জিতে যাক লাল–সবুজের বাংলাদেশ!
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে ভারত তাদের কূটনৈতিক পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে। কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। বিশ্বের বড় দুটি দেশের বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে এ ধরনের সতর্কতা মানে—নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তবে উন্নত বিশ্বেও নির্বাচনের আগে এ ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে, এটি কোনো দেশের পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ নয়। বরং রাষ্ট্রের নিয়মিত নাগরিক সুরক্ষা চর্চার অংশ। উন্নত গণতন্ত্রের শক্তি হলো ঝুঁকি স্বীকার করা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়া। ভোটের লাইনে দাঁড়ানো, আঙুলে কালি, রোদ–বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বুথে যাওয়া—এই ধৈর্যটা যাদের নিয়মিত দেখা যায়, সেখানে ভারত এগিয়ে। বাংলাদেশে মানুষ রাজনীতি সচেতন, কিন্তু ভোট দেওয়ার আগ্রহটা অনেক সময় পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। আর পাকিস্তানে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় নিরাপত্তা, আস্থা আর ব্যবস্থার প্রশ্নে মানুষ পিছিয়ে পড়ে। ভোটে ভোটারের অংশ নেওয়া নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয়।
বাংলাদেশে নির্বাচনী ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে ভোটার উপস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়। এ ক্ষেত্রে বর্জন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভোটার উপস্থিতির বছর: ১৯৭৩ প্রথম সাধারণ নির্বাচন—৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৯৭৯—৫১ দশমিক ৩ শতাংশ, ১৯৮৬—৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ১৯৯১—৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ, ১৯৯৬–এর ফেব্রুয়ারি—২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ (ভোট বর্জন করা হয়েছে), ১৯৯৬–এর জুন—৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০০১—৭৫ শতাংশ, ২০১৪—৪০ শতাংশ (বর্জন করা হয়েছে), ২০১৮—৮২ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২৪—৪১ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যতিক্রমীভাবে কম ভোটার উপস্থিতি একটি বড় বর্জনের প্রতিফলন ঘটায়। ২০১৮ সালের দিকে উচ্চ অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশের বেশি এবং ২০২৪ সালে তীব্র হ্রাস পায়, যার আংশিক কারণ ছিল বর্জন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। অতএব এবারের নির্বাচন সার্বিক বিবেচনায় এক অনন্য নির্বাচন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়া জমানার ইঙ্গিত বহন করছে। প্রসঙ্গত, বিশ্বের এক নম্বর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের দুই বছরের মাথায় জনগণ চুলচেরা বিশ্লেষণে নেমে পড়েছে। যার প্রভাব আমেরিকার আসন্ন (নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনে পড়তে পারে বলে ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজ-ইপসোসের এক জরিপে উঠে এসেছে। বেশির ভাগ আমেরিকান ট্রাম্পের বাক্স্বাধীনতা এবং ন্যায্য ন্যায়বিচারের প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন এবং বেশির ভাগই বলছেন যে তিনি তাঁর অফিসের ক্ষমতা প্রয়োগে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে ৪১ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন যে তাঁরা ট্রাম্পের কাজকে সমর্থন করেন, যেখানে ৫৯ শতাংশ অস্বীকার করেছেন। জরিপে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ এবং অনেকেই মার্কিন সরকার, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের ওপর তাঁর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের নির্বাচনী কাঠামোয় ভিন্নতা রয়েছে, তবু ক্ষমতার ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির একমাত্র পথ নির্বাচন। আর এশিয়ার এসব দেশে যেহেতু মাঝপথে জনগণের ভোটে ভারসাম্য বদলের সুযোগ নেই, সেহেতু পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারকে কোনো রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয় না। বিপরীতে হঠাৎ জনগণের ক্ষোভ দেখতে পায়—রাজপথে অসম্ভব সহিংসতায়। তাই এবারের গণভোট ও সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশকে জিততে হবে। ভোট ও গণতন্ত্র সময়ের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে আছে। যদি এখন সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুরক্ষায় অংশগ্রহণ না হয়; তাহলে গণতন্ত্র বাক্স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, ভোটের মূল্য, আস্থা ও প্রক্রিয়া ভেঙে পড়তে পারে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে জেগে উঠতে হবে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
গণতান্ত্রিক আস্থা ফিরিয়ে আনার এইতো সময়। নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক থেমে নেই। ইতিমধ্যে এক দল অন্য দলের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছে। তবে এটি সীমার মধ্যে থাকা গণতন্ত্রের অলংকার হয়ে উঠতে পারে। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম রাজনৈতিক দার্শনিক আইজাইয়া বার্লিন তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘Two concepts of liberty’তে লিখেছেন—স্বাধীনতা মানে ক্ষমতাকে সীমার মধ্যে রাখা। ভোট সেই সীমা তৈরি করে। সাবেক ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও আইআরসির (IRC–International Rescue Committee) সভাপতি ডেভিড মিলিব্যান্ড ২০২৬ সালের আইআরসির প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্বের সবচেয়ে উদ্বেগজনক মানবিক সংকটের একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানে তিনি বৈশ্বিক স্থিতাবস্থার ব্যর্থতাগুলো বিশ্বরাজনীতির রূপ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘নতুন বিশ্বব্যাধি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বৈশ্বিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কী ঘটছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, বর্তমানে এসব অঞ্চলে ২৩৯ মিলিয়ন মানুষ মানবিক চাহিদার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এসব দেশে স্রেফ দুই পক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বহুমুখী আন্তর্জাতিকীকরণ ক্ষমতার খেলায় দাবাড় ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে।
‘নতুন বিশ্বব্যাধি’ হলো বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সুরক্ষার চেয়ে লাভের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব। এতে করে ভূরাজনীতি কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বেসামরিক মানুষদের জীবনকে প্রভাবিত করছে, যারা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশ যেমন ফিলিস্তিন অঞ্চল, দক্ষিণ সুদান, ইথিওপিয়া, হাইতি, মিয়ানমার, কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্রও রয়েছে, যা বিশ্ব জনসংখ্যার ১২ শতাংশ। ভূরাজনীতি শুধু সরকারের খেলা নয়, জনগণই তার ভিত্তি। বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে সাইবার হামলা-পাল্টা হামলা-মামলা ও জনগণের মাঝে ভুল তথ্য ছড়ানো রাষ্ট্রের দুর্বলতা। আমরা বনাম তারা বয়ান ছড়ানো, ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে গুজব, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, উসকানিমূলক পোস্ট এড়িয়ে চলা সবার নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের মতো দেশে জনগণের ভূমিকা সচেতন ও দায়িত্বশীল না হলে কোনো কৌশলই টেকসই হবে না। নিরাপদ থাকুক বাংলার জনগণ—জিতে যাক লাল–সবুজের বাংলাদেশ।