মেলবোর্নে ‘হাওয়া’র দর্শক
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের গ্রামের নাম বাড়াদি। কুষ্টিয়া শহরতলির একটা গ্রাম। ঠিক পৌরসভার বাইরের একটা গ্রাম। তাই শহর ও গ্রামের একটা দারুণ কনট্রাস্ট আছে সেখানে। গ্রামের মধ্য দিয়ে কোথাও পাকা রাস্তা, আবার কোথাও হেরিং বন্ডের ইটের রাস্তা। আর বাড়িগুলোর পেছন থেকে অবারিত সবুজের সমারোহ। যত দূর দৃষ্টি যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। সেখানে বিভিন্ন মৌসুমে ফলে হরেক রকমের শস্য। গ্রামে বিদ্যুৎ তখনো সেভাবে তার বিস্তার করতে পারেনি। কয়েকটা বাড়িতে সাদাকালো টেলিভিশন আর বেতারই বিনোদনের মাধ্যম। এর বাইরে সামান্য কিছু ভ্যান বা রিকশাভাড়া দিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে বাংলাদেশের সিনেমা দেখা যায়। আর বছরে এক–দুবার জগতি রেলবাজারের একমাত্র ভিডিওর দোকান থেকে ভিসিআর ভাড়া করে এনে ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি ছবি দেখা হতো।

কুষ্টিয়া শহরে তখন চারটি সিনেমা হল ছিল। কুষ্টিয়া–ঝিনাইদহ রাস্তায় কুষ্টিয়া কোর্টের বিপরীতে বাণী, কুষ্টিয়ার তখনকার বাসস্ট্যান্ডের ভেতরে ছিল বনানী, শহরের প্রাণকেন্দ্র নবাব সিরাজ উদদৌলা রাস্তায় কুষ্টিয়া মিউনিসিপ্যালিটি মার্কেটের বিপরীতে ছিল কেয়া আর কুষ্টিয়ার ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র বড় বাজারের ভেতরে ছিল রক্সি সিনেমা হল। সিনেমার প্রকারভেদের দিক দিয়ে বিভিন্ন হলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সিনেমা আসত। দর্শকদের ধরে রাখতে সাধারণত প্রতিটি সিনেমা হলে আলাদা আলাদা সিনেমা নিয়ে আসা হতো। তবে গুণগত মানের বিচারে বা জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বাণীতে সাধারণত একটু সস্তা সিনেমা, কেয়াতে বেশির ভাগ সময় ইংরেজি সিনেমা, রক্সিতেও একটু সস্তা বাংলা সিনেমা আর বনানীতে নিয়ে আসা হতো সবচেয়ে ভালো সিনেমা।

যা–ই হোক, আব্বা মোটামুটি সব হলে গিয়েই সিনেমা দেখতেন। কিন্তু মায়েরা সব সময়ই বেছে নিতেন বাণী হল। কারণ, বাণী হল ছিল আমাদের গ্রাম থেকে সবচেয়ে কাছে। আশপাশের কয়েক বাড়ির খালা, চাচিরা পরিকল্পনা করে একদিন সবাই মিলে যেতেন সিনেমা দেখতে। আমরা ছোটরাও যেতাম মায়েদের সঙ্গে। আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে একটা দৃশ্য পরিষ্কার দেখতে পাই। মায়েরা সাধারণত দিনের সব কাজ শেষ করে সিনেমা দেখতে যেতেন সন্ধ্যার শোতে। তাই সিনেমা হলে গিয়ে আমরা ছোটরা সাধারণত ঘুমিয়ে পড়তাম। সেদিনও যথারীতি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ বিকট গর্জনে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলেই দেখি একটা বিশাল বাঘ গাছের ওপর থেকে গড়াতে গড়াতে নামছে। দেখেই তারস্বরে এক চিৎকার দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম আর দুই হাত দিয়ে জোরে কান চেপে ধরলাম। সেটা ছিল ‘রূপবান’ সিনেমার একটা দৃশ্য। ছোটবেলার সিনেমা দেখার এ স্মৃতি সারা জীবন আমার স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

