চট্টগ্রাম থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস: প্রযুক্তি, ব্যবসা ও কমিউনিটি নেতৃত্বে মিকায়েল খান

‘জয় পি. অ্যাটকিনসন নেইবারহুড কাউন্সিল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ হাতে মিকায়েল খান (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)। লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি হলে কমিউনিটির অন্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তিনিছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রামের একটি স্কুল থেকে শুরু। এরপর ভারতের দিল্লি। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস। আর সেই পথ পেরিয়ে আজ লস অ্যাঞ্জেলেসের স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃত্বে পরিচিত একটি নাম—মিকায়েল খান।

প্রযুক্তি পেশাজীবী হিসেবে দীর্ঘ ক্যারিয়ার, উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা এবং একই সঙ্গে কমিউনিটির জন্য কাজ—তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তাঁর নাগরিক ও কমিউনিটি নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘জয় পি. অ্যাটকিনসন নেইবারহুড কাউন্সিল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’।

মিকায়েলের শিক্ষাজীবনের শুরু চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিড স্কুলে। পরে ভারতের দিল্লির শিবা শিবানি পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর ভারতের পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপণনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

কিন্তু শিক্ষার পথ সেখানেই থেমে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রে এসে উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার প্রকৌশলে আরেকটি স্নাতক ডিগ্রি নেন।

বিপণন থেকে কম্পিউটার প্রকৌশল শিক্ষার এই দুই ভিন্ন ক্ষেত্র পরবর্তী সময়ে তাঁর পেশাগত জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। প্রযুক্তির জ্ঞান তাঁকে সফটওয়্যার ও সাইবার নিরাপত্তার জগতে নিয়ে গেছে। আবার ব্যবসা ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে উদ্যোক্তা ও কমিউনিটি সংগঠক হিসেবে এগিয়ে দিয়েছে।

জয় পি. অ্যাটকিনসন নেইবারহুড কাউন্সিল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ জয়ী মিকাইল খান

প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী থেকে উদ্যোক্তা

পেশাজীবনের শুরু থেকেই প্রযুক্তি খাতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন মিকায়েল। সফটওয়্যার প্রকৌশল, সাইবার নিরাপত্তা, পরিচয় ও প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাপনা, সফটওয়্যার মাননিয়ন্ত্রণ এবং স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষণ প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন তিনি।

ভেনচুরা কাউন্টি জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, বোয়িং, ব্ল্যাকবোর্ড ইনকরপোরেটেড, ইউএসটি এবং ওয়েলস ফার্গোর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। প্রযুক্তির এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শুধু সফটওয়্যার তৈরি বা পরীক্ষাই নয়, নিরাপত্তা, সিস্টেম ব্যবস্থাপনা এবং কাজের প্রক্রিয়া উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

লস অ্যাঞ্জেলেসে নাগরিক পরিষেবা ও কমিউনিটি উন্নয়নের একটি আয়োজনে বক্তব্য দিচ্ছেন মিকায়েল খান। তাঁর সঙ্গে আছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা
ছবি: প্রথম আলো

চাকরি থেকে উদ্যোক্তা

প্রযুক্তি পেশার পাশাপাশি মিকায়েল নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার বেকার্সফিল্ডে একটি ‘মাকো অটো বডি শপ’-এর ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক ও সহমালিক তিনি। ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখাকেও তিনি উদ্যোক্তা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন।

পাকোইমা নেইবারহুড সিটি হলের সামনে একটি অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে ফিতা কাটছেন মিকায়েল খান (বাঁ থেকে তৃতীয়)। সঙ্গে আছেন কমিউনিটির অন্যান্য নেতা ও সদস্যরা
ছবি: প্রথম আলো

কমিউনিটির নেতৃত্বে প্রযুক্তির মানুষ

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি কমিউনিটির জন্য কাজ করার আগ্রহ থেকেই তাঁর নাগরিক নেতৃত্বের যাত্রা। পাকোইমা নেইবারহুড কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন মিকায়েল। একই সঙ্গে আট বছর কাউন্সিলের ভূমি ব্যবহার, আবাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন।

এই সময়ে আবাসন, ভূমি ব্যবহার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জননিরাপত্তা, পরিবহন, শিক্ষা, যুব কার্যক্রম এবং কমিউনিটি উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

মিকায়েল বলেন, কাউন্সিলের অন্য সদস্য ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পাকোইমা ৯৯টি নেইবারহুড কাউন্সিলের মধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে।

তবে এই অর্জনের কৃতিত্ব তিনি একা নিতে চান না। তিনি বলেন, ‘কমিউনিটির মানুষ যখন একটি লক্ষ্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করেন, তখনই বড় পরিবর্তন সম্ভব।’

কমিউনিটি উন্নয়নমূলক একটি আয়োজনে লস অ্যাঞ্জেলেসের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিকায়েল খান (বাঁয়ে)
ছবি: প্রথম আলো

লস অ্যাঞ্জেলেসের স্থানীয় নাগরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন উদ্যোগেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত মিকায়েল। তিনি জেসমিন খান ফাউন্ডেশনের পরিচালক, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টসের (এএবিইএ) কোষাধ্যক্ষ এবং বাংলা বিজয় বহরের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্যাসিফিক কাইট ক্লাবের কাইট ফেস্টিভ্যালের সঙ্গেও তিনি নেতৃত্বের ভূমিকায় যুক্ত ছিলেন।

বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁর দায়িত্বের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগ, কমিউনিটি অনুষ্ঠান এবং নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার নানা উদ্যোগে।

মর্যাদাপূর্ণ ‘জয় পি. অ্যাটকিনসন নেইবারহুড কাউন্সিল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণের পর হাসিমুখে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছেন মিকায়েল খান
ছবি: প্রথম আলো

পুরস্কারের দিনে ফিরে দেখা

‘জয় পি. অ্যাটকিনসন নেইবারহুড কাউন্সিল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ হাতে পাওয়ার মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত মিকায়েল। তবে তাঁর কথায় ব্যক্তিগত গর্বের চেয়ে বেশি উঠে আসে কৃতজ্ঞতা।

মিকায়েল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষের সেবা করার, সবাইকে একত্র করার এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রতিটি সুযোগের জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’ তাঁর কাছে এই স্বীকৃতি শুধু একটি পুরস্কার নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাজের পথে পাশে থাকা মানুষগুলোর প্রতিও একধরনের স্বীকৃতি।