অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে

অলংকর‌ণ: এস এম রাকিব

রুপন্তি আর শ্যাম ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় একটা বন্ধুর বাসায় দাওয়াতে। এ বাসায় আজকে এসেছেন আমার খুব কাছের কিছু মানুষ, যাঁদের সঙ্গে আমার সব সময় দেখা হয় না; কিন্তু খুব দেখতে ইচ্ছা করে, গল্প করতে ইচ্ছা করে। এ রকম একজন আপুর সঙ্গে পেয়ারা কবে পাববিষয়ক দুষ্টুমি করছি, দেখি রুপন্তি আপু পা তুলে সোফার কোনায় চুপচাপ বসে আছেন। আপু তাঁর সঙ্গে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, ‘তুমি চেনো রুপন্তিকে? চট্টগ্রাম মেডিকেলের তো।’ আমি তাকালাম। তিনি বললেন, ‘ওরা আসার আগে আগে আমরা পাস করেছি বোধ হয়। তাই চেনে না।’ আমি বললাম, ‘রুপন্তি আপু, আপনার পায়ে কী হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘আর বোলো না, রোগী দেখে তাড়াহুড়া করে বের হচ্ছি, তিন সিঁড়ি স্কিপ করে পড়ে পা মচকে গেছে। আগে যদি বুঝতাম তাড়াহুড়ার এই হাল হবে, তাহলে...,’ কথা শেষ না করতেই দেখি শ্যাম ভাই চা হাতে হাজির। বললেন, ‘রুপন্তি, পায়ে বেশি ব্যথা?’ তিনি হাসলেন, ‘না না, দাও চা খাই।’ বিষয়টা দারুণ রোমান্টিক। সবার হাবিরাই যে এত বেশি কেয়ারিং, সেটা কিন্তু নয়। রুপন্তি আপু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার ভাইয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই, ও কিন্তু ডাক্তার।’ শ্যাম ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আরে তোমাকে তো চিনি, প্রথম আলোতে লেখো না?’ আমি বললাম, ‘জ্বি।’ ‘তাহলে রুপন্তির কাছে শুনে নিয়ো আমাদের গল্পটাও, কেমন?’

বললাম, ‘রুপন্তি আপু, বলুন না কী ঘটনা। বহুদিন একটা রোমান্টিক গল্পের প্লট খুঁজে চলেছি। আপনাদের দেখেই মনে হয় সে রকম একটা কাপল।’ রুপন্তি হাসলেন, ‘আরে দূর পাগল, সবারই তো এমনই হওয়া উচিত।’ বললাম, ‘বলুন না।’ বললেন, ‘বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহর ডুবে গেছে না? ১৯৯১–তে এ রকম একটা ঝড় হয়েছিল।

‘বন্যা, যোগাযোগ বন্ধ দেশের অন্য সব জেলার সঙ্গে। আমি তখন চট্টগ্রাম মেডিকেলের ছাত্রী। অল্প বয়স। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সবার কাছ থেকে টাকাপয়সা তুলে কিছু শুকনা খাবার প্যাকেট করলাম লেকচার গ্যালারিতে। ট্রাক ভাড়া করলাম। পরদিন রওনা হলাম রাঙামাটি। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর পানিতে ট্রাক আটকে গেল। ত্রাণ বানভাসি মানুষদের যতটুকু পারলাম দিলাম; কিন্তু আমরা ফিরে যাব কীভাবে? সঙ্গের ছেলেরা বলল, হাঁটতে হবে ট্রাক থেকে নেমে অন্য পাশে গিয়ে ভ্যান বা গাড়ি পাওয়া পর্যন্ত। সেলফোনের আগের যুগ সেটা। কেউ জানে না, আমরা কয়েকটা ফাস্ট ইয়ারের ছেলেমেয়ে ঠিক কোন জায়গায় আছি। উঁচু–নিচু পথ, এতটা ভয় বহুদিন পাইনি আমি। শুরু হলো হাঁটা। ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে একটা বড় বাড়ির সামনে পৌঁছালাম আমরা।

লেখক

‘আমি স্যান্ডেল ছিঁড়ে পা মচকে ফেলেছি। বাসাটা অন্ধকার। বন্ধুরা গেট নক করে চলেছে যদি কেউ খোলে। এমন সময় আমাদেরই বয়সী একটা ছেলে গেট খুলল। সব শুনে বলল, “এসো, দেখি কী করা যায়।” ভেতর থেকে ওর মা, বাবা, বোন—সবাই বেরিয়ে এসেছে, “অবাক, এ রকম ভয়াবহ আবহাওয়ায় কেউ বাইরে বের হয়!”

‘সেই দিনের বাসাটাই ছিল শ্যামের বাসা। মোমের আলোয় আলোকিত বসার ঘর। আমাদের বসতে দিয়ে তাঁরা শুকনা কাপড় দিলেন, রাতের খাবার ভাগ করে দিলেন সবাইকে। অচেনা একটা পরিবার এত ভালোবাসা তুলে রেখেছিল মনে?’

রুপন্তি আরও বললেন, ‘এতক্ষণে পায়ে তীব্র ব্যথা টের পেলাম। পা ফুলে গেছে। শ্যামই প্রথম লক্ষ করল, আমি খুব চুপচাপ বসে আছি। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” আমি বললাম, “পা মচকে ফেলেছি।” পা দেখে ও অবাক। ঠান্ডা পানিতে কাপড় ভিজিয়ে পায়ে দিল ও। এরপর পুরো রাত ঝড়ের তাণ্ডব, বৃষ্টি, পায়ে ব্যথা নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না। সকালে উঠেও মেঘলা আবহাওয়া দেখে ওর মা আমাদের বের হতে দিলেন না। শ্যামদের বাসায় আমরা দুই দিন ছিলাম। ভাগ করে খাওয়া, এক কাপড়ে থাকা, একটা বাসায় এতগুলো মানুষ; কিন্তু মনে হয়েছিল, তাঁদের আমরা কত দিন ধরে চিনি। পানি কমাতে তৃতীয় দিন হোস্টেলে ফিরে এলাম।

‘এরপর পায়ে ব্যথা কমল, সব স্বাভাবিক হলো; কিন্তু কোথায় যেন একটা অচেনা গানের সুর মনে রিনঝিন করে বাজতে লাগল। কয়েক মাস পর ক্লাস করে ফিরছি, গেটের সামনে দেখি শ্যাম দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে বলল, “আবার নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চারে যোগ দিয়ে কোনো বিপদে পড়লে কি না, দেখতে এলাম।”

‘তার পরের ঘটনাগুলো সাধারণ। ও মাইগ্রেশনে এল আমার মেডিক্যালেই পরের বছর। পাস করার পর বিয়ে, দুজনে এলাম যুক্তরাষ্ট্রে। চরম সংগ্রামী দিনগুলোয়ও আমরা পাশাপাশি রইলাম।’ বলে রূপন্তি হাসলেন, ‘সব কষ্টই সহ্য করা যায়, যদি কষ্টটা কেউ বোঝে। পা মচকে বাসায় আসাতে সেই কত বছর আগেকার মতোই ও ভীষণ মন খারাপ করেছিল। ওর আনা আইস প্যাক দিতে দিতে আমিই এখন টায়ার্ড।’

‘আমার নামে কী বলা হচ্ছে শুনি,’ বলতে বলতেই শ্যাম ভাইয়া এলেন। রূপন্তির হাতে খাবারের প্লেট আর পাশে পানি রেখে আমাদের দিকে তাকালেন, ‘কারও কিছু লাগবে? লাগলে কষ্ট করে উঠে নিজে নিয়ে খাও। তোমাদের তো আর পায়ে ব্যথা না, তাই না?’

(চট্টগ্রামে আবার বন্যায় জনজীবন দুর্বিষহ। আমার বন্ধু সাজ্জাদসহ যারা কাজ করছিস বন্যাদুর্গতদের সহায়তায়, তোদের জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করছি। দুর্যোগ কেটে স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক সবাই।)

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]