যেকোনো হলে নতুন সিনেমা এলেই গ্রামে গ্রামে মাইকিং করা হতো। একটা রিকশার সামনে ও পেছনে দুটি মাইক বসিয়ে দেওয়া হতো। আর রিকশাটা সেই সিনেমার পোস্টার দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হতো। আমাদের গ্রামে ঢুকলেই আমরা দল বেঁধে সেই রিকশার পিছু নিতাম। এভাবে আমরা রিকশার পেছনে পেছনে সারা গ্রাম চক্কর দিতাম। আর বাড়ি ফিরলেই মা জিজ্ঞেস করতেন সিনেমাটা কেমন, কে কে আছে, কোনো হলে আসছে এসব। আমরা সেগুলোর বিশদ বর্ণনা দিতাম। সিনেমা দেখে দেখে আমরা আমাদের দৈনিক খেলার মধ্যে সিনেমার প্লটকে কেন্দ্র করেও খেলাধুলা করতাম। কেউ ভিলেন, কেউ নায়ক, কেউ পুলিশ হতাম। তবে সবাই চাইত পুলিশ হতে। কারণ, পুলিশই এসে ভিলেনকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়। আর তখনকার সিনেমার মারামারির দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আমাদের খুব টানত। সেই ‘ঢিসটিক ঢিসটিক’ শব্দ আমাদের প্রজন্ম বোধ হয় কখনোই ভুলতে পারবে না। আর মারের স্লো মোশনের দৃশ্যগুলোর অভিনয় করে আমরা খুবই আনন্দ পেতাম। আর গানগুলোও ফিরত মুখে মুখে। এর বাইরে সিনেমার বিভিন্ন জুটি নিয়ে মুখে মুখে তৈরি হতো ছড়া। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল, ‘রাজ্জাক–শাবানা, ফুইরে গেলে পাবা না।’ আর সিনেমার মাইকিংটা তো এখনো আমাদের কানে বাজে ‘আসিতেছে আসিতেছে! হ্যাঁ ভাই, কুষ্টিয়ার বাণী সিনেমায়...’

সিডনির ম্যাকার্থার স্কয়ারের ইভেন্ট সিনেমা হলের দর্শক
ছবি: সংগৃহীত

বাংলা সিনেমার এসব গল্প এখন ইতিহাস। একসময় বাংলা সিনেমা তার জৌলুশ হারিয়ে ফেলল। অন্যদিকে আকাশ–সংস্কৃতি সবকিছুকে বোকা বাক্সের (টেলিভিশনের) মধ্যে এনে দিল। আর দর্শক হারিয়ে হলগুলো একে একে বন্ধ হতে থাকল। এখন কুষ্টিয়ার চারটি হলের চারটিই বন্ধ হয়ে গেছে। বাণী হল এখন কুষ্টিয়া টাউন হল, বনানী বন্ধ, কেয়া হল ভেঙে বহুতল ইমারত বানানো হয়েছে। শুনেছি রক্সি হলেরও একই পরিণতি হয়েছে। আমাদের স্মৃতিতে শেষ দেখা সিনেমা হচ্ছে ‘টাইটানিক’। বন্ধুরা মিলে বনানী হলে সিনেমা দেখে বাইরে এসে দেখি আমাদের কলেজের অনেক বান্ধবীই এসেছে তাদের পরিবারের সঙ্গে। এমনকি ভিড়ের মধ্যে দেখি আমাদের কলেজের বায়োলজির এক স্যারও এসেছেন। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করে রাখা প্রয়োজন। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা ছিল ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। আমার মনে হয়, এই সিনেমা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের এক কিংবদন্তির নাম। কত গল্প, কত যে জনশ্রুতি তৈরি হয়েছিল, তার ইয়ত্তা নেই। কে কতবার দেখেছে, এটা ছিল আড্ডার অন্যতম বিষয়। যশোরের মণিহার সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে গিয়ে এক সন্তানসম্ভবা নারী এক মেয়ের জন্ম দেন হলের মধ্যে। সিনেমার নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ও নায়িকা অঞ্জু ঘোষ নাকি সেই মেয়েকে দেখতে এসে একটা গলার হার উপহার দিয়েছিলেন। আর সেই মেয়ের নামও নাকি রাখা হয়েছিল জোসনা। এমন আরও কতশত গল্প মুখে মুখে ফিরত।

এরপর অনেক সময় গড়িয়েছে কিন্তু সেভাবে আর বাংলা সিনেমার খোঁজ রাখা হয়নি। অন্তর্জালের এ যুগে এখন সবকিছুই মুঠোফোনের মাধ্যমে আমাদের হাতের মুঠোয়। একদিন হঠাৎ ফেসবুকে ‘হাওয়া’ সিনেমার পোস্টারটা দেখলাম। পোস্টারটা যথেষ্ট আগ্রহোদ্দীপক। এরপর ট্রেলারটা দেখলাম। ট্রেলারে যতটুকু দেখা গেল, বোঝা গেল, এটা একান্তই আমাদের সিনেমা। সিনেমার দৃশ্যায়ন, ভাষা, মেকআপ—সব কটি চরিত্রকে যেন একেবারে আসল জেলে বানিয়ে দিয়েছে। এরপর বের হলো আমাদের সময়কার হাতে আঁকা পোস্টারের মতো সব কটি চরিত্রের একটা পোস্টার। সিনেমার পোস্টারের পর মুক্তি পেল সেই বিখ্যাত গান ‘সাদা সাদা কালা কালা’। যা এখন বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে মুখে ফিরছে। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জীবনেও এ সিনেমার হাওয়া লেগেছে। ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেয়েছে ‘হাওয়া’। সেই সূত্র ধরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নেও মুক্তি পেয়েছে ‘হাওয়া’ এবং সব কটি শোর টিকিট আগাম বিক্রি হয়ে গেছে। সবাই বন্ধুবান্ধব নিয়ে দলে দলে সিনেমাটি দেখছে।

