মা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ডাক। মা ডাকেই মানুষ খুঁজে পায় সীমাহীন শান্তি। মা হলেন মানুষের একমাত্র নিরাপদ শান্তির ঠিকানা। মায়ের ভালোবাসা অতুলনীয়। মা আর মাতৃভূমি থেকে দূরে গেলে তথা প্রবাসজীবনে অনুভব করা যায়—মা কী? আর যাঁদের মা নেই দুনিয়াতে—তা আর কী বলব, লিখে ভাষায় বুঝাতে পারব না! যার মা নেই, সে–ই শুধু বুঝবেন।
প্রবাসে মা, মাটি, দেশ, মমতা অনেক কিছুই মিস করা হয়। যা আসলে প্রবাসীদের মতো করে ভেতরে–ভেতরে আর কেউ এত গভীর করে লালন করতে পারে না।
সন্তান যখন কোনো বিপদে পড়ে, তখন কারও ব্যথা না লাগলেও মায়ের বুকে ব্যথা লাগে, তাঁর নাওয়া-খাওয়া-ঘুম বন্ধ হয়ে যায়। তিনিই হলেন—মা!
আমি যখন প্রবাসজীবন শুরু করি, তখন আমি আমার মা-বাবাকে খুব খুব মিস করি। যা আজ দু–একটি অক্ষরে বা বাক্যে লিখে বোঝানো যাবে না।
মাকে ছাড়া বিলেতে প্রথম ঈদ
বিশেষ করে এই পরবাসে তথা বিলেতে যখন প্রথম ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমি ও আমার স্ত্রী, তখন আমার কাছে হাহাকার, শূন্যতা, কী এক অজানা কষ্ট মনে হচ্ছিল।
যেখানে আগে বাংলাদেশে ঈদের সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙত, তারপর রেডি হয়ে বাবার সঙ্গে আমরা ভাইয়েরা ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তে চলে যেতাম। ফিরে এসে বাবার সঙ্গে দাদির কবর জিয়ারত করে ঘরে ফিরে মাকে কদমবুচি করতাম। মা বুকে জড়িয়ে রাখতেন, ঈদের দিন মায়ের বুকে এই যে কিছুক্ষণের শান্তি, এটি আমার কাছে দুনিয়ার বেহেস্ত। এই শান্তির পরশ প্রথম যখন মিস করি, সেটি হচ্ছে মাকে ছাড়া বিলেতে প্রথম ঈদ। যুক্তরাজ্যে লন্ডন শহরে আমাদের এই ঈদের সকাল, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতে পরতে মা কে কল দিলাম।
মায়ের সঙ্গে কথা বললাম, বাবাকেও ঈদের সালাম দিলাম। তখন বাংলাদেশে বিকেল, মনের কষ্ট নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দুঃখটাকে দিলাম বিদায়। এভাবে এক–দুটি ঈদ উদ্যাপন করে আমাদের মতো প্রবাসীদের বছরের পর বছর ঈদের দিন পাড়ি দিতে হয় আপনজনছাড়া, মা-বাবা ছাড়া।
প্রবাসে অসুস্থ হলে মুঠোফোনে মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা
এই প্রবাসজীবনে নিজে অসুস্থ হলে বা বিশেষ করে আমার মেয়ে অসুস্থ হলে মুঠোফোনে মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতাম। মাকে বলতাম দোয়া করতে, সঙ্গে সঙ্গে মা সুরা ইয়াসিন, সুরা ফাতেহা এ রকম আরও অনেক কিছু পড়ে ফুঁ দিতেন, মোনাজাত করতেন, আর এভাবে সুস্থতা লাভ হতো। এই প্রবাসে এটি আমার বিশ্বাস ছিল, মা দোয়া করে দিলে অতি দ্রুত ভালো হওয়া যেত। বিশেষ করে আমার মেয়ে অসুস্থ হলে আমি এবং আমার স্ত্রী তা–ই করতাম, মনের শান্তি খুঁজে পেতাম। আর লন্ডনের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতাম। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে যে পরামর্শ ও শান্তি পেতাম, তা এখন আর পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার বিশ্বাস লক্ষ–কোটি টাকার বিনিময়েও পাওয়া যাবে না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো সেই দরজাটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। মা নেই, এই তো সেদিন লন্ডনে ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করলাম আমরা। আর কোনো সময় ঈদের দিন মা-বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলা হবে না। চলতি মে মাসের শেষের দিক এ বছরের ঈদুল আযহা দেশে–বিদেশে উদযাপিত হবে। যাঁদের মা জীবিত আছেন, এই প্রবাস থেকে ঈদের দিন কথা বলবেন শান্তির অন্বেষণে। আর আমার মতো অনেকেই মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। আসুন দোয়া করি মায়ের জন্য, মায়েদের জন্য—‘রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি ছাগিরা’।
দূর প্রবাসে মায়ের কথা মনে পড়ে, মায়ের জন্য মন কাঁদে, কাঁদবে। মায়ের তুলনা কেবলই মা, এই শূন্যস্থান কেউ পূরণ করতে পারবে না। মায়ের একটি কথায়ই পাহাড়সম শান্তি।
লেখক: মুহাম্মদ শাহেদ রাহমান, কুইনমেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে কর্মরত এবং সভাপতি (২০২৫-২০২৬) ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটি।