শেষ শনিবার

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

শেষ শনিবার আসার আগের রাতগুলো রাজুর সবচেয়ে দীর্ঘ রাত। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু সময় এগোয় না। জানালার বাইরে শহরের আলো জ্বলে-নেভে, রাস্তার গাড়িগুলো হাইওয়ের বুক চিরে ছুটে যায়। আর রাজু বিছানায় শুয়ে ছেলের শ্বাসের শব্দ খোঁজে, যে শব্দ এখন আর তার ঘরে নেই।

ভোর হলে সে ঘুম থেকে উঠে বসে।

আজ শনিবার।

শেষ শনিবার।

এই শব্দটার ভেতরেই যেন একটা জীবন আটকে আছে।

কোর্ট হাউসের সামনে সকালটা অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল। রোদ আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই। বাতাসে কাগজের গন্ধ—পুরোনো ফাইল, পুরোনো রায়, পুরোনো গল্পের ঝাঁজ। রাজু হাতে একটা পাতলা ফাইল নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে। কাগজগুলো নড়ছে, যেন নিজেরাও জানে—এদের ভেতরে লেখা শব্দগুলো মানুষের জীবন ভেঙে দেয়।

হঠাৎ সে থামে।

পেছনে, একটু দূরে জেফার দাঁড়িয়ে।

তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। মুখটা যেন বহুদিন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আর বদলাবে না। তার ডান হাতে ধরা ইয়ারদানের হাত। পাঁচ বছরের হাত।

ছোট। নরম। কিন্তু সেই হাতটাকে জেফার এমন শক্ত করে ধরে আছে, যেন হাতটা ছেড়ে দিলেই ছেলেটা বাবার কাছে চলে যাবে।

ইয়ারদান তাকিয়ে আছে রাজুর দিকে।

তার চোখ ভেজা।

শিশুর চোখে পানি জমে উঠলে সেটা কেবল কান্না নয়—ওটা অনিশ্চয়তা, ভয়, আর বোঝাতে না পারা কষ্টের জল।

- Baba… take me with you.

একটু থেমে আবার বলে ইয়ারদান,

- I need you.

এই শব্দগুলো বাতাসে ভেসে থাকে।

কোর্ট হাউসের দেয়াল, লোহার গেট, পুলিশের বুট—সবকিছু যেন একমুহূর্তের জন্য চুপ করে যায়।

রাজু ছেলের দিকে তাকায়।

তার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ে। শব্দ হয় না—শুধু ভাঙে।

তার চোখ বেয়ে পানি নামে। কিন্তু সে কাঁদে না। কাঁদার অধিকার যেন কোর্টের রায়ের কোথাও লেখা ছিল না।

সে ঘুরে দাঁড়ায়।

হাঁটতে শুরু করে।

পেছনে আর তাকায় না।

কারণ সে জানে—একবার তাকালে আর হাঁটতে পারবে না।

তার কানে তখন জজের কণ্ঠ বাজে। সেই কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, কোনো দয়া নেই—শুধু নিয়ম।

Mr. Raju, you are allowed to see your child once a month. On the last Saturday of every month. You are not permitted to go near your ex-wife’s residence. Violation will result in arrest.

এক মাসে একদিন।

শেষ শনিবার।

বাবা হওয়ার ক্যালেন্ডারটা কত ছোট হতে পারে, রাজু আগে জানত না।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলে রাজু চলে আসে হাইওয়ের ধারে সেই গ্যাসস্টেশনে। জায়গাটা নির্জন, কিন্তু পুরোপুরি ফাঁকা নয়। চারপাশে সারাক্ষণ গাড়ি ছুটে যায়। কেউ থামে না, কেউ তাকায় না।

রাজু হাতে কফির কাপ নিয়ে বেঞ্চে বসে। কফি গরম, কিন্তু তার হাত ঠান্ডা। সে কফিতে চুমুক দেয় না। শুধু তাকিয়ে থাকে রাস্তার ওপাশে।

ওই বাড়িটার দিকে।

দোতলা সাদামাটা একটা বাড়ি। কোনো আলাদা সৌন্দর্য নেই। তবু রাজুর চোখে সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জায়গা।

ওখানেই থাকে ইয়ারদান।

যেই বাড়ির সামনে সে যেতে পারে না।

যেই বাড়ির ভেতরে তার সব স্মৃতি আটকে আছে।

জানালার পর্দা একটু নড়ে। ভেতরে জেফার হাঁটছে। পাশে একজন পুরুষ। তারা কথা বলছে, হাসছে। রাজু সেই হাসি শুনতে পায় না, কিন্তু দেখতে পায়।

সে চোখ সরাতে পারে না।

সে শুধু খোঁজে—ইয়ারদান কোথায়?

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

একদিন ছিল, যখন এই বাড়িটাই ছিল তাদের সংসার।

ইয়ারদান খেলছিল মেঝেতে। রঙিন প্লেন, ছোট গাড়ি ছড়িয়ে ছিল চারপাশে। রাজু পাশে বসে ছিল। অফিস থেকে ফিরেই ছেলের পাশে বসে পড়েছিল সে—ক্লান্তি ভুলে।

- Daddy, guess what?

ইয়ারদানের চোখ চকচক করছিল।

- What did you draw?

- Me, you… and a big tree.

- And mom?

ইয়ারদান একটু ভেবেছিল। তারপর সরল গলায় বলেছিল,

- Mom wasn’t in it.

ঘরের ভেতর হঠাৎ নীরবতা নেমে এসেছিল।

রাজু ছেলেকে বুকে টেনে নিয়েছিল।

কিছু আঁকা ছবি থাকে, যেগুলো সত্যি বলেই ভয়ংকর।

গ্যাসস্টেশনের ভেতরে এনায়েত আলী কফি বানাচ্ছে। বয়স ৬৫। মাথার চুল পেকে গেছে। চোখে এমন এক ক্লান্তি, যা বিশ্রামে কাটে না।

সে রাজুর দিকে তাকায়।

- ভাই… আপনাকে প্রায় রোজই দেখি এখানে।

রাজু কিছু বলে না।

- এত সময় ধরে কী দেখেন?

রাজু একটু থেমে বলে—

- ওই বাড়িটা।

- আপনার?

রাজু মাথা নাড়ে।

- না।

তার গলা কাঁপে।

- আমার ছেলের।

এনায়েত আলী চুপ করে যায়। কিছু প্রশ্ন থাকে, যেগুলো না করাই ভালো।

রাত নামলে হাইওয়ের আলো জ্বলে ওঠে। বাতাস ঠান্ডা হয়। রাজু আর এনায়েত আলী গ্যাসস্টেশনের সামনে বেঞ্চে বসে থাকে।

- ছেলে… সে কি জানে আপনি এখানে বসে থাকেন?

এনায়েত আলী জিজ্ঞেস করে।

- না। কোর্ট বলেছে… আমি ওর বাড়ির কাছেও যেতে পারব না।

রাজু থামে।

- মাসের শেষ শনিবার… ওই একদিনই আমার জীবন।

এনায়েত আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

- আমি তো প্রতিদিন ছেলের কাছেই থাকি… তবু আমি একা।

হালকা স্নো পড়া শুরু হয়। ছোট ছোট সাদা কণা বাতাসে ভাসে। গ্যাসস্টেশনের ভেতরে জানালার ওপাশে বরফ জমতে থাকে। এনায়েত আলীর কানে বাজে বহু বছরের পুরোনো ফোনকল।

‘আমেরিকা স্বপ্নের দেশ, আব্বা...’

সে তখন ভেবেছিল—ছেলের জন্য, নাতিদের জন্য সে ঠিক কাজটাই করছে।

এখন সে হালকা হাসে।

- এখন সেই স্বপ্নের দাম… আমার হোমকেয়ারের টাকা!

তার কণ্ঠে অভিযোগ নেই। আছে ক্লান্ত মেনে নেওয়া।

- রাতে কাজ শেষ হলে এখানেই বসে থাকি। কারণ ছেলেটা না আসলে আমি বাসায় যেতে পারি না!

রাজু তার হাত ধরে।

দুজনের হাত কাঁপে।

রাস্তার ওপাশে জানালার পাশে ইয়ারদান দাঁড়িয়ে। হাতে খেলনা গাড়ি। বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু বাবাকে দেখতে পায় না।

রাজু এক পা এগোয়।

থেমে যায়।

- আমি আছি বাবা…

তার গলা ভেঙে আসে।

- তোমার পাশেই আছি।

সে বেঞ্চে বসে পড়ে। কান্না আসে। এবার সে আর আটকায় না।

- আমি বাবা হয়েও… অপরাধী।

এনায়েত আলী বলে,

- আর আমি বাবা হয়েও… বোঝা।

রাজু তাকায় তার দিকে।

- চাচা… আমরা কি খুব খারাপ বাবা?

এনায়েত আলী মাথা নাড়ে।

- না রে বাবা… আমরা শুধু ভুল সময়ে জন্মানো বাবা।

বরফ পড়তে থাকে।

সাদা বরফের ওপর দুজন পিতার চোখের পানি একসঙ্গে ঝরে পড়ে।

কেউ কথা বলে না।

শেষ শনিবার শেষ হয়ে যায়।

সব বাবা কাছে থাকতে পারে না।

কিছু বাবা শুধু শেষ শনিবারের অপেক্ষায় বাঁচে!

লেখক: হিমু আকরাম, হাইপয়েন্ট স্ট্রিট, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র।