হিসাবের খাতা
সন্ধ্যার পর মাঠে কুয়াশা নামে—
আমন ধানের গন্ধে ভিজে থাকে
রাতের ঘন অন্ধকার; দূরের তালগাছের
মাথায় পূর্ণিমা চাঁদ নীরব সাক্ষীর
মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি ভাবি—
যা দিয়েছি,
তা কি কেউ মনে রেখেছে?
নদীর ধারে যে ভাঙা নৌকাটিকে
একদিন দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলাম,
সে কি জানে আমার নাম?
গ্রামের পথ বেয়ে যে ভিখিরি গিয়েছিল
তার কাঁপা হাতে যে একমুঠো ভাত—
সে ভাতের উষ্ণতা কী
এখনো টিকে আছে কোনো
কালো রাত্রির বিপন্ন স্মৃতিতে?
মানুষ ভুলে যায়।
শীতের শেষে শুকনা পাতার মতো
স্মৃতিগুলো সব ঝরে পড়ে—
পায়ের নিচে মাড়িয়ে যায় গরুর গাড়ি,
ধুলোয় মিশে যায় দানের কথা।
শুধু আকাশের ওপরে
অদৃশ্য এক আলোর খাতা খোলা থাকে—
সেখানে নিশ্চয় লেখা আছে
আমার ছোট ছোট অর্ঘ্য,
আমার গোপন দয়া,
আমার নিঃশব্দ করুণা।
কিন্তু যা দিইনি—
যে দরজায় কড়া পড়েছিল
আর আমি ভেতর থেকে চুপ ছিলাম,
যে চোখে জল দেখেও
ফিরে গিয়েছিলাম নিজের ঘরে,
যে ক্ষুধার্ত দুপুরে আমার থালা ভরেছিল—
তার হিসাব প্রতিদিন সন্ধ্যায়
পশ্চিম আকাশের লালিমায় জেগে ওঠে।
কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
আমি শুনি এক নীরব প্রশ্ন—
আজ কী দিলে?
আজ কাকে ফিরিয়ে দিলে?
তারারাও যেন জবাব চায়—
ঘাসের ডগায় শিশিরের মতো
লেগে থাকে অনুতাপ।
মানুষের কাছে নয়,
গ্রামের কাছে নয়,
নদী বা শালিকের কাছে নয়—
কেবল সেই অদৃশ্য
ন্যায়বিচারকের কাছে
আমি প্রতিদিন দায়ী।
যা দিয়েছি—
তা হারিয়ে গেছে পৃথিবীর ভিড়ে;
যা দিইনি—
তা আমার বুকের ভেতর
ধূপের ধোঁয়ার মতো জমে থাকে,
অন্ধকারে নীরব আগুন জ্বালায়।
এইভাবে জীবন—
এক দীর্ঘ গোধূলি;
যেখানে দানের কথা মুছে যায়,
অদানের ছায়া লেগে থাকে চিরকাল।
তবু আশা করি প্রতিদান পাব তার
কাছে একদিন যার কাছে রাখা আছে
আমার সকল হিসাব।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]