সাদামাটা প্রবাসজীবনে দেশি সুরের রং ছোঁয়ানোর প্রয়াসে নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠী
চেনা পরিসর, পরিবার, আত্মীয় আর বন্ধুদের রেখে যখন কেউ প্রবাসজীবনে প্রবেশ করেন, বেশির ভাগ সময়ই তাঁদের হঠাৎ করেই একাকিত্ব অনুভব হয়। প্রবাসজীবন মানেই নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই। আর এই লড়াই অনেকটাই সহজ হয়ে যায়, যখন সেই বিদেশবিভুঁইতে কিছু বন্ধু তৈরি হয়। সেই বন্ধুত্বের জোরেই মানুষ পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিতে। তখন জায়গার থেকেও আপন হয়ে ওঠে সম্পর্কগুলো। এই বন্ধুত্বের উদ্যাপনেই নাইরোবি শিল্পগোষ্ঠীর আয়োজনে গত রোববার ১ নভেম্বর কিছু বন্ধু একত্র হয়েছিল৷
কারা এই নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠী?
কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি ভৌগলিকভাবে পূর্ব আফ্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ যেখানে জাতিসংঘের সদরদপ্তরসহ আরো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এর উপস্থিতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের অনেক পেশাজীবী কাজ করছেন। রয়েছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অফিস এবং আরও নানা পেশায় নিয়োজিত বাংলাদেশি মানুষ।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এরই ধারাবাহিকতায় কোভিডের পরপর বাংলাদেশের কয়েকজন প্রায় একই সময়ে পেশাগত কাজের প্রয়োজনে পরিবারসহ পাড়ি জমায় কেনিয়ার নাইরোবিতে। সেই কিছু মানুষের পরস্পরের সঙ্গে দেখা, কথার একপর্যায়ে তারা আবিষ্কার করে যে তাদের নিজেদের মধ্যে একটা বিষয়ে ভীষণ মিল। আর তা হলো, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও একাত্মতা। তাদের আড্ডা মিলনের একটা বড় সময় কেটে যায় বাংলা সংগীত চর্চায়। একসঙ্গে গান করতে করতেই খুবই ঘরোয়াভাবে হাসি খেলার ছলেই গড়ে ওঠে ‘নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠী’। পরবর্তী সময়ে এ দলে যোগ হয় হায়দ্রাবাদ থেকে আসা আরেকজন। এভাবেই সুরের বন্ধন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে নাইরোবিতে থাকা অন্য দেশের বন্ধুদের মধ্যেও।
নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠীর এক সদস্য মিথুন মনে করেন, ‘প্রবাসে নিজের সন্তানদের বড় করতে হলে, নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো বিকল্প নেই। শিশুরা দেখে শেখে। তাই সংস্কৃতি চর্চার প্রথম ধাপ হিসেবে তাদেরকে এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া বেশি জরুরি। আর সেটা করতেই বাড়িতে, কোথাও যাওয়ার সময় বাংলা গান শোনা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওদের নিয়ে যাওয়া, কিংবা নিজেরাই এসবের চর্চা করা শুরু করলাম, যেন ওদের এসবকিছুর সঙ্গে পরিচিতি ঘটে। ধীরে ধীরে তারা নিজেরাও আগ্রহী হয়ে ওঠে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এবং সংস্কৃতির প্রতি।’
এ গোষ্ঠীর আরেক সদস্য ডিওর পেশাই ছিল বাংলা গানকে ঘিরে। জীবনের বাস্তবতায় যখন তিনি পাড়ি জমালেন কেনিয়াতে এবং পেয়ে গেলেন গানপাগল কিছু মানুষকে—তখন রুটিনের বাইরের এই দল এবং সুরকে আপন না করে নেওয়ার কোনো কারণই রইল না। তিনি বলেন, ‘বিদেশে থাকলে নিজের মতো মনমানসিকতার বন্ধু খুঁজে পাওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন। আর সেই বন্ধুরা যখন এত ট্যালেন্টেড হয়, তখন দেশ থেকে দূরে থাকার কষ্টটাও একটু কম লাগে।’
নিজেদের বাড়িতে গানের চর্চার পাশাপাশি নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজন করা শুরু করে ‘ব্যাকইয়ার্ড জ্যামিং সেশন’। সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় বাঙালি, বিদেশি নানা রকম সংস্কৃতিমনা বন্ধুদের। শুধু গোষ্ঠীর শিল্পীরাই নন, এ আয়োজনে পরিবেশনায় সব সময়ই অংশ নেন অন্যান্য দেশের বন্ধুরাও। এভাবেই নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠীর একেকটি আয়োজন হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।
নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা নিয়মিতভাবেই কেনিয়াতে আয়োজিত সাংস্কৃতিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। তবে এই ‘ব্যাকইয়ার্ড জ্যামিং’ তাদের একেবারে নিজস্ব প্রয়াস । এটি তাদের তৃতীয় প্রযোজনা।
প্রতিবারই কোনো না কোনো বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে এই গোষ্ঠী । প্রথমবারের আয়োজন ছিল তাদের খুব কাছের বন্ধুকে বিদায় দেওয়ার প্রাক্কালে আর দ্বিতীয় পর্বের নাম ছিল ঝালমুড়ি—যেখানে বাংলার নানা ধারার সংগীত ও নৃত্যের মিশেল ঘটেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এবারের পর্বের থিম ছিল ‘বন্ধু’। বন্ধুত্বের উদ্যাপনে নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠী পেয়েছে বিরাট সাড়া। এক অদ্ভুত সুন্দর বিকেলে জড়ো হয়েছিল বাংলাদেশ, ভারত, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইথিওপিয়া, যুক্তরাজ্য থেকে নাইরোবিতে আসা বিভিন্ন পেশার অতিথিরা। সকলে মিলে বলে উঠেছে—‘অনেক দিন পর আবার চেনা মুখ, বন্ধু কী খবর মুহূর্ত বলুক’! বন্ধুত্বের সুরে একেকটা টান দিয়েছে ভালো লাগা। মনে করিয়ে দিয়েছে নতুন পুরোনো সব বন্ধুদের। তাই তো পড়ন্ত বিকেলের শেষ পরিবেশনায় যখন বন্ধুরা গেয়ে উঠল- ‘হায় মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি গেলেম কে কোথায়, আবার দেখা যদি হলো সখা প্রাণের মাঝে আয়’, তখন মনটা সত্যি ভিজে উঠেছিল, অনেকের চোখের কোণে চিকচিক করে উঠেছিল ভালোবাসার অশ্রু! কিন্তু দিনশেষে আমাদের সবার অর্জন এই যে- আমাদের হরেক রকম বন্ধু আছে। যাদের বলা যায়—‘তোরা ছিলি, তোরা আছিস, জানি তোরাই থাকবি”!
নাইরোবি শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা হলেন: ডিও, অপরাজিতা, কল্প, মিথুন, অনির্বাণ, সোবহা, হর্ষ, নাতাশা, শাহির, বনানী ও জহির।