সুইডেনের স্মৃতির জানালায় বাল্যবন্ধুরা

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

কী আশ্চর্য! কখনো কখনো স্মৃতির জানালাটি হঠাৎ করেই খুলে যায়। তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোটবেলার সেই দিনগুলো, সেই দুষ্টু আর মিষ্টি বন্ধুদের মুখ, সেই নির্ভেজাল হাসি, সেই অভিমান, সেই ভালোবাসা। মনে হয়, সময় যেন কোথাও থেমে আছে। শুধু আমরাই বয়সের ভার কাঁধে নিয়ে অনেক দূরে চলে এসেছি।

আজ বহু বছর ধরে আমি সুইডেনে। জীবনের পথচলায় নানা দেশের, নানা ভাষার, নানা সংস্কৃতির, নানা বর্ণের, নানা বয়সের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেকেই বন্ধু হয়েছে, কেউ সহযাত্রী, কেউ আবার জীবনের বিশেষ অধ্যায়ের অংশ। তবু হৃদয়ের গভীরে যে শূন্যস্থানটি রয়ে গেছে, সেখানে এখনো বসে আছে শৈশবের সেই বন্ধুরাই। কারণ, নতুন বন্ধুত্ব জীবনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু শৈশবের বন্ধুত্ব আত্মার ইতিহাস হয়ে থাকে।

মনে পড়ে, আমাদের ছোটবেলায় কফি হাউস ছিল না, আধুনিক ক্যাফেও ছিল না। আমাদের আড্ডা বসত খেলার মাঠে, স্কুলের মাঠে, নদীর ঘাটে কিংবা ছাত্রাবাসের বারান্দায়। সেখানে ছিল না কোনো বিলাসিতা, ছিল না মুঠোফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ছিল শুধু সময়, আন্তরিকতা আর একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ টান। সূর্য ডুবে যেত, সন্ধ্যা নামত, তবু গল্প শেষ হতো না। সেই দিনগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, অথচ তখন আমরা তার মূল্য বুঝিনি।

জীবনের প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়েছি, শহরে এসেছি। শহর ছেড়ে একদিন পাড়ি জমিয়েছি বিদেশে। জীবনযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য নয়, নিজের স্বপ্নকে জয় করার জন্য, বাঁচার মতো করে বাঁচার জন্য। কত বছর পেরিয়ে গেছে, কত মানুষ এসেছে-গেছে, কত সম্পর্কের রং বদলেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শৈশবের বন্ধুরা কখনো স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়নি। তাদের আমি মনের মন্দিরে অত্যন্ত যত্নে রেখে দিয়েছি। এ এক অদৃশ্য সম্পদ, যার মূল্য কোনো মুদ্রায় মাপা যায় না।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

তারপর এল ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন পৃথিবী। হঠাৎ একদিন একটি ছোট্ট ফেসবুক পোস্ট যেন প্রায় চল্লিশ বছরের দূরত্ব মুহূর্তেই মুছে দিল। একে একে খুঁজে পেলাম হারিয়ে যাওয়া অনেক বন্ধু। ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে পরিচিত অথচ বহুদিনের বিস্মৃত কণ্ঠস্বর। মনে হলো, সময় যেন একটুও এগোয়নি। গ্রুপ কলে সবাই একসঙ্গে কথা বলছি, হাসছি, পুরোনো দিনের গল্প করছি। মনে হচ্ছিল, আমরা আবার সেই স্কুলের মাঠে ফিরে গেছি। প্রযুক্তি সেদিন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, ছিল স্মৃতিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার এক অপূর্ব সেতুবন্ধন।

কিন্তু সময়ের নিজস্ব নিয়ম আছে। আজ সেই ফোনগুলো আগের মতো আর বাজে না। গ্রুপগুলো নীরব হয়ে গেছে। অনেকেই ব্যস্ত জীবনের ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে গেছে। কেউ সংসারের দায়িত্বে, কেউ কর্মজীবনের চাপে, কেউ অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছে, কেউ পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়েছে। আবার কেউ হয়তো সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছে অতীতকে স্পর্শ করার অবসর খুঁজে পায় না। তবু আমি বিশ্বাস করতে চাই, মানুষ তার শৈশবকে কখনো ভুলে যায় না। হয়তো স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ার মতো একটি মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকে।

জীবন আমাদের অনেক কিছু দেয়, আবার অনেক কিছু কেড়েও নেয়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের হিসাব মানে না। শৈশবের বন্ধুত্ব ঠিক তেমনই। বছর, দেশ, ভাষা কিংবা দূরত্ব তাকে মুছে দিতে পারে না। কারণ, সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল স্বার্থ নয়, ছিল সরলতা; ছিল অর্জন নয়, ছিল একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার গল্প।

