তুষারশুভ্র উইনিপেগে তপ্ত পিঠার ঘ্রাণ: প্রবাসী বাংলাদেশিদের জমজমাট পিঠা উৎসব

ছবি: লেখকের পাঠানো

কানাডার ম্যানিটোবা প্রদেশ এখন বরফে ঢাকা, হাড়কাঁপানো শীতে জবুথবু জনজীবন। কিন্তু এই তীব্র শৈত্যপ্রবাহও দমাতে পারেনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রাণের টানকে। উইনিপেগের কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে গতকাল রোববার (১১ জানুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা মেতে উঠেছিলেন ঐতিহ্যবাহী ‘পিঠা উৎসবে’। ভিনদেশের মাটিতে একটুকরা বাংলাদেশ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল এই প্রাণের মেলায়।

উইনিপেগের স্থানীয় একটি মসজিদের জিমনেসিয়ামে ‘বন্ধন-কোঅপারেটিভ সোসাইটি’ উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবে অংশ নেন শত শত বাংলাদেশি। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বিকেল থেকেই মানুষের ঢল নামে অনুষ্ঠানস্থলে। তুষারপাতের কারণে যেখানে প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হয় না, সেখানে এই ইনডোর আয়োজন পরিণত হয়েছিল এক মহামিলন মেলায়।

হরেক পিঠার পসরা

উৎসবে কমিউনিটির শৌখিন পিঠা বিক্রেতারা ২৫ থেকে ৩০ ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠার পসরা সাজিয়ে বসেন। এর মধ্যে ছিল ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা, চিতই, পাটিসাপটা, নকশি পিঠা, পুলি, দুধরাজ, মোয়া, কালাইপুরি ও রসগজা। শুধু পিঠাই নয়, অতিথিদের জন্য আরও ছিল বাহারি মিষ্টি, রসমালাই, বগুড়ার স্বরের দই, বিরিয়ানি, চিকেন, ঝাল হালিম ও গরম চা। পিঠাগুলোর দাম রাখা হয়েছিল ১ থেকে ৫ ডলারের মধ্যে, যা ছিল সবার সাধ্যের ভেতরে।

ছবি: লেখকের পাঠানো

দেশীয় আমেজ ও নতুন প্রজন্ম

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ছোট ছোট শিশুর উপস্থিতি। মা-বাবার হাত ধরে আসা এই নতুন প্রজন্মের শিশুদের কাছে পিঠা উৎসব ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। অনেক শিশুকেই প্রথমবারের মতো ভাপা বা চিতই পিঠার স্বাদ নিতে দেখা যায়। আয়োজকেরা জানান, প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এই উৎসবের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

শিকড়ের টানে বিক্রেতারা

একজন শৌখিন বিক্রেতা আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, তিনি প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে পিঠা তৈরির বিশেষ ছাঁচ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসেন এই উৎসবে স্টল দেওয়ার জন্য। দেশের ঐতিহ্য বিদেশের মাটিতে তুলে ধরতে পেরে তিনি গর্বিত।

বৈশ্বিক মেলবন্ধন

উৎসবটি কেবল বাংলাদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শত শত বাঙালির পাশাপাশি বেশ কিছু কানাডিয়ান এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকেরাও এই উৎসবে যোগ দেন। তাঁরা পরম তৃপ্তিতে বাঙালির পিঠার স্বাদ নেন এবং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রশংসা করেন।

ছবি: লেখকের পাঠানো

বন্ধন-কোঅপারেটিভ সোসাইটির এই অনন্য উদ্যোগ কেবল একটি মেলা নয়; বরং প্রবাসে বাঙালির ঐক্য এবং পাবলিক রিলেশন বা জনসম্পর্ক বৃদ্ধির এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়েছে। তুষারঝরা সন্ধ্যায় এই পিঠা উৎসব সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছে—দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও বাঙালির হৃদয় সব সময়ই বাঁধা থাকে তার ঐতিহ্যের টানে। আয়োজনের শেষে বন্ধনের প্রেসিডেন্ট রাশিদা রাব্বানী সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo. com