অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশ থেকে ফিরে!
৪৭, ৫২, ৭১, ২৪—একেকটা সংখ্যা হাজারো মানুষের রক্তস্নাত অধ্যায়। আর এই পটপরিবর্তনে বাংলাদেশের ছাত্র–জনতা ও খেটে খাওয়া আমজনতার ন্যূনতম বেঁচে থাকার সুযোগ বারবার হাতছাড়া হয়েছে। আহত পাখির মতো হাজারো মানুষ রাজপথ থেকে আশাহত হয়ে নীড়ে ফিরেছে। অবাক করা জুলাই বিপ্লবের এক বছর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। সকাল-দুপুর-রাতে যেখানে গিয়েছি, একমাত্র বিষয়—দেশে কী হচ্ছে, কখন শান্তি হবে, কীভাবে সার্টিফিকেটধারী বেকার যুবক-যুবতীরা চাকুরি পাবেন। পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসবে। সব মিলে মনে হয়েছে, এক অজানা গন্তব্যে ছুটছে দেশ।
বাংলাদেশের বর্তমান কাণ্ডারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এক জাতিকে ঠেনে তুলতে মুহাম্মদ ইউনূস যারপরনাই চেষ্টা করছেন। এমন কোনো দাবি নেই, যা নিয়ে প্রতিদিন কোনো না কোনো সংগঠন মাঠে নামছে না। রাজনৈতিক দলগুলো তো ইউনূস সরকারের পিছু ছাড়ছে না। পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যা–অধুষিত এ দেশ আসলে কোন পদ্ধতিতে চলছে, তা বোধগম্য নয়। গত ১৬ বছরের শাসন, দমন-পীড়নের হাত থেকে আপাতত জনগণ মুক্ত হলেও সরকারি অফিস-আদালতগুলোতে সমানতালে হয়রানি চলছে। থেমে নেই বহুল পরিচিত পেশিশক্তির বাণিজ্যও, যার প্রত্যক্ষ নিদর্শন দেশের প্রতিটি পরতে পরতে স্পষ্ট দেখা যায়। দেশে উৎপাদিত পণ্য, বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত দামে বাজার সয়লাভ। সব সময় সুবিধাভোগি একশ্রণির মানুষকে ব্যাগভর্তি বাজার কিনতে দেখা যায়।
বেসরকারি এক হিসাবে দেখা যায়, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। প্রতিবছর নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছেন ২২ লাখ যুবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যে শোনা যায়, ভেতরের মানুষটাকে জাগ্রত করুন, কিছু একটা শুরু করুন, কোনো কিছুকে না বলা যাবে না—খুব সুন্দর কথা। অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মিথ্যা আশ্বাসের ফুলঝুড়ি। নির্মম সত্যকে পাশ কাটিয়ে এসব আশার বাণীতে এখন সাধারণ মানুষের মন গলে না। মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। রাজনীতির বলী হয়ে নেতা-কর্মী বিগত সরকারের কারাভোগের ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ ফাঁকে নির্বাচনী ট্রেন চালু হয়েছে। তবে হ্যাঁ, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অনেককে বলতে শুনেছি, ‘হাসিনা গেছে, এতেই খুশি।’ আবার বিপরীত কথাও জোড়েশোরে শোনা যাচ্ছে, ‘আগেই ভালো ছিলাম।’ এত অল্প সময়ে মানুষ বিরক্ত হয়ে উঠেছে, তা নতুন বাংলাদেশের জন্য শুভ সংবাদ নয়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
দেশের অধিকাংশ মানুষ পলাতক হাসিনা সরকারের মেগা প্রকল্পের সুফল-কুফলের সমানতালে ভাগিদার হয়েছেন, যা বুঝতে কষ্ট হয়নি। যেহেতু দীর্ঘ এক মাস ঢাকা-চট্রগ্রামে ছিলাম বেশির ভাগ সময়। শুধু একটা উদাহরণ টানছি—চট্টগ্রামে মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে গিয়ে ইট-পাথরের ফ্লাইওভার (দেওয়ান হাট-স্টেশন রোড) তৈরি, যা চট্টগ্রামে আগামী প্রজন্মকে আকাশ দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। এককথায়, পাহাড়-নদী সাগরের সীমানায় গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরকে দিনদুপুরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ বিপুল টাকা কাদের পকেটে ঢুকেছে, তাঁদের জাতির সামনে আইনের কাঠগড়ায় বিচার সময়ের দাবি। দেশজুড়ে যুবকদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। তবু কিছু যুবককে দেখেছি, কে কী বলবেন, পেছনে না তাকিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য সাহস নিয়ে (বাইকচালক, ক্ষুদ্র কৃষি খামার, সফটওয়্যার ব্যবসা) সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বের ১ নম্বর দূষিত শহর এখন ঢাকা; যত্রতত্র থুতু ফেলা, মশা-মাছি, ধুলাবালুর শহর। ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরকে মনে হলো অনিরাপদ একমাত্র বিমানবন্দর। সম্প্রতি বিমানবন্দরের ভেতরে পুড়ে যাওয়া কয়লার স্তূপ পরিষ্কার করা হয়েছে অনেক পরে। এ দৃশ্য দেখে আমার মনে হলো, একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বিমানবন্দর থেকে ফিরতি বিমানে চলে যাবেন। একমাত্র আন্তর্জাতিক এ বিমানবন্দরে যাত্রীর চেয়ে কর্মচারী–কর্মকতা বেশি, সবার মধ্যে যেন শিক্ষানবিশ ভাব। দেশে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবার মধ্যে একধরনের প্রবল কর্তৃত্ববাদের ভাব স্পষ্ট, যা ইনসাফ বা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। যেহেতু প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে এখনো হিন্দু-মুসলিম–বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার সহাবস্থান দৃশ্যমান। তাই সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে আওয়াজ তুলুন—সত্যই মুক্তি আসুক মানুষের। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
পদার্থবিদেরা সময়কে অতীত থেকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের ঘটনাবলির অগ্রগতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। সময়কে বাস্তবতার চতুর্থ মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যা ত্রিমাত্রিক স্থানের ঘটনাবলি বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়। এটি এমন কিছু নয়, যা আমরা দেখতে, স্পর্শ করতে বা স্বাদ নিতে পারি, তবে আমরা এর উত্তরণ পরিমাপ করতে পারি। সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়—এই মর্মকথা বাঙালি জাতি বারবার বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও আমরা অর্থহীন প্রশ্ন তুলে জাতিকে বিভক্ত করতে ব্যস্ত ছিলাম। লাখো শহীদের রক্তে কেনা এ দেশে বারবার মানুষ আশাহত হয়েছে। সংখ্যার ফ্রেমে বেঁধে রাখা আবেগ-উচ্ছ্বাসকে বাস্তবতার নিরিখে চলতে দিয়ে উন্মুক্ত, বৈষম্যহীন নতুন এক বাংলাদেশের অপেক্ষায় সবাই।