কেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি বিভাগ অপরিহার্য

ছবি বাসস

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দেশের শিল্প, ভাষা ও সংস্কৃতির রক্ষণাবেক্ষণের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে আবৃত্তি বিভাগ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল একটি বিভাগ বাতিলের ঘটনা নয়; এটি ভাষাচর্চা ও পরিমিত বাচনশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নষ্ট করার শামিল।

ভাষা মানুষের চিন্তা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। যুক্তি, সংলাপ, মতভেদ কিংবা সমঝোতা—সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে ভাষা। অথচ আমাদের সাম্প্রতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় ভাষার ব্যবহার ক্রমেই অশ্রুতিমধুর, অশালীন ও সহিংস হয়ে উঠছে। রাজনীতির ভাষা হোক, টেলিভিশনের টক শো হোক কিংবা নাটক—সর্বত্র চিৎকার, আক্রমণ ও অপরিমিত বাক্যই যেন প্রধান ভঙ্গি।

এই প্রেক্ষাপটে আবৃত্তি একটি বিকল্প ও প্রতিরোধী চর্চা। আবৃত্তি মানুষকে শেখায়—

—কীভাবে ধীরে কথা বলতে হয়

—কীভাবে শব্দের ভার ও দায়িত্ব নিতে হয়

—কীভাবে আবেগকে সংযত করে প্রকাশ করতে হয়

—কীভাবে ভাষাকে সুন্দর, শুদ্ধ ও শ্রুতিমধুর রাখা যায়

আবৃত্তি কেবল কবিতা পাঠ নয়; এটি বাচনশিল্পের প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় প্রমিত উচ্চারণ, শ্বাস-নিয়ন্ত্রণ, ছন্দবোধ ও ভাবপ্রকাশের শালীনতা। একজন নাট্যশিল্পী, উপস্থাপক, শিক্ষক, এমনকি রাজনীতিবিদেরও ভাষা-শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে আবৃত্তি চর্চার মধ্য দিয়ে।

একসময় টেলিভিশন নাটক মধ্যবিত্ত সমাজের রুচিশীল বিনোদনের জায়গা ছিল। আজ সেই জায়গায় ভাষা ও আচরণের অবক্ষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। টক শোগুলোতে যুক্তির বদলে চেঁচামেচি, আলোচনার বদলে উত্তেজনাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এর মূল কারণ—আমরা ভাষার শালীন ব্যবহার শেখার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা হারাচ্ছি।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আবৃত্তি বিভাগ সেই চর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সেখানে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, গবেষণা ও মঞ্চচর্চার মাধ্যমে ভাষার সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা হতো। সেই বিভাগ তুলে দেওয়া মানে—

ভাষার সৌন্দর্যচর্চাকে প্রান্তিক করে দেওয়া,

পরিমিত বাচনশিল্পকে অপ্রয়োজনীয় বলে চিহ্নিত করা।

একটি রাষ্ট্র যদি তার ভাষাকে, তার উচ্চারণকে, তার বাচনসংস্কৃতিকে গুরুত্ব না দেয়—তবে সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে শব্দহীন হয়ে পড়ে, চিন্তাহীন হয়ে পড়ে।

অতএব আবেগ নয়, যুক্তির জায়গা থেকেই বলা দরকার:

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি বিভাগ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

ভাষা, যুক্তি ও সৌন্দর্যের স্বার্থেই প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বাচনসংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থেই প্রয়োজন।

এটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রশ্ন নয়।

এটি আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]