শিক্ষক দিবস–দূর পরবাস: ১
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি ভবসিন্ধু বিশ্বাস স্যারের মতো একজন শিক্ষক থাকতেন!
সেদিন এক সন্ধ্যাকালীন আড্ডায় গিয়েছিলাম। নানা কথার ফাঁকে কখন যে আলাপ গড়িয়ে গেল আমাদের যার যার প্রিয় কিংবা শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রসঙ্গে, তা খেয়ালই করিনি। সবাই একে একে তাঁদের প্রিয় শিক্ষকদের কথা বলছিলেন। আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
আমাকে নিশ্চুপ দেখে আড্ডার এক ভদ্রলোক বললেন—
‘আচ্ছা, আপনি তো প্রায় তিন দশক দেশ-বিদেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে সময় কাটিয়েছেন। তা বলুন না, আপনার প্রিয় শিক্ষক সম্পর্কে?’
প্রশ্নটা শুনেই কেন যেন থমকে গেলাম। মনে হলো, কেউ যেন বহুদিনের বন্ধ দরজায় আলতো করে কড়া নেড়েছে। হারিয়ে গেলাম অনেক দূরের, অনেক পুরোনো কিছু দিনের ভেতর।
মনে পড়ে গেল আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষকের কথা—একজন মানুষ, যাঁকে একসময় হারিয়ে ফেলেছিলাম; অথচ মন থেকে কখনো হারাতে পারিনি।
বললাম, তাঁকে খুঁজে পাওয়ার গল্প।
বছর কয়েক আগের কথা। বহুদিন ধরে মনের এক কোণে লুকিয়ে থাকা তাগিদ থেকেই একদিন ফোন করেছিলাম খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধানকে। তখন জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। দেশ ছেড়েছি, বিদেশে পড়াশোনা করেছি, নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি—কিন্তু শৈশব-কৈশোরের কিছু মানুষকে কি আর এত সহজে পেছনে ফেলে আসা যায়?
ফোনের শুরুতেই নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, ‘আমি কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি। তারপর বললাম—শুনেছি, আপনার বিভাগে প্রকৌশলী শ্রীযুক্ত ভবসিন্ধু বিশ্বাস শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। উনি আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক। কয়েক দশক ধরে তাঁকে খুঁজছিলাম। অনেক চেষ্টা করার পর অবশেষে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আপনি কি দয়া করে তাঁকে একটু ডেকে দিতে পারেন?’
আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ভদ্রলোক বরং বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন—
‘আচ্ছা, আপনি তো একটি খ্যাতনামা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আপনি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন তো—একজন পলিটেকনিকের শিক্ষক কীভাবে আপনার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক হন?’
কীভাবে বোঝাই তাঁকে?
একজন শিক্ষকের মূল্য তো তাঁর পদবি দিয়ে মাপা যায় না। কোন প্রতিষ্ঠানে তিনি পড়ান, তাঁর নামের পাশে কতগুলো ডিগ্রি, কিংবা তাঁর পরিচিতি কতদূর বিস্তৃত—এসবের কোনোটিই একজন ছাত্রের হৃদয়ে তাঁর স্থান নির্ধারণ করে না।
কিছু শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ শেখান না। তাঁরা অজান্তেই একজন মানুষের জীবনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। তাঁদের একটি কথা, একটি উৎসাহ, কিংবা একটি ছোট্ট বিশ্বাস একজন ছাত্রের সারা জীবনের পথচলার সঙ্গী হয়ে থাকে।
ভবসিন্ধু বিশ্বাস স্যার আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন
‘ভবসিন্ধু বাবু এখন ক্লাসে আছেন। আপনি কি এক ঘণ্টা পরে আবার ফোন করতে পারবেন?’
‘এক ঘণ্টা!’
সেই এক ঘণ্টা যেন আমার কাছে কয়েক দশকের সমান দীর্ঘ হয়ে উঠল। অপেক্ষা করতে করতে ফিরে গেলাম আমার কৈশোরে। তখন আমি সদ্য অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছি। কোনো এক শীতের সন্ধ্যায় বাবা জানালেন, পরদিন থেকে আমার নতুন গৃহশিক্ষক আসবেন। দুরুদুরু বক্ষে তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। বাবা বললেন, তাঁর নাম ভবসিন্ধু বিশ্বাস। তিনি তখন আমাদের জেলা শহরের সরকারি পলিটেকনিকের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং মেধাতালিকার একেবারে ওপরের দিকের একজন।
পরদিন তিনি এলেন। পড়ানো শুরু করার পরিবর্তে প্রথমেই আমাকে অঙ্কের একটি পরীক্ষা দিলেন। শহরের নামকরা বিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র হিসেবে নিজের মধ্যে তখন সামান্য গর্বও ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শেষে আমার খাতা দেখে স্যার বললেন—
‘তুমি তো দেখছি কিছুই পারো না। পেয়েছ মাত্র তিন!’
এক শতে তিন!
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি হতভম্ব হয়ে খাতাটা আবার দেখলাম। তখন বুঝলাম, স্যারের কথাটা মোটেও অন্যায় ছিল না। কোথাও উত্তর শব্দটি লিখিনি, কোথাও যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগের চিহ্ন ঠিকভাবে ব্যবহার করিনি, কোথাও জ্যামিতিক কোণ সঠিকভাবে প্রকাশ করিনি, কোথাও শতাংশের চিহ্ন লিখিনি—এমন আরও কত ভুল
সেদিনই তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন—অঙ্কের উত্তর সঠিক হলেই অঙ্ক সঠিক হয় না; সঠিকভাবে উপস্থাপন করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তখন হয়তো শিক্ষাটির গভীরতা বুঝিনি। বহু বছর পর উপলব্ধি করেছি, তিনি আসলে শুধু অঙ্ক শেখাননি; শিখিয়েছিলেন নির্ভুলতা, শৃঙ্খলা এবং কাজের প্রতি সততা।
অন্য একদিন তাঁকে বলেছিলাম—
‘স্যার, এটা একটু নোট করে দিন।’
তিনি বলেছিলেন—
‘আমি যদি লিখে দিই, সেটা হবে আমার ভাষা। কিন্তু তোমাকে তো নিজের ভাষায় লিখতে বলা হয়েছে!’
সেদিন কথাটা শুনে আমার ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়েছিল। কিন্তু বহু বছর পর বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে বুঝলাম, নিজের মতো করে না লিখে অন্যের লেখা অনুসরণ করাকে শিক্ষা ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। তখন উপলব্ধি করলাম, সেই ছোট্ট কথার মধ্যেই কী গভীর শিক্ষা লুকিয়ে ছিল।
আহা, আমার মাতৃভূমির প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি ভবসিন্ধু বিশ্বাস স্যারের মতো একজন করে শিক্ষক থাকতেন! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ দেশের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখার সাধ্য কারও থাকত না।
প্রায় দুই বছর ছয় মাস তিনি আমাকে পড়িয়েছিলেন। সেই সময়টুকুতে তাঁর কাছ থেকে ঠিক কত কিছু শিখেছি, তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি শুধু অঙ্ক কিংবা পড়াশোনা শেখাননি; শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের ভুল দেখতে হয়, নিজের ভাষায় ভাবতে ও লিখতে হয়, এবং জ্ঞানকে জীবনের কাজে প্রয়োগ করতে হয়।
এই মানুষটিকেই কয়েক দশক পর খুঁজে বের করেছি।
এক ঘণ্টা পর আবার ফোন করলাম।
স্যার ফোন ধরলেন, কিন্তু আমার কণ্ঠ শুনে আমাকে চিনতে পারলেন না। সেটাই স্বাভাবিক। এত বছর পেরিয়ে গেছে; তাঁর জীবনে কত শত ছাত্র এসেছে, কত মুখ স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে গেছে। আর আমি তো তখন এক কিশোর—আজ জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে অন্য মহাদেশে বসবাস করি।
স্যারকে তাঁর নিজের ছাত্রজীবনের কিছু কথা এবং আমাকে পড়ানোর স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে শুরু করলাম। বেশ কয়েকটা পুরোনো ঘটনার কথা বলার পর মনে হলো তিনি অবশেষে আমাকে চিনতে পারলেন।
সেই মুহূর্তে মনে হলো, এত বছর যেন একনিমেষে মিলিয়ে গেল। পৃথিবীর দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুই মানুষের মাঝখানের কয়েক দশকের দূরত্ব যেন হঠাৎ আর দূরত্ব বলে মনে হলো না।
আমরা অনেকক্ষণ কথা বললাম। তিনি জানতে চাইলেন আমি কোথায় আছি, কী করছি। আমিও তাঁর কথা শুনলাম। কথার ফাঁকে ফাঁকে আমার মনে হচ্ছিল, আমি আবার সেই কিশোর ছাত্র হয়ে গেছি—যে তাঁর সামনে বসে অঙ্ক করত, ভুল করত, বকা খেত, আবার শিখত।
ফোন রাখার আগে স্যারকে বললাম—‘স্যার, আপনাকে আমি অনেক বছর ধরে খুঁজছিলাম।’
আজও স্যারের সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয়নি। তাই মনে হয়, এই গল্পটির একটি অধ্যায় এখনো বাকি রয়ে গেছে।
একদিন যদি সুযোগ হয়, তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চাই। ফোনের ওপাশে নয়—সামনাসামনি। হয়তো তখন আর নিজের পরিচয় দিতে হবে না। শুধু বলব—
‘স্যার, আমি আপনার সেই ছাত্র—যে একদিন অঙ্কে এক শর মধ্যে তিন পেয়েছিল।’
তারপর হয়তো আমরা দুজনেই হাসব।
জানি না সেই দিনটি কবে আসবে। তবে কিছু অপেক্ষা থাকে, যেগুলো পূর্ণ হওয়ার নিশ্চয়তার চেয়েও সুন্দর হয়ে ওঠে আশার কারণে। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।
একদিন হয়তো সত্যিই তাঁর সামনে দাঁড়াতে পারব—আমার সেই প্রিয় শিক্ষক, ভবসিন্ধু বিশ্বাস স্যারের সামনে।
*লেখক: অধ্যাপক ক খ হাসান, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারি, কানাডা