বাংলাদেশে তো এখন বাংলা সিনেমার সুবাতাস বইছে। আগেকার দিনের মতো রিকশায় করে চলছে মাইকিং। ইতিমধ্যেই ‘হাওয়া’ সিনেমার থিমকে কেন্দ্র করে বাজারে এসেছে টি–শার্ট, শাড়ি ও চশমা। ‘হাওয়া’ সিনেমার গানকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে অনেক অনেক ভিডিও। বলতে গেলে এখন পুরো বাংলাদেশ ‘হাওয়া’জ্বরে আক্রান্ত। ছোটবেলায় দেখতাম কারও কোনো ব্যতিক্রম কাজে দাদি–নানিরা বলতেন বদ হাওয়া লেগেছে। সেদিক দিয়ে বিচার করলে বাংলাদেশের গায়ে এখন ভালো হাওয়া লেগেছে বলা যায় নিঃসন্দেহে। কয়েক সপ্তাহ পার করে এখনো হলগুলো হাউসফুল যাচ্ছে। আগেকার দিনের মতো মানুষ টিকিট না পেয়ে ব্ল্যাকে টিকিট কিনে পর্যন্ত ‘হাওয়া’ দেখতে আসছে। ব্যক্তিগতভাবে এই সিনেমা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। একান্ত আমাদের কাহিনি।

বঙ্গীয় বদ্বীপের অন্যতম অনুষঙ্গ বঙ্গোপসাগর। আর তাকে কেন্দ্র করেই জীবিকা নির্বাহ করে বাংলাদেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর আছে নিজস্ব মিথ ও বিশ্বাস, যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। নদী ও সাগরকেন্দ্রিক আমাদের এই বদ্বীপের আছে নিজস্ব লোককথা ও বিশ্বাস। এসব লোককথা ও জীবনাচারকে একবিংশ শতাব্দীর উপযুক্ত করে দুর্দান্ত চিত্রায়ণ করেছেন মেজবাউর রহমান তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’তে। চরিত্রগুলোর পোশাক ও মুখের ভাষা শুনে মনে হয়েছে, তারা আসলেই জেলে সম্প্রদায়ের লোক। সিনেমার স্পেশাল ইফেক্ট ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের কথা বলতে হয় আলাদা করে।

‘হাওয়া’ ফিরিয়ে এনেছে দল বেঁধে সিনেমা দেখার দিন
ছবি: সংগৃহীত

সিনেমাটা শেষ করে আমরা যখন সিডনির ম্যাকার্থার স্কোয়ারে অবস্থিত ইভেন্টস সিনেমা থেকে বের হলাম, তখনো আমার মাথা পুরোপুরি হ্যাং হয়ে আছে। বাইরে দাঁড়ানো ‘হাওয়া’ সিনেমার পরিবেশক এক ভাইকে পেয়ে ধন্যবাদ দিলাম। আমার অনুভূতি শুনে তিনি বললেন, ‘ভালো না খারাপ হ্যাং, ভাই।’ আমি বললাম, ভাই, মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্রতিটি দৃশ্য গিলেছি। সিনেমা শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ বসে ছিলাম যে আর কিছু দেখায় কি না। সবশেষে নিজেকে কক্সবাজারের জেলেপল্লি থেকে সিডনির ক্যাম্বেলটাউনে আবিষ্কার করলাম। এই সিনেমার একটা ডায়ালগ দিয়ে লেখাটা শেষ করি, ‘সমুদ্রে সাইন্স চলে না।’ ‘হাওয়া’ যেভাবে বাংলা সিনেমার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনেছে, আশা করব, সেটা চলচ্চিত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। মানুষ আবারও হলমুখী হবে। সুস্থ বিনোদন ধারায় ফিরবে বাংলা চলচ্চিত্র তথা সংস্কৃতি। কারণ, বলা হয়ে থাকে, চলচ্চিত্র সমাজের আয়না। পরিশেষে পুরো ‘হাওয়া’ টিমের জন্য শুভকামনা ও অবিরাম ভালোবাসা। পথ প্রোডাকশনকে ধন্যবাদ অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের ‘হাওয়া’ সিনেমাটি উপভোগ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।