জাপানের ইওয়াতে প্রিফেকচারের সাকুরা

সাকুরাগাছের নিচে লেখকের স্ত্রী উৎসারিকা সিংহ ও তাঁর মেয়ে সুসুমু সরকার। এ বছর সাকুরা এখনো ফোটেনি, গত বছরের ছবিছবি: লেখকের পাঠানো

বাংলাদেশ যেমন ষড়ঋতুর অপার সৌন্দর্যে ভরা এক দেশ, তেমনি জাপান হলো চার ঋতুর দেশ। এই চার ঋতুর রূপ যেন হৃদয় ছুঁয়ে যায় অন্য এক গভীরতায়। এখানে বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ আর শীত—এই চার ঋতুই আলাদা আলাদা আবেগ, আলাদা অনুভূতি ও আলাদা রং নিয়ে প্রকৃতির বুক জুড়ে নিজেদের ছাপ রেখে যায়। প্রতিটি ঋতুই যেন নিজের গল্প নিজেই বলে, আর সেই গল্পের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে স্মৃতি, বিস্ময়, আর অদ্ভুত এক মায়া।

জাপানের ঋতুগুলোর সৌন্দর্য বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। এখানে প্রকৃতি শুধু দেখা যায় না, তাকে অনুভব করতে হয় হৃদয়ের গভীরে গিয়ে। প্রতিটি ঋতুর জন্য নির্দিষ্ট রঙের ব্যবহার যেন মানুষের জীবনযাপনকেও রঙিন করে তোলে। এখানে বসন্ত মানেই  গোলাপি। সাকুরার কোমল, স্বপ্নময় রঙে রঙিন হয়ে ওঠে চারপাশ। মনে হয় যেন পুরো পৃথিবী এক গোলাপি স্বপ্নে মোড়ানো।

বসন্ত এলে সাকুরা ফুল ফোটে, আর সেই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। চারদিকে শুধু ফুল আর ফুল, যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে অসংখ্য কোমল পাপড়ি। সেই গোলাপি আভায় প্রকৃতি নিজেই যেন লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। কী যে অপূর্ব সেই দৃশ্য! চোখে না দেখলে, হৃদয়ে না ছুঁলে যেন বিশ্বাস করা যায় না। বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক মৃদু সুবাস, যা মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

গ্রীষ্ম আসে সবুজের উচ্ছ্বাস নিয়ে। সাকুরা ফুল ঝরে পড়ে আর গাছগুলো ভরে ওঠে ঘন সবুজ পাতায়। যেন নতুন করে জীবন ফিরে পায় প্রকৃতি। সবুজের এই ছোঁয়া মনে একধরনের সজীবতা এনে দেয়, যেন প্রতিটি শ্বাসে নতুন প্রাণ জেগে ওঠে।

তারপর আসে শরৎ—হলুদের মায়াবী রূপে। গাছের পাতাগুলো ধীরে ধীরে রং বদলায়, সবুজ থেকে হলুদ, কখনো লালচে আভা। সেই পরিবর্তনের মধ্যে থাকে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা, আবার একই সঙ্গে এক গভীর সৌন্দর্য। যেন বিদায়ের মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক অপূর্ব সুর। ঠান্ডা বাতাসে যখন পাতাগুলো ঝরে পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের গল্পের শেষ অধ্যায় লিখছে।

ইওয়াতের সবচেয়ে জনপ্রিয় মরিওকাতে অবস্থিত ইসি ওয়ারি জাকুরা (পাথর ফেটে বের হওয়া সাকুরাগাছ)। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কীভাবে টিকে থাকতে হয়, সেই নিদর্শন হিসেবে সবার কাছে খুবই জনপ্রিয় ও সম্মানীয়। ছবিটি গত বছরের
ছবি: লেখকের পাঠানো

শীত আসে নীরবতার চাদর নিয়ে—সাদা, শান্ত আর গভীর। তুষারের শুভ্রতা ঢেকে দেয় সবকিছু। নদী, মাঠ, রাস্তা সব একাকার হয়ে যায়। সেই সাদা পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে। নিস্তব্ধতা এত গভীর হয় যে নিজেন হৃৎস্পন্দনও শোনা যায়।

এই ইওয়াতে প্রিফেকচারে আমার জীবনযাপন যেন সেই চার ঋতুর মাঝেই বোনা এক গল্প। দীর্ঘ সময় মধ্য জাপানের গিফু প্রিফেকচারে কাটানোর পর এখানে এসে যেন নতুন করে প্রকৃতিকে চিনতে শিখেছি। ইওয়াতে প্রিফেকচার জাপানের উত্তর দিকের তোহকু অঞ্চলে অবস্থিত। এই জায়গার সৌন্দর্য যেমন গভীর, তেমনি এর চ্যালেঞ্জও কম নয়—ভূমিকম্প, ঠান্ডা, প্রকৃতির নানা রূপ। তবু এর সৌন্দর্যের কাছে সবকিছুই যেন তুচ্ছ মনে হয়।

