতেই সময় কাটাতে হচ্ছে। কদিন থেকে ঘরে বসেই একটি বিশেষ গাড়ি চলার শব্দে আমি বারবারই চমকে উঠছিলাম। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিল এক অস্বস্তি বোধ। কেন এমন হচ্ছে? একটু ভাবতেই, মন ফিরে গেল ২০ বছর পেছনে। একই সঙ্গে মস্তিষ্ক ২০ বছর আগের সেই ঘটনার সঙ্গে বর্তমানের যোগ টেনে মনে করিয়ে দিল আচরণবিদের এক থিওরির কথা, যার নাম ‘ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিং’। বর্তমান থেকে নয়, অতীত থেকেই শুরু করি লেখা।

তৃতীয় মিলিনিয়ামের গোড়ার দিকে আমরা প্রবাসী হিসেবে মার্কিন মুলুকে পা রাখি। তখনো কোনো আমেরিকান ডিগ্রি অর্জন করা হয়নি। জীবিকার জন্য কাজও করি যাচ্ছে তাই। হাতে টাকাপয়সা কম। যৎসামান্য খরচ করতে গেলেও মাথায় টাকা থেকে ডলারের রূপান্তরের অঙ্ক কষা শুরু হয়ে যায়।

ক্যালিফোর্নিয়ার অপ্রতুল পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কারণে এসেই কষ্টেসৃষ্টে একখানা গাড়ি কেনা হয়েছে। নতুন দেশ, প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন ব্যাপার দেখা এবং শেখা হয়। তবে ‘স্ট্রিট সুইপিং’-এর ব্যাপারটা আমার কাছে ছিল একেবারেই নতুন। নির্ধারিত দিনে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসে রাস্তা পরিষ্কারের গাড়ি। নিয়ম অনুযায়ী, এদিন গাড়ি রাস্তায় পার্ক করা যাবে না, করলে টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হবে। মেশিনে চালিত এ স্ট্রিট সুইপারে থাকে ঝাড়ুসদৃশ বিশাল ব্রাশ আর পানির স্প্রে। হয়তো ভারী গাড়ি বা পরিষ্কারে ব্যবহৃত চলন্ত মেশিনের কারণে এ গাড়ি যখন রাস্তায় আসে, তখন কানে বাজে এক বিশেষ শব্দ।

ছবি: লেখক

কাজের ব্যস্ততা এবং অনভ্যাসবশত আমরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলতাম রাস্তা পরিষ্কারের বিশেষ দিনটির কথা। ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্ট, ড্রাইভ-ওয়ে বলতে তেমন কিছু ছিল না। আমাদের গাড়িখানা তাই স্ট্রিটেই পার্ক করা হতো। গাড়ি নিয়ে কাজে যাওয়ার কথা না থাকলে স্ট্রিট সুইপিংয়ের দিন আমরা চার্চের পার্কিং লট বা নিকটস্থ অন্য কোনো পার্কিং লটে গাড়ি রেখে আসতাম। এরই মধ্যে দুই-দুবার স্ট্রিট ক্লিনিং টিকিট পাওয়া হয়ে গেছে, রাস্তা পরিষ্কারের দিন গাড়ি না সরানোর দায়ে। অনেক দিন আগের কথা তো, তবে যতটুকু মনে পড়ে, ৭০ ডলারের মতো দণ্ড দিতে হয়েছিল প্রতি টিকিটে। যা গায়ে লেগেছিল! সামান্য গাফিলতির দায়ে শুধু শুধু এ খরচা! এর পর থেকে এ গাড়ির শব্দ শুনলেই চমকে উঠতাম গাড়ি সরানো হয়েছে তো?

ফিরে আসি বর্তমানে, এখন যে বাড়িটিতে থাকি, তার বিপরীতে একটি স্কুল। স্কুল কর্তৃপক্ষ, স্কুল ক্যাম্পাসকে ঢেলে সাজাতে একটি বিরাট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এই সামারে। এ কাজের সমাপ্তি টানা হচ্ছে স্কুলের সামনের দিক ঘিরে বেষ্টনী বা ফেন্স বসানো এবং সামনের লনের শৈল্পিক সৌন্দর্যবর্ধনের মধ্য দিয়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ধুলা-মাটি এবং নির্মাণ সরঞ্জামের টুকটাক আবর্জনা হয়তো এসে পড়ছে সামনের ঝকঝকে নতুন আস্তর দেওয়া রাস্তায়। তাই কিছুক্ষণ পরপরই আমাদের রাস্তা পরিষ্কারের জন্য ঘুরে যাচ্ছে স্ট্রিট সুইপিংয়ের গাড়ি। এলাকার বাসিন্দা সবাই সচেতন। বাড়ির সামনের নিটোল উঠান এবং পার্ক করা ঝকঝকে গাড়ির বড় পূজারি তারা। তাই কোনো রকমের ঝুঁকিতে না গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ যা দরকার, তা-ই করেছে। ব্যুরো অব স্ট্রিট সার্ভিসেসের কাছে জানিয়েছে তাদের প্রয়োজনের কথা। স্কুলের সামনে দণ্ডায়মান স্ট্রিট সুইপিংয়ের গাড়ি তাই তার সহজাত শব্দ তুলে বারবার পাড়ি জমাচ্ছে একই পরিসীমায়। আমি যেহেতু বাসায়, তাই মাঝেমধ্যেই কানে যাচ্ছে শব্দ।

এবারে লেখার শুরুতে উল্লিখিত থিওরির ব্যাপারটা খোলাসা করতে যে একটু থিওরিচর্চায় বসতেই হয়! বিশেষজ্ঞদের সংজ্ঞায়, ‘শিক্ষা’ হচ্ছে এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা নতুন জ্ঞান, ব্যবহার, মতবাদ বা নবচিন্তা অর্জন করতে পারি। এ শিক্ষা আমরা আহরণ করতে পারি সচেতন মনে, আবার মনের অবচেতনেও। ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিং (যা কখনো কখনো পাভলোভিয়ান কন্ডিশনিংও নামেও পরিচিত) হলো একধরনের শেখার প্রক্রিয়া, যা আমরা অবচেতন মনেই অর্জন করি। বলা হয়, এটাই শেখার সহজতম পদ্ধতি। ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিংয়ে যখন একটি প্রাকৃতিক উদ্দীপনা এবং একটি পরিবেশগত উদ্দীপনা বারবার যুক্ত করা হয়, তখন পরিবেশগত উদ্দীপনা অবশেষে প্রাকৃতিক উদ্দীপনার অনুরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

ছবি: লেখক

ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিংয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণটি আসে, রাশিয়ান শারীর বিজ্ঞানী ইভান পাভলভের পরীক্ষা থেকে। তবে শত বছর আগের পাভলভের কুকুরের লালার পরিমাণ নির্ণয়ের পরীক্ষাটির চর্বিত চর্বণে না গিয়ে, বর্তমানের প্রতিদিনের জীবনের ঘটনা থেকে আমরা এ থিওরির হাজারো উদাহরণ পেতে পারি। ধরুন, একসময় কোনো এক প্রিয়জনের সঙ্গে হয়তো আপনার সুন্দর সম্পর্ক ছিল, অনেক বছর পর তাঁর ব্যবহৃত সুবাস আপনাকে আবার তাঁর কথাই মনে করিয়ে দেবে। আপনার মন ভালো লাগায় ভরে উঠবে। মানুষটির প্রিয় সুবাসকে আপনি মানুষটির সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছেন, ‘ভালো লাগা’ হচ্ছে একটা শিখে নেওয়া ব্যাপার। অনেক বছর পর সুবাসটি নাকে যেতেই মানুষটির অবর্তমানেও, আপনার মন ভালো লাগায় ভরে উঠছে।

ঠিক তেমনি, যখনই গাড়ির এ বিশেষ শব্দ আমার কানে যায়, আমি নিজ থেকেই অস্বস্তি বোধ করি। কারণ, গাড়ির শব্দের সঙ্গে আমি নিজ গাড়ি সরানোর তাগিদটা যুক্ত করে নিয়েছি। এখন গাড়ি ড্রাইভওয়েতে পার্ক করা থাকলেও, অথবা গাড়ি সরানোর প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অস্বস্তি বোধটি কাজ করছে ঠিকই।

সামার ভ্যাকেশন প্রায় শেষ, শুরু হতে যাচ্ছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিংয়ের এ আলোচনা আবার আমাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিল, শিক্ষক হিসেবে স্টুডেন্টদের সঙ্গে সহানুভূতি, ধৈর্য এবং আন্তরিক ব্যবহার কতটা জরুরি। এর মাধ্যমেই ওদের সঙ্গে আমার গড়ে উঠবে মেলবন্ধন। যে বন্ধনের জোরে ওরা পাবে ঘর ছেড়ে স্কুলে আসার অনুপ্রেরণা। কারণ, স্কুলে যাওয়া মানে, প্রিয় শিক্ষকের সান্নিধ্য পাওয়া। শিক্ষা হোক আনন্দের, বিদ্যাপীঠ হোক আনন্দমুখর!