আজ সুইডেনের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশের সেই সবুজ গ্রাম, স্কুলের মাঠ, নদীর ঘাট আর শৈশবের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়, মানুষ আসলে দুটি দেশে বাস করে। একটি তার বর্তমানের দেশ, আরেকটি তার স্মৃতির দেশ। বর্তমানের দেশে আমরা জীবন গড়ি, কিন্তু স্মৃতির দেশে আমরা বারবার ফিরে যাই নিজের সত্যিকারের পরিচয় খুঁজে পেতে।

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

যদি এই লেখা পড়ে কোনো এক বাল্যবন্ধুর মনে আরেকজন বাল্যবন্ধুর কথা জেগে ওঠে, যদি কেউ বহুদিন পর একটি ফোন করে শুধু বলে, “কেমন আছিস?”, তাহলেই এই স্মৃতিচারণার সার্থকতা। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতি নয়, বরং এমন কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে কাটানো শৈশব আজও হৃদয়ের ভেতর লতার মতো জড়িয়ে আছে, নীরবে, গভীরভাবে, আজীবন।

কিন্তু এই কথাগুলো লিখতে লিখতেই মনে আরেকটি প্রশ্ন জেগে ওঠে। কেন এমন হয় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সম্পর্ক শুধু দূরে সরে যায় না, কখনো কখনো যেন আমাদের ভেতর থেকেই হারিয়ে যেতে শুরু করে? হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পরের কথাগুলো বলা।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সময় নয়, দূরত্বও নয়; সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মানুষের ভেতরে অদৃশ্য প্রাচীরের জন্ম নেওয়া। সেই প্রাচীর কখনো অর্থের, কখনো সামাজিক মর্যাদার, কখনো ব্যস্ততার, আবার কখনো অহংকারের। ধনী-গরিবের পার্থক্য তখন শুধু জীবনযাপনে সীমাবদ্ধ থাকে না, সম্পর্কের মধ্যেও নীরবে জায়গা করে নেয়। একসময় যে বন্ধু একই মাঠে খালি পায়ে দৌড়েছে, একই বেঞ্চে বসে পড়েছে, একই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে, বড় হয়ে সে-ই হয়তো আর ফোন করার সাহস পায় না, কিংবা সময় বের করতে পারে না। অন্যজনও সংকোচে চুপ করে থাকে। এভাবেই নীরবে বন্ধ হয়ে যায় স্মৃতির জানালা।

আমি বিশ্বাস করি, বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জন্য এই স্মৃতির সেতুবন্ধন কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক শক্তি। কারণ, শৈশবের বন্ধুত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ব্যাংক হিসাব, বাড়ি, গাড়ি কিংবা পদবি নয়; তার পরিচয় সেই মানুষটি, যে একদিন কোনো স্বার্থ ছাড়াই আরেকজনের পাশে দাঁড়িয়েছিল। যদি আমরা সেই সম্পর্কগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাহলে হয়তো অর্থের মোহ, সামাজিক প্রতিযোগিতা কিংবা কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার আমাদের পুরোপুরি গ্রাস করতে পারবে না।

বন্ধুর খোঁজ নেওয়া মানে শুধু একটি ফোন করা নয়; নিজের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা। স্মৃতির জানালা খুলে দেওয়া মানে শুধু অতীতকে মনে করা নয়; নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া। যে মানুষ তার শৈশবকে ভুলে যায়, সে ধীরে ধীরে নিজেরই একটি অংশ হারিয়ে ফেলে। আর যে মানুষ শৈশবের বন্ধুদের ধরে রাখে, সে শুধু সম্পর্কই রক্ষা করে না, নিজের মানবিকতাকেও বাঁচিয়ে রাখে।

হয়তো আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ছোট্ট সাহসটুকু, বহুদিন পর কোনো এক বাল্যবন্ধুকে ফোন করে শুধু বলা, ‘বন্ধু, কেমন আছিস?’ অনেক সময় এই একটি বাক্যই ভেঙে দিতে পারে বছরের পর বছর জমে থাকা নীরবতার দেয়াল, মুছে দিতে পারে ধনী-গরিবের দূরত্ব, আর আবারও জ্বালিয়ে দিতে পারে সেই আলো, যেখান থেকে একদিন আমাদের বন্ধুত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে মানুষ তার সম্পদের হিসাব নয়, খুঁজে ফেরে সেই মানুষগুলোকেই, যারা তার শৈশবের আকাশে প্রথম বন্ধুত্বের ঘুড়ি উড়িয়েছিল।