ইওয়াতেতে সাকুরা একটু দেরি করে ফোটা শুরু করে। হয়তো ঠান্ডার জন্য, হয়তো প্রকৃতির নিজের কোনো নিয়মে। মার্চ, এপ্রিল, মে—এই তিন মাস বসন্ত কাল হলেও মার্চের শেষেও এখানে শীতের ছোঁয়া থাকে। ভোরবেলা সেই ঠান্ডা যেন হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, বাংলাদেশের কনকনে শীতের চেয়েও বেশি। মনে হয় সাকুরাও যেন এই ঠান্ডাকে খুব একটা পছন্দ করে না, তাই বসন্ত এলেও একটু সময় নিয়ে নিজের সৌন্দর্য মেলে ধরে।

প্রতিবছরের মতো এই বছরও ইওয়াতে প্রিফেকচারের রাজধানী মরিওকা শহরে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে সাকুরা ফুল ফোটা শুরু হওয়ার কথা। ফুল যখন পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়, তখন পুরো শহর যেন বদলে যায়। চারিদিকে শুধু ফুল আর ফুল। সেই দৃশ্য এতটাই মোহনীয় যে মনে হয় যেন স্বপ্ন দেখছি। বাতাসে উড়ে বেড়ানো পাপড়িগুলো যেন একেকটা স্মৃতি, ক্ষণস্থায়ী কিন্তু গভীর।

সাকুরা শুধু একটি ফুল নয়, এটি জাপানের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে সাকুরাগাছগুলো খুব যত্ন ও পরিকল্পনা করে লাগানো হয়, যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। নদীর দুই পাড় কিংবা রাস্তার দুই ধার—সবখানেই সারি সারি সাকুরাগাছ।

যখন হালকা বাতাসে সেই পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে, তখন মনে হয় যেন আকাশ থেকে গোলাপি তুষার পড়ছে। সেই মুহূর্তগুলো এতটাই আবেগঘন যে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই মুহূর্তগুলো জাপানিরা খুব উপভোগ করে। দল বেঁধে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে তারা বিভিন্ন পার্কে কিংবা স্পটে ঘুরতে যায়, বসে, খায়, গল্প করে আর উপভোগ করে এই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য। এই সময় হানামি উৎসব হয়, সাকুরা ফুল দেখা উৎসব। জাপানিজ শব্দ হানা মানে ফুল আর মি মানে দেখা। হানামি মানে ফুল দেখা। হানামি উৎসবকে কেন্দ্র করে রাত্রিবেলায় সাকুরাগাছে লাইটিং করা হয়। রাত্রিবেলার এই লাইটিং করা হানামি উৎসবকে বলা হয় ইয়োজাকুরা। রাতের লাইটের আলোয় ফুলগুলোকে আরও বেশি সুন্দর দেখায়। আলো আর ফুলের মিশেলে তৈরি হয় এক জাদুকরি পরিবেশ।

গত বছরের হানামি উৎসবে জাপানিজদের সঙ্গে সুসুম চান। জাপানিজরা মেয়ে বাচ্চাদের আদর করে চান ডাকে
ছবি: লেখকের পাঠানো

জাপানের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় ১ এপ্রিল থেকে, আর সেই সময়েই ফোটে সাকুরা। তাই সাকুরা এখানে নতুন শুরু, নতুন স্বপ্ন আর নতুন জীবনের প্রতীক। এ বছর আমার মেয়ের জীবনেও শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। এপ্রিল থেকে তার শোগাক্কো মানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনার যাত্রা শুরু হবে। এই দূর পরবাসে নতুন বিদ্যালয়ে যাওয়া, নতুন বন্ধু, নতুন অভিজ্ঞতা, সবকিছুই নতুন তার জন্য। এই দূর পরবাসে সেই নতুন শুরুর কথা ভাবতে গিয়ে মনটা আবেগে ভরে ওঠে। কত স্বপ্ন, কত আশা নিয়ে এই পথ চলা। চাই তার জীবন হোক ভালোবাসায় ভরা, মানবিকতায় উজ্জ্বল আর সুস্থতায় পরিপূর্ণ।

সাকুরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। এ সৌন্দর্য যেমন কয়েক দিনের, তেমনি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তও অমূল্য। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে ভালোবাসতে হয়, অনুভব করতে হয়, হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। এই সাকুরার পাপড়ির মতোই আমাদের জীবন নরম, সুন্দর আর ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু সেই ক্ষণিক সময়েই লুকিয়ে থাকে অসীম সৌন্দর্য, অসীম আবেগ আর অসীম ভালোবাসা। তাই জীবনকে ভালোবাসো আর আনন্দে বাঁচো।

লেখক পরিচিতি: সঞ্জয় সরকার, অধ্যাপক, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে জাপানের ইওয়াতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী গবেষণা সেন্টারে কর